আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৫ ১০:৩৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
৮ মার্চ নারী দিবস। এর সঙ্গে আসবে প্রচুর আলাপ-আলোচনা, টকশো, প্যানেল ডিসকাশন, অনলাইন কেনাবেচার নানা অফার। এ কটা দিন এ দিবস ঘিরে চলবে নানা আয়োজন, থাকবে নানা ব্যস্ততা। মেকআপ, স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট আর পোশাক কেনায় থাকবে ছাড়, আপনি যেন নিজেকে সুন্দর দেখাতে আরও খরচ করেন সে রাস্তাটা হবে আরও প্রশস্ত। আসলেই কি নারীরা শুধু এসব চায়?
নারীরা যে বাসায় থাকে, সে বাসা নিজের মতো করে সাজায়। সকাল থেকে রাত অবধি ভাবতে থাকে, সংসারের কোন জিনিসটা কীভাবে গুছিয়ে রাখলে কাজ আরেকটু সহজ হবে। আজ ঘরের এ জিনিস ফেলনা তো কাল ওইটা কিনতে হবে। নারীরা অফিসে যায়, কাজ করে, বাসায় ফিরে আবার এগুলো নিয়েই ভাবে। ঘরের কোণ কর্নারটা কীভাবে গোছালে আরও দুটি বই বেশি রাখা যাবে সে নিয়েও ভাবনা তাদের। যদি কেউ আপনার কাছে জানতে চায়, ভাড়া বাসায় এভাবে না থেকে একটা ফ্ল্যাট কিনে নিলেই পারেন। আপনি তখন তাকে কী বলবেন? যে ঘরে আপনি থাকেন, সেখানে আপনি শুধু শারীরিকভাবেই থাকেন না, আপনার মনমস্তিষ্ক সবই থাকে। অর্থাৎ নারীদের যে হেডস্পেস সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা আসলে এ হেডস্পেসে বাস করে। এজন্যই তারা পুরোপুরি নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারে না। তাদের মস্তিষ্কে সব সময় কোনো না কোনো বিষয় নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, মনে হয় যেন মাথার ভেতর যুদ্ধ চলছে সব সময়! নারীদের মস্তিষ্ক যেন পরবর্তী সময়ের পরিকল্পনা সফল করার জন্য সব সময় প্রোগ্রামিং করা থাকে। পরের বেলায় কী রান্না হবে, নেক্সট মিটিংয়ে কী বলবে, পরিবারের অন্যান্য ঝামেলা কীভাবে সামলাবে, আজ কী কী বাজার করে নিয়ে যেতে হবে, বাসার বুয়া ঠিকমতো কাজ করছে কি না, রান্নায় লবণ ঝাল ঠিক হলো কি না এমন নানা চিন্তা-দুশ্চিন্তা সব একসঙ্গে নিয়ে নারীরা পথ চলতে থাকে। বহু বছর আগে নারীদের এ অবস্থা নিয়েই ভার্জিনিয়া উলফ লিখেছিলেন ‘এ রুম অব ওয়ানস ওন’। তর্কবিতর্ক হয়েছিল সে লেখা নিয়ে। আসলেই কি তা নয়? নারীরা সুন্দর চার দেয়ালের ঘরের কথা বললেও, তারা আসলে বন্দি থাকে তাদের মস্তিষ্কে।
আপনি কখনও একজন নারীর হ্যান্ডব্যাগে দেখেছেন তার ভেতর কী কী থাকে? সহজ ভাষায় বললে এটা হচ্ছে তার ওভারলোডের একটা হেডস্পেস। একজন নারীর ব্যাগে লিপ বাম, সানস্ক্রিন, পকেট পারফিউম, চিরুনি, আয়না, ডেন্টাল ফ্লস, পানির বোতল, ছাতা, ছোট্ট একটা স্ন্যাক, ফেস ওয়াইপস, টিস্যু, চুলের ক্লিপ, সেফটি পিন সবই পাবেন। নারী সব সময় এ জিনিসগুলো সঙ্গে রাখে। যদি কখনও প্রয়োজন পড়ে কোনো একটার? ব্যাগ দেখলেই বোঝা যায় নারীদের মাথায় আসলে খালি কোনো জায়গাই নেই!
অন্যদিকে একজন পুরুষের পার্সে দেখবেন জাস্ট টাকা আর কার্ড ছাড়া তেমন কিছু নেই। এমন পুরুষ খুব কম আছেন যাদের কাছে সানস্ক্রিন আর লিপ বাম থাকে। নারীদের এমন অনেক পুরুষ কলিগ রয়েছেন যারা অফিসে আসার আগে শেভও করেন না। তারা সব সময় বেশ কুল মাইন্ডেই থাকেন। জীবনের জটিলতা ঘাড়ে নিয়ে চলতে তাদের ভালো লাগে না। তাদের মতে ‘আমি যেভাবে চলতে চাই, সেভাবেই চলব, কারণ আমার ভালো লাগে!’ এত নির্ভাবনায় তাদের থাকতে দেখে নারী হিসেবে মাঝে মাঝে আপনার কখনও মনে হয় যে, আপনি কি আসলে বেশি ভাবছেন?
বাংলাদেশের নারীদের জীবনের বোঝা বয়ে চলাটা ঐচ্ছিক না হলেও এটা যেন ঐতিহ্য। দিনদিন বোঝা বাড়লেও কারও কিছু বলার নেই। যদি এ চাপ সন্তানদের জন্য না-ও হয়, এর পরও সেখানে ঘর সামলানোর নানা কাজ থাকবে, স্বামীর দায়িত্ব থাকবে, অভিভাবকের দায়িত্ব থাকবে। সেই সঙ্গে ক্যারিয়ারের একটা চাপ তো থাকেই, যদি নারী কাজ করতে চায়। আর এসব চাপ যখন একসঙ্গে আসে, তখন আর ভ্রু প্লাক করতে ভালো লাগে না, সুন্দর জামাটাও পরতে ইচ্ছে করে না, মেকআপ করে ত্বক সুন্দর দেখাতে ইচ্ছে হয় না। শুধু মনে হয়, এ মানসিক চাপগুলো কোনোভাবে কমে যাক। কেউ একজন বোঝাটা কমিয়ে দিক। নারী হয়েও একটু নির্ভাবনায় ঘুরি! নারীরা জানে কোন কালার কারেক্টর লাগালে তাকে মানাবে, কোন কুশন কভারটা ঘরে সাজালে সুন্দর লাগবে, টেবিল সাজাতে কী কী লাগবে, শুধু জানে না মস্তিষ্কের ব্লক ছুটানোর উপায়টা কী!
নারীদের বলতে চাইÑ ছুটে বেড়ানোর জন্য কোনো তাড়াহুড়ো কোরো না, সব সময় তারা হয়ে জ্বলজ্বল করার দরকার নেই, কারও মতো হতেই হবে এ চাপ মাথায় নিও না, শুধু নিজের মতো থাকো। নিজেকে ভালোবাসো, যতটা আকাশ ছোঁয়া যায়, ছুঁয়ে দাও। স্বপ্নপূরণের জন্য যা যা দরকার করো। সেটা শুধু নারী দিবস থাকুক বা না থাকুক
একজন নারীর কথা বলি। যে তার বান্ধবীদের নিয়ে ট্যুরে যায় মাঝেমধ্যে। এসব গ্রুপে গিয়ে সে দেখেছে নারীরা যতটা না ঘুরতে যায়, ততটা আসলে সংসারেই পড়ে থাকে। ঘুরতে আসার আগে বাড়তি চাপ নিয়ে পরিবারের সবার জন্য পছন্দের খাবার তৈরি করে সেগুলোতে লেবেল লাগিয়ে ফ্রিজে রেখে আসে, কোন বক্সে কোন বেলার খাবার, কী কী স্ন্যাকস আছে সব গুছিয়ে আসার পরও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাসা থেকে কারও না কারও ফোন আসতেই থাকে। কোন জিনিসটা কোথায় আছে, কেন সে খুঁজে পাচ্ছে না, কীভাবে খাবার খেয়ে প্লেট ধুয়ে গুছিয়ে রাখবে সেটার জন্যও নাকি তাকে দরকার। একের পর এক ফোনকল তো আছেই, সঙ্গে সন্তান, বাবা-মা, স্বামী সবাই ভিডিও কলও করে যাচ্ছে; যেন সে একজন ক্রাইসিস ম্যানেজার! সে না থাকাতেই বাসার কোনো কাজ হচ্ছে না, কেউ কিছু সামলাতে পারছে না! সেই নারীদের দেখলে তার বারবার মনে হতো, মাল্টিটাস্কিং কখনোই একটা কমপ্লিমেন্ট নয়, বরং মাথায় আরও একটা বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার টিকিট!
আমাদের দেশে নারীদের কাজ নিয়ে হাস্যকর নানা কৌতুক বানানো হয়। সম্প্রতি এমন একটি কৌতুক তো বেশ ভাইরাল হয়েছে! পোস্টে বলা ছিল, ‘ইফতারের পর বউকে জড়িয়ে ধরুন দেখবেন ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।’ সেই পোস্টের কমেন্টেই রিপ্লাই ছিল, ‘বউকে জড়িয়ে ধরব? কি বিচ্ছিরি রান্নার গন্ধ আসে শরীর থেকে!’ সে কমেন্টের পাল্টা উত্তরে অনেক লেখা শেয়ার হয়েছে। আপনার কখনও মনে হয়েছে, নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে যে পরিবারের জন্য আপনি রোজা রেখে, অফিস করে, ঘরে ফিরে ইফতারির সব আইটেম বানাচ্ছেন, খাওয়া শেষে সব যখন আবার আপনাকেই সামলাতে হচ্ছে, তখন আবার আপনাকেই শুনতে হচ্ছে, আপনার শরীর থেকে রান্নার গন্ধ আসে? যে পুরুষ এগুলো বলেন, তারা কি কখনও রান্নাঘরে ঘিয়ে ঘণ্টাখানেক চুলার পাশে তপ্ত গরমে রান্না করে দেখেছেন কেমন অনুভূত হয়? মায়েরা কীভাবে সন্তানদের শাসন করতেন তা নিয়ে মজা করা যায়, কৌতুক বানানো যায়, শুধু মায়েদের মাথার ভেতর যে বোঝা সব সময় পাথরের মতো চেপে বসে থাকে, সেটা কমানো যায় না।
প্রতি বছর নারী দিবস আসে। নারীদের নিরাপত্তা, বেঁচে থাকার অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এমন নানা বিষয় নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে কথা হয়। এগুলো নিয়ে সবাই কথা বলে, বলবেই। একজন সাধারণ নারী হিসেবে আমার চাওয়া শুধু নারী দিবসকেন্দ্রিক নয়। নারীরা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত বোঝা বয়ে না বেড়াক। অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপে তারা ডুবে না যাক। সংসার, কর্মজীবন সামলে নিজের ও অন্যদের সব দায়িত্বও না নিক। কখনও কখনও একা থাকুক, নিজেকে ভালোবাসুক, যে বোঝাগুলো কেউ দেখতে পায় না সে বোঝার দায় সে একা নিয়ে পথ না চলুক, সৌন্দর্য দিয়ে কেউ তাদের বিচার করুক। স্কিন পলিশ করার জন্য কোনো প্রোডাক্টে ডিসকাউন্ট দরকার নেই, রান্নাঘরের দায়িত্ব পুরোপুরি বুঝে নেওয়ার জন্য কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেও ছাড় না থাকুক। নারীরা নিজেদের বছরের এই এক দিন নয়, সব সময় উড়তে শিখুক। নারী হয়ে বলছি আমি আমার জন্য আলাদা করে নারী দিবসও চাই না, চাই প্রতিটি দিন আমাদের হোক। নারীদের বলতে চাইÑ ছুটে বেড়ানোর জন্য কোনো তাড়াহুড়ো কোরো না, সব সময় তারা হয়ে জ্বলজ্বল করার দরকার নেই, কারও মতো হতেই হবে এ চাপ মাথায় নিয়ো না, শুধু নিজের মতো থাকো। নিজেকে ভালোবাসো, যতটা আকাশ ছোঁয়া যায়, ছুঁয়ে দাও। স্বপ্নপূরণের জন্য যা যা দরকার করো। সেটা শুধু নারী দিবস থাকুক বা না থাকুক। নারী হয়ে আমিও বলতে চাইÑ ‘আমাকে শুধু আমার মতো বাঁচতে দাও’।