নাকিব নিজাম
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৫ ১২:৫০ পিএম
সোনাকান্দা দুর্গ মুঘল আমলে নির্মিত একটি জল দুর্গ
কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকেই প্রিয়জনকে সময় দিতে পারেন না ঠিকমতো। এতে হয়তো সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাজারোটি অভিযোগ আপনাকে নিয়ে। আর মাত্র কয়েক দিন পরই ঈদ। তাই প্রিয়জনের অভিমান ভাঙাতে আজই তাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলুন। ঘুরে আসুন ঢাকার আশপাশের দর্শনীয় ছয়টি স্পট থেকে।
আড়াইহাজার মেঘনার চর
ঢাকার কাছে আড়াইহাজার চর এলাকা অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। বিস্তীর্ণ এলাকায় এ রকম মনোরম পরিবেশ আর কোথাও পাবেন না এই যান্ত্রিক নগরীর আশপাশে। সারা দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন এখান থেকে। খাওয়া-দাওয়া এবং ট্রলারের খরচ মিলিয়ে মোটামুটি তিন-চারজনের জন্য ৭০০-১০০০ টাকা খরচ হতে পারে। যাওয়ার জন্য প্রথমে গুলিস্তান থেকে যেতে হবে মদনপুর। সেখান থেকে আড়াইহাজার যাবেন।
নরসিংদীর জমিদারবাড়ি
জমিদারবাড়ি ঘুরতে যাওয়াটাও বেশ জৌলুসের! এ বাড়ির বাইরের দিকে তাকালেই চোখ জুড়িয়ে যায়। নিখুঁত সৌন্দর্যের এই ভবনগুলো শত বছর পরও ঐতিহ্যপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের মুগ্ধ করে তোলে। উকিলবাড়ি নামে পরিচিত নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা বাজার থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত লক্ষণ সাহার জমিদারবাড়ি।
মায়া দ্বীপ
নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদী ইউনিয়নের মায়া দ্বীপ হতে পারে বিশেষ দিনের বিকাল কাটানোর দারুণ এক স্থান। মায়া দ্বীপ হলো মেঘনা নদীর বুকে ভেসে ওঠা একটি দারুণ সুন্দর চরের নাম। ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী বারদী ইউনিয়নের অন্তর্গত নুনেরটেক গ্রামেই মায়া দ্বীপের অবস্থান। এ গ্রামটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন।

জিন্দা পার্ক
১৫০ একর জায়গা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার দাউদপুর ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে জিন্দা পার্ক। ১০ হাজারের বেশি গাছ, পাঁচটি জলাধার ও অসংখ্য পাখি রয়েছে এ পার্কে। এ ছাড়াও রয়েছে ক্যান্টিন, লাইব্রেরি, চিড়িয়াখানা। এ ছাড়াও রয়েছে আটটি সুসজ্জিত নৌবহর। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে এ পার্ক। প্রবেশ মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০০ টাকা ও ছোটদের ৫০ টাকা। পার্কিং চার্জ ৫০ টাকা।
জল জঙ্গলের কাব্য রিসোর্ট
বিশাল একটি বিল, পুকুর আর বনজঙ্গল আছে এখানে। যে কেউ চাইলে একটা দিন এখানে কাটিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। সারা দিনের জন্য জনপ্রতি ১৫০০ টাকা (সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার আর বিকালে স্ন্যাক্স)। এক দিন এবং এক রাতের জন্য ৩০০০ টাকা জনপ্রতি। শিশু, কাজের লোক ও ড্রাইভারদের জন্য ৬০০ টাকা জনপ্রতি। দুপুরের খাবার হিসেবে ১০-১২ রকম দেশি আইটেম। মোটা চালের ভাত, পোলাও, মুরগির ঝোল, ছোট মাছ আর টক দিয়ে কচুর মুখির ঝোল, দেশি রুই মাছ, ডাল, সবজি এবং কয়েক রকমের সুস্বাদু ভর্তা। এ রিসোর্টে যাওয়ার জন্য প্রথমে পুবাইল কলেজ গেট যেতে হবে। সেখান থেকে প্রায় ৩ মাইল গেলেই আপনি পেয়ে যাবেন পাইলটবাড়ি বা জল জঙ্গলের কাব্য রিসোর্ট।

মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারবাড়ি
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। এটি দেশের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। সূত্রমতে, উনিশ শতকের দিকে ৫.৮৮ একর জমির ওপর নির্মিত হয় বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বা ‘বালিয়াটি প্যালেস’। বালিয়াটির জমিদাররা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছরের প্রাচীনতম পুরাকীর্তির নিদর্শন রেখে গেছে, যা জেলার পুরাকীর্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দৃষ্টিনন্দন এই প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য দেশি দর্শনার্থীদের জন্য ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের জন্য ১০০ টাকা এবং বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বালিয়াটি প্রাসাদটি রোববার পূর্ণদিবস ও সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে।
মুঘল আমলের সোনাকান্দা জল দুর্গ
সোনাকান্দা দুর্গ মুঘল আমলে নির্মিত একটি জল দুর্গ। এটি ১৬৫০ সালের দিকে তৎকালীন বাংলার সুবাদার মীর জুমলা কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এটি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। সপ্তদশ শতকে ঢাকা শহরকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে যে তিনটি জল দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল সোনাকান্দা দুর্গ তার মধ্যে অন্যতম।
সোনাকান্দা দুর্গ নির্মাণের তারিখসংবলিত কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। দুর্গটিতে রয়েছে ইস্টক নির্মিত পুরু দেয়াল, একটি বিশাল কামান প্ল্যাটফর্ম এবং উত্তরমুখী একটি প্রবেশ তোরণ। দুর্গটিতে মূলত দুটি প্রধান অংশ লক্ষ করা যায়। এক. আত্মরক্ষামূলক প্রাচীর যার মধ্যে গোলা নিক্ষেপের জন্য বহুসংখ্যক প্রশস্ত-অপ্রশস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে; যা থেকে বন্দুক এবং হালকা কামান ব্যবহার করে জলদস্যুদের দিকে শেল নিক্ষেপ করা যেত। অপরটি হচ্ছে পশ্চিম দিকের উঁচু মঞ্চ, যা দুর্গকে জলদস্যুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হচ্ছে দুর্গের বিশাল কামান প্ল্যাটফর্ম। গোলাকার কামান প্ল্যাটফর্মের একটি সিঁড়ি রয়েছে, কামান প্ল্যাটফর্মের উঁচু মঞ্চে শক্তিশালী কামান নদীপথে আক্রমণকারীদের দিকে তাক করা থাকত। এটি মুঘলদের জল দুর্গের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে অষ্টভুজাকৃতির চারটি বুরুজ দুর্গের চার কোণে রয়েছে। দুর্গের একমাত্র প্রবেশ তোরণটি উত্তর দিকে। প্রবেশদ্বারটি একটি আয়তকার ফ্রেমের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।