সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৫ ১৭:২৮ পিএম
অলংকরণ মিথিলা ভৌমিক। সে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী
খুদুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, দুই মাস আগে। বয়স ওর নয়-দশ হবে।
ওকে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী নাম তোমার?
আপনি কে? উত্তর না দিয়ে পাল্টা ছোট প্রশ্ন।
হতবাক না হয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, মানুষ।
হো হো করে হেসে উঠেছিল।
আমি দ্বিতীয়বারও হতবাক না হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, হাসলা কেন?
সবাই তো মানুষ। এইটা কওয়ার কী অইল!
তোমার কী নাম?
আমারে সবাই ‘তুই’ কইরা কয়। আপনি তুমি কইরা জিগাইলেন তো তাই কইছি আপনে কে?
কিছু সময় ওর কথার ভাবার্থ বোঝার চেষ্টা করেছিলাম।
আপনে খালি হাঁটেন। নীলক্ষেতে বইয়ের দোকানে বই খোঁজেন। আর কোনো কাম নাই?
আমার কোনো কাজ নেই। বই খুঁজি। বই পড়ি। তোমার কী কাজ? কী নাম তোমার?
খুদু। ঘুইরা ঘুইরা কাগজ টোকাই, পানির বোতল টোকাই।
খুদু তোমার নাম?
হ।
থাকো কোথায়?
ওই রেলস্টেশনের নিচে। হাত উঁচু করে দেখিয়েছিল। বুঝেছিলাম টিএসসির মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ওর থাকার জায়গা।
মা-বাবা কোথায় থাকে?
নাই।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। আর প্রশ্ন করা ঠিক হবে কি না খানিক সময় ভেবেছিলাম।
তুমি বড় হলে কী করবা?
রিকশা চালামু, গরম ভাত খাওনের লেইগা।
গরম ভাত! শব্দ দুটি কানে বেশ বড় ধরনের ঝংকার তুলেছিল।
বলে কি, গরম ভাত খাওয়ার জন্য রিকশা চালাবে! বলেই ফেলেছিলাম, গরম ভাত তোমার পছন্দ?
হ, খাইতে পাই না তো। কেউ ভাত শেষ করতে না পারলে ফালাইয়া দেয়, প্লেটে রাইখা দেয়। ওইগুলা তো খাই।
কোথায় খাও?
ওই যে ওইখানে। খিচুড়ি বিক্রি করে, ভাত বিক্রি করে। আপারা খায়। মামারা খায়। তাগো রাইখা দেওয়া খাওয়া আমার লেইগা দোকানদার মামা রাইখা দেয়। ওইগুলাই তো খাই।
বুঝলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে শিক্ষার্থীরা দুপুরে খিচুড়ি-ভাত খায়। অনেকে শেষ করতে না পারলে প্লেটে খিচুরি-ভাত রেখে যায়। সেগুলো জমা করে ওর জন্য বিক্রেতা রেখে দেয়।
তোমার গরম ভাত খেতে ইচ্ছে করে?
হ। খাওয়াইবেন?
চলো। আমারও খিদে পেয়েছে। বলেই নীলক্ষেতের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম। পাশাপাশি খুদুও।
হোটেলে ঢোকার পর মেসিয়ার ছেলেটি এসে আমাকে বলেছিল, স্যার কী খাবেন? খুদুর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, এই তুই এখানে কী চাস?
কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলেছিলাম, খুদু আমার মেহমান।
মেসিয়ার ছেলেটি ভড়কে গিয়েছিল।
খুদু আমার সামনের চেয়ারে বসে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
বলেছিলাম, খুদু বলো কী খাবে?
গরম ভাত আর গরুর মাংস।
মেসিয়ারকে বলেছিলাম, তোমাদের কি ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাত আছে?
আছে স্যার, এইমাত্র নামাইছে চুলা থেকে।
ঠিক আছে, খুদুর জন্য ভাত আর গরুর মাংস দ্যাও। আমাকে সবজি আর ছোট মাছ।
ছেলেটি কিছুক্ষণ পর ভাত, গরুর মাংস এনে রাখল খুদুর সামনে। খুদুর চোখ চকচক করে উঠেছিল যেন।
মিথ্যে বলেনি মেসিয়ার ছেলেটি। প্লেটে ধোঁয়া উঠছিল ভাত থেকে। গরুর মাংসটাও গরম।
মাংসের গন্ধটা নাকে আসতে খেতে ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারের বারণ গরুর মাংস খাওয়া যাবে না। নিজেকে সংবরণ করে নিলাম মুহূর্তেই।
খুদু বেশ আয়েশ করে লেবু চিপড়ে প্লেট থেকে মাংস নিয়ে খেতে শুরু করেছিল।
মাংসের বাটি শেষ হওয়ার পর মেসিয়ার এসে প্লেট নিয়ে গিয়ে এক্সট্রা মাংস দিয়ে যায়। খুদু বেশ তৃপ্তি নিয়ে খেতে থাকে। আমি সবজি আর কাঁচকি মাছ খেতে খেতে খুদুকে বলেছিলাম, আরেক প্লেট গরুর মাংস খাও?
খুদু কেমন এক মায়াবী চোখে তাকিয়ে বলেছিল, আইজকা আর না। আরেক দিন খামু।
আরেক দিন অবশ্যই আমরা খাব। আজকে আরেক প্লেট আনুক?
খুদু আমার দিকে খানিক সময় তাকিয়ে ছিল।
সামনে ওর ভাতের প্লেট থেকে ধোঁয়া উঠছিল।
গরুর মাংসের প্লেট থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল।
কতকাল পরে খুদু ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাত খাচ্ছিল, কে জানে!