দীপু মাহমুদ
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৫ ১২:২৬ পিএম
অলংকরণ : সুবাইতা বিল্লাহ, সপ্তম শ্রেণি, সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা
রিনি অস্থির হয়ে গেছে। পুরো ছাদ ছুটে বেড়াচ্ছে। থামছে না। তার রাগ হলে এমন করে। বেশি রাগ হলে সে হাতের কাছের জিনিসপত্রও ভেঙে ফেলে। ডাক্তার বলেছেন, রিনির ভেতর কিছু অস্বাভাবিকতা আছে। ডাক্তারি ভাষায় তাকে বলে অটিজম। রিনির বয়স দশ বছর। সে একজন অটিস্টিক শিশু। সবাই তাকে আদর করে। রিনি সবার সঙ্গে মিশে খেলা করে। তবে রেগে গেলে অস্থির হয়ে যায়। সে সব সময় রাগে না। তার ভালোবাসার জিনিসের কেউ ক্ষতি করলে রেগে যায়।
অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে রিনির মায়ের ফুলের বাগান আছে। বাগানে ফুল গাছে অনেক রকমের ফুল ফোটে। এখন শীতকাল। বাগানে চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, পিটুনিয়া আরও কত রকমের ফুল ফুটে আছে! রিনি প্রতিদিন বাগানে গিয়ে ফুলের সঙ্গে কথা বলে। চন্দ্রমল্লিকার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর দিতে দিতে বলে, রোদটা খুব মিষ্টি তাই না! এখন আর শীত লাগছে না। আরাম লাগছে।
রিনির কথা শুনে বাতাসে দোল খেয়ে হেসে ওঠে চন্দ্রমল্লিকা। বাতাসে গাঁদা ফুল মাথা নাড়ায়। পিটুনিয়া থিরথির করে পাপড়িগুলো কাঁপিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে।
আজ সকালে রিনি ছাদবাগানে এসে দেখে অনেক চন্দ্রমল্লিকা ফুল মাথা নুইয়ে আছে। রোদ ঝলমল করছে। তবু তারা মাথা তোলেনি। কয়েকটি চন্দ্রমল্লিকা ফুল ছেঁড়া। নিচে পড়ে আছে।
রিনির মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ফুলগুলোর এমন অবস্থা দেখে সে প্রচণ্ড রেগে গেল। রাগে উত্তেজনায় এখন পুরো ছাদ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে থামানো যাচ্ছে না।
গতকাল ছিল পিয়ালের জন্মদিন। পিয়ালের বয়স এবার বারো বছর হলো। গতদিন সন্ধ্যার পর অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে পিয়ালের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানে তার আত্মীয়স্বজন আর ইশকুলের বন্ধুরা এসেছিল। তাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল কেউ যেন ফুল না ছেঁড়ে। এখন দেখা যাচ্ছে কয়েকটি চন্দ্রমল্লিকা গাছের ডাল ভেঙে আছে। ছেঁড়া ফুল নিচে পড়ে আছে।
পিয়ালকে দেখে রিনি জিজ্ঞেস করল, ফুলগুলোর এমন অবস্থা কেন করেছ?
পিয়াল চোখ নাচিয়ে, হাত নেড়ে বলল, শোনো ঘটনা কী হয়েছে। গতরাতে যখন আমরা গান গাইছিলাম তখন গান শুনে ফুলগুলো নাচছিল। কয়েকটি ফুল গাছ থেকে নেমে এসে নাচতে শুরু করল। অনেকক্ষণ নেচে ফুলগুলো ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। যে ফুলগুলো গাছ থেকে নিচে নেমে এসে নাচছিল তার ভেতর কতগুলো ফুল নাচতে নাচতে এত বেশি ক্লান্ত হয়ে গেছে যে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। গাছে ফিরে যেতে পারেনি।
রিনি চিৎকার করে বলল, তুমি ভুল কথা বলছ। ভুল কথা বলছ। ভুল কথা বলছ।
বলতে বলতে রিনি পুরো ছাদ লাফিয়ে বেড়াতে থাকল। রিনিকে রেগে যেতে দেখে পিয়ালের মন খারাপ হয়। সে বাসায় চলে যায়। রিনির মা এসে রিনিকে বোঝাতে চাইলেন। বললেন, কেউ যদি ফুল ছিঁড়ে থাকে, গাছের ডাল ভেঙে থাকে তবে সে অন্যায় করেছে। সে সরি বলবে।
রিনি কিছু বুঝতে চাইছে না। সে রাগে পুরো ছাদে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে আর বলছে, ছাদে আর কোনো ফুল রাখতে হবে না। সব ফুল বিদায় করে দাও।
শান্তা এসেছে। শান্তা আর রিনি সমান বয়সের। শান্তা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। শান্তার মা বাসায় কাজে রিনির মাকে সাহায্য করে। রিনির জন্য শান্তা মাটির পাত্রে ঘন সবুজ পাতার ভেতর ফুটে থাকা অনেক হলুদ ফুল নিয়ে এসেছে। এমন সুন্দর ফুল দেখে রিনির মন ভালো হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে শান্ত হয়ে বলল, কোথায় পেয়েছ এমন সুন্দর ফুল?
শান্তা বলল, আমাদের বাড়ির বেড়ার ধারে ফুটে আছে।
মাকে ডেকে রিনি বলল, মা, এ ফুল তুমি ছাদবাগানে লাগাবে।
মা বললেন, অবশ্যই লাগাব। এ ফুলের নাম সিঙ্গাপুর ডেইজি। আগাছার মতো এখানে সেখানে হয়ে থাকে। তবে আজ থেকে তারা থাকবে এ ছাদবাগানে।
রিনি খুশি হয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
পিয়াল বুঝতে পেরেছে সে বানিয়ে কথা বলে ভুল করেছে। ছাদে গিয়ে রিনিকে বলল, বানিয়ে কথাগুলো বলে অন্যায় করেছি। আমাদের ফুল গাছের দিকে খেয়াল রাখা দরকার ছিল। আমরা সাবধান ছিলাম না। তাই ফুলগুলো ছিঁড়ে গেছে। সরি।
ঝলমলে রোদ্দুরে ফুলগুলোও খুশি হয়ে উঠেছে। বাতাসে দুলতে দুলতে তারা মাথা তুলে হেসে উঠল।