প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
মানুষের স্বপ্নপূরণে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তবে সবাই সে পরিশ্রম চালিয়ে যেতে পারে না, ফলে অনেকে মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু এ সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম মানিকগঞ্জের ইলেকট্রিক মিস্ত্রি জুলহাস মোল্লা। চার বছরের চেষ্টায় নিজের তৈরি রিমোট কন্ট্রোল (আরসি) উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে উড্ডয়ন করলেন তিনি। তার বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের ষাইটঘর তেওতা গ্রামে। ৪ মার্চ দুপুরে তিনি উপজেলার জাফরগঞ্জে যমুনা নদীর চরে নিজের তৈরি উড়োজাহাজে চড়ে উড়ে বেড়ান।
২০১৪ সালে জিয়নপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করলেও নদীভাঙনের কারণে অর্থাভাবে আর পড়ালেখা হয়নি। ছয় ভাই, দুই বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে ঢাকায় কাজ করেন। ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করার পাশাপাশি অবসরে উড়োজাহাজ তৈরি করেন। তিন বছর গবেষণা এবং এক বছর সময় নিয়ে উড়োজাহাজটি তৈরি করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অ্যালুমিনিয়াম ও লোহা দিয়ে বিমানটির অবকাঠামো তৈরি। ব্যবহার করা হয়েছে পানির পাম্পের সেভেন হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিন।

অন্য অনেকের মতো বিমান তৈরি করতে গিয়ে জুলহাসকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন পথ। প্রথম দিকে পরিবার ও এলাকাবাসী তাকে পাগল মনে করেছে। অবশ্য সফল উড্ডয়নের পর সবাই এখন তাকে বেশ উৎসাহ আর বাহবা দিচ্ছে। জুলহাসের দাবি, অনেকে চেষ্টা করলেও তার আগে কেউ বাংলাদেশে নিজে বিমান তৈরি করে আকাশে উড়তে পারেনি। তার তৈরি বিমানটির ঘণ্টায় গতি সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার। জীবনে কোনো দিন বিমানে না উঠতে পারলেও নিজের তৈরি করা বিমান চালিয়ে সে স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি।৫০ ফুট ওপরে উড়তে পারা এ উড়োজাহাজটি মূলত পরীক্ষামূলকভাবে প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে তৈরির পরিকল্পনা না থাকলেও সরকারি অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সেটাও ভাববেন তিনি। জুলহাসের এ গবেষণা এগিয়ে নিতে উড়োজাহাজ নির্মাণে প্রয়োজনীয় সব আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। এজন্য যদি তার দেশের বাইরে যাওয়ারও প্রয়োজন হয় তারও সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে স্বপ্নপূরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের সঙ্গে তার আলোচনাও হয়েছে। খুব শিগগিরই হয়তো নতুন এক জুলহাসকে দেখতে পাবে বাংলাদেশ।
জুলহাসের ছোট ভাই নয়ন মোল্লা জানান, শুরু থেকেই তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন। দুই ভাই মিলে একসঙ্গে সব কাজ করেছেন। দমে যাওয়ার কথা কখনও ভাবনায় আসেনি তাদের। এক বছর ধরে দিনে তারা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিমান তৈরিতে গবেষণা ও কাজ চালিয়ে গেছেন।
জুলহাসের বাবা জলিল মোল্লাও ছেলের ছোটবেলার স্মৃতি ঘেঁটে বুঝতে পারেন ছেলের এ বুদ্ধিমত্তা আসলে এখনকার নয়, শৈশবেই বোনা হয়ে গিয়েছিল তার স্বপ্নের বীজ। ‘জুলহাস ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের জিনিস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করত। এসব জিনিসের প্রতি তার ছিল ব্যাপক আগ্রহ। পড়ালেখা বাদ দিয়ে এসব করার কারণ জিজ্ঞাসা করলেই তার মন্তব্য ছিলÑ দেখো আমি এমন একটা জিনিস বানাব যেটা দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব। আজ ছেলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ছেলের তৈরি বিমান আজ আকাশে উড়েছে।’ বাবা হিসেবে তিনি চান ছেলের সব স্বপ্ন পূরণ হোক। অভাবের সংসারে যা কিছু জুলহাস পায়নি তার সবটা যেন সে নিজেই পূরণ করতে পারে।
সফলতা যে এক দিনে আসে না তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ জুলহাস। তার বয়সি যুবকরা যদি নিজেদের চেষ্টায় নতুন নতুন আরও উদ্ভাবন করতে পারে তাহলে দেশ ও দশের জন্য অবশ্যই সেটা চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছেলে যদি এতদূর আসতে পারেন, বাকিদের পক্ষেও দারুণ কিছু করা সম্ভব!