ইসমাইল মাহমুদ
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৫ ১১:৪০ এএম
চা বাগানে কাজ করছেন নারী শ্রমিক
বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত ৫ লক্ষাধিক শ্রমিকের ভাষা এখন বিপন্ন। দেশের আদিবাসীদের ভাষাগত সমস্যা সমাধানে সরকারিভাবে পাঠ্যপুস্তকসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চা বাগানের বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষাগত সংকট উত্তরণে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ১৭১ বছর ধরে চা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকরা ক্রমে হারিয়ে ফেলছেন নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি।
জানা যায়, বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলে নানা জাতপাতের ও সমাজের মানুষের বসবাস। উল্লেখযোগ্য সমাজ হলো ওরাওঁ, বাড়াইক, বাউরী, মাল, মৃধা, অলমিক, সাঁওতাল, কল, পাশী, খাড়িয়া, রাউতিয়া, কৈরী, নায়েক, দোষাদ, ভর, কানু, কাঁহার, রবিদাস, রাজবংশী, গোঁসাই, কালিন্দী, মুন্ডা প্রভৃতি। এসব জাতপাতের আবার রয়েছে আলাদা সংস্কৃতি ও নিজস্ব ভাষা। কিন্তু ভাষাগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। চা শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা কজে সংযুক্ত একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্যমতে দেশের চা শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অন্তত ১৫টি ভাষা এখন বিপন্ন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সৌরা, খাড়িয়া, রাজবংশী, ওরাওঁ, মুন্ডারি, মাহালি, তেলুগু। আন্তর্জাতিকভাবে বিপন্ন এ ভাষাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও সরকার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এ ভাষাগুলোর ভবিষ্যৎ অন্ধকারময়। ২০১২ সালে জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা এবং সমতলের সাদরি ও গারো এ পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী শিশুদের পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ নেয় সরকার। সে উদ্যোগের বাস্তবায়নে ২০১৪ সালের শুরুতে ওইসব সম্প্রদায়ের আদিবাসী শিশুদের হাতে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির নিজ নিজ ভাষার বই তুলে দেওয়া হয়। যেসব আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে তাদের তুলনায় চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী বিশাল। কিন্তু সে সময়ে ওই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষার পদক্ষেপ উপেক্ষিত থেকে যায়।

চা শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে গবেষণা করছে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে পঞ্চগড় জেলায় প্রতিষ্ঠিত চা বাগান ও নতুন চা বাগান ছাড়া বাংলাদেশে চা বাগান রয়েছে ১৫৮টি। এসব চা বাগানে কর্মরত স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৬ এবং চা বাগান এলাকায় বসবাসরত মোট জনসংখ্যা ৫ লক্ষাধিক। এসব শ্রমিকের অধিকাংশই অবাঙালি। ব্রিটিশ আমলে এ দেশে যখন চা বাগানের গোড়াপত্তন হয় তখন ভারতের ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, ছোট নাগপুর; তামিলনাড়ুর মাদ্রাজ; বিহারের মুঙ্গের; অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম; ওড়িশা; উত্তরপ্রদেশ; মধ্যপ্রদেশ; পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমসহ অন্যান্য স্থান থেকে লোকজন চা বাগানের কায়িক শ্রমের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। ভারতের একেক রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতি একেক ধরনের। আমাদের দেশের চা শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে বসবাসরত ৫ লক্ষাধিক মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝেও ফারাক বিদ্যমান। দেশের চা বাগানগুলোতে যেসব ভাষা সর্বাধিক প্রচলিত সেগুলো হলো সাঁওতালি, মুন্ডা, রাজবংশী, ওরাওঁ বা কুরুখ, মাহালি, সাদরি, মাদ্রাজি, ভোজপুরি, নেপালি, সৌরা, জংলি।
সরকারিভাবে পাঠ্যপুস্তকসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চা বাগানের বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষাগত সংকট উত্তরণে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ১৭১ বছর ধরে চা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকরা ক্রমে হারিয়ে ফেলছেন নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা শ্রমিক নেতা পরিমল সিং বাড়াইক বলেন, ‘বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠীর রয়েছে বহু জাতপাত, বহু ভাষা ও সংস্কৃতি। ভারতের ওরিশা থেকে আগত লোকজন ওড়িয়া, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ থেকে আগত লোকজন ভোজপুরি, বিহার থেকে আগত লোকজন ভোজপুরি ও সাদরি, অন্ধ্রপদেশ থেকে আগত লোকজন তেলুগু, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত লোকজন বাংলা, সাঁওতাল পরগনা থেকে আগত লোকজন সানতারি ভাষায় কথা বলেন। আরও বহু জাত, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চল। এসব ভাষা রক্ষায় বেসরকারিভাবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। সরকারিভাবে কোনো পদক্ষেপ নেই। চা শিল্পাঞ্চলের এসব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।’
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চণ্ডীছড়া চা বাগানের বাসিন্দা মণি মুন্ডা বলেন, ‘এ দেশের চা বাগানগুলোতে মুন্ডা সম্প্রদায়ের ৪০টি পরিবারের বসবাস। আমাদের সম্প্রদায়ের ভাষা হচ্ছে মুন্ডারি। এ ভাষাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাবা-মায়েরা মুন্ডারি ভাষায় কথা বলতে পারেন, কিন্তু আমাদের সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ সন্তান এ ভাষায় কথা বলতে বা লিখতে পারে না। মুন্ডারি শুধু একটি ভাষা নয়, এর নিজস্ব লিপি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস রয়েছে। এটি ভারতীয় আর্য ভাষার পূর্ববর্তী এবং অস্ট্রো-এশীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের জেলার চান্দপুর, লস্করপুর, লালচান্দ, চাকলাপুঞ্জি, আমু, সুরমা, নালুয়া চা বাগানগুলো থেকে একসময়ের বহুল প্রচলিত মুন্ডারি ভাষা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি সামাজিক মনোভাবের কারণে আমার নিজস্ব ভাষায় কথা বলা নিয়ে অনেকে লজ্জিত বোধ করতেন। কিন্তু আমি যখন আমাদের এ ভাষাটি সম্পর্কে পড়ি ও জানতে পারি তখন আমি গর্বিত হয়ে উঠি এবং এ ভাষাটি শেখার চেষ্টা করি। আমার মা আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন। আমরা যদি আমাদের ভাষা রক্ষা না করি, তাহলে আমরা আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য হারাব। এখন পর্যন্ত আমাদের এ ভাষা রক্ষায় কেউ এগিয়ে এলো না। মুন্ডারি ভাষা আমাদের সম্পদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি সংরক্ষণে আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

আন্তর্জাতিক সংস্থা সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস (সিল) সূত্র জানান, ‘১৫টি ভাষা বিপন্ন। যার প্রায় সবই চা বাগানের মানুষজনের ভাষা। এসব জাতিসত্তার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থান খুবই দুর্বল। জীবনজীবিকার তাগিদে ছুটতে গিয়ে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও নিজস্বতার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। তাদের দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা মাতৃভাষা শেখার বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা স্থানান্তরের প্রতি অনীহা তৈরি করছে।’
জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত মণিপুরি ললিতকলা একাডেমির উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রভাষ চন্দ্র সিংহ বলেন, ‘ভাষাসংক্রান্ত কাজ সরকারের দায়িত্ব। তবে আমরা আমাদের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে নানা ভাষা নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকি।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সদ্যসাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী বলেন, ‘আমাদের দেশের চা বাগানগুলোতে প্রায় ১৫টি স্বতন্ত্র ভাষার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও জাতীয়ভাবে আলোচনায় এ ভাষাগুলো মূলত উপেক্ষিত। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ এবং উত্তরবঙ্গের মতো অন্যান্য অঞ্চলে প্রায়ই আদিবাসীদের ভাষাগত সমস্যাগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা ও সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হয়। কিন্তু দেশের চা বাগানগুলোর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির কথা তারা নেহাতই ভুলে যায়। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও চা বাগানের শ্রমিকদের দুর্দশার বিষয়টি মূলত অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। চা বাগানের ভাষা সংরক্ষণে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমির মনোযোগের অভাব রয়েছে। এখানে মণিপুরি সম্প্রদায়ই প্রাধান্য পায়। চা বাগানের ভাষা ও সংস্কৃতি সরকারের ভাবনার বাইরে। অন্যদিকে এসডিজি অর্জন করতে চাইলে এ প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয় সংরক্ষণের জন্য সরকার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বীকৃতি এবং পদক্ষেপ নেওয়ার স্পষ্ট প্রয়োজন।’