নাবিলা বুশরা
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৫ ১০:৩১ এএম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৫ ১২:২৭ পিএম
যাদের ঘরে পোষা প্রাণী আছে, তারা ভালো করেই জানেন, এরা অসুস্থ হলে এদের চিকিৎসার জন্য কতটা ছোটাছুটি করতে হয়। ভালো পশুচিকিৎসক খুঁজে পাওয়া, ওষুধের ব্যবস্থা করা এসবের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো অসুস্থ প্রাণীটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। গাড়ি, সিএনজি বা বাইক কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। ট্রান্সপোর্টের অভাবে অনেক সময়ই প্রিয় পোষ্যটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ সমস্যার সমাধান করতে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে পেট অ্যাম্বুলেন্স ‘সুস্থতা’। একটি ফোনকলেই এ অ্যাম্বুলেন্স ছুটে আসবে আপনার দরজায়, যার মাধ্যমে নিরাপদে এবং সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাবে আপনার পোষ্য।
পেট অ্যাম্বুলেন্স চালুর পেছনের গল্প
মানুষের জীবন বাঁচাতে অ্যাম্বুলেন্সের গুরুত্ব আমরা সবাই জানি। কিন্তু ঠিক সময়ে ট্রান্সপোর্টের অভাবে অনেক প্রাণই ঝরে পড়ে। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে কয়েকজন তরুণ মিলে শুরু করেন ‘সুস্থতা’Ñএক কলেই অ্যাম্বুলেন্স সেবা। ২০২৪ সালের ৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে এ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সারা দেশে সাড়ে ছয়শর বেশি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে তারা।
‘সুস্থতা’র আরও একটি লক্ষ্য হলো দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের সাহায্য করা। তারা ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তুরস্কের ৫০টির বেশি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে চান, তাহলে সুস্থতা তাদের ভিসা প্রসেসিং থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট পিকআপ, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং ডাক্তার দেখানো পর্যন্ত সব ধরনের সহায়তা দেয়।

পেট অ্যাম্বুলেন্সের ধারণা কীভাবে এলো?
‘সুস্থতা’র চেয়ারম্যান অ্যাঞ্জেলো আফনান হামিদ এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মেজবাউল আমিনের মাথায় পেট অ্যাম্বুলেন্সের ধারণাটি আসে বেদনাদায়ক এক অভিজ্ঞতা থেকে। আফনান হামিদের পোষা কুকুরটি ট্রান্সপোর্টের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়। এ ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, পোষা প্রাণীদের জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা নেই। এ সমস্যা সমাধানে তিনি এবং তার টিম এগিয়ে আসে।
তবে শুরুর এ যাত্রাটা সহজ ছিল না। শুরুতে অনেক অ্যাম্বুলেন্স চালকই এ ধারণা সমর্থন করেননি। এমন লোক খুঁজে বের করতে হয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় প্রাণীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। যদিও সংখ্যাটা এখনও কম, তবে ভবিষ্যতে এ সংখ্যা বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।
এখন পর্যন্ত পাওয়া সাড়া
‘সুস্থতা’র পেট অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু হওয়ার পর থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে তারা। পোষ্য মালিকরা এখন অনেকটা নির্ভার। কারণ তারা জানেন, দিনে বা রাতে যেকোনো সময় একটি ফোনকলেই ‘সুস্থতা’ তাদের দরজায় হাজির হবে। এ ভরসাটুকুই অনেক বড় একটি অর্জন।
প্রাণীদের নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সুস্থতা টিমের লক্ষ্য হলো দেশের পশুস্বাস্থ্যসেবা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তারা দেখেছেন, প্রাণীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ট্রান্সপোর্টব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এ শূন্যতা পূরণ করতেই তারা এগিয়ে এসেছেন।
বুকিং প্রক্রিয়া কেমন
‘সুস্থতা’র সেবা নেওয়ার প্রক্রিয়াটা খুবই সহজ। যেকোনো সময় তাদের হটলাইন নম্বরে কল করলেই দ্রুত সাহায্য পাঠাবে। তাদের লক্ষ্য হলো ২৪/৭ সার্ভিস দেওয়া। রাত ২টা বা ৩টায়ও যদি আপনার পোষ্য অসুস্থ হয়, তাহলে আপনি নির্দ্বিধায় তাদের কল করতে পারেন। তারা জানেন, একটু সময়ের ব্যবধানে কীভাবে একটি প্রাণ বাঁচতে পারে! তাই তারা কোনো ধরনের সময় নষ্ট করে না।
সুস্থতার সিওও তৈয়ুবুর রহমান জানান, অনেকেই ভুলভাবে ধারণা করছেন তাদের সার্ভিস ফ্রি বা তারা স্ট্রে অ্যানিমেলদের চিকিৎসা দেন। আসলে সুস্থতা শুধু একটি নিরাপদ ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস। তারা প্রাণীকে ক্লিনিক বা হাসপাতালে নিয়ে যাবে, কিন্তু চিকিৎসা দেবে না। তাদের সার্ভিস ফ্রি নয়, তবে চার্জ যুক্তিসঙ্গত। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য তারা যে চার্জ নেয়, ঠিক একই চার্জ প্রাণীদের জন্যও প্রযোজ্য।
‘সুস্থতা’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
‘সুস্থতা’র পেট অ্যাম্বুলেন্স সেবা শুধু পোষ্যদের জন্য নয়। রাস্তার যেকোনো প্রাণী এ সেবা পাবে। তাদের লক্ষ্য হলো সব প্রাণীর জন্য একটি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। প্রতিটি প্রাণীর জীবনই মূল্যবান এবং এ প্রাণ যেন জরুরি সেবার অভাবে মারা না যায়, সেটাই তাদের প্রচেষ্টা।
প্রাণীদের জন্য ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করেছে ‘সুস্থতা’। বর্তমানে তারা শুধু ঢাকায় সেবা দিচ্ছে, তবে খুব শিগগিরই দেশের অন্যান্য শহরেও তাদের সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কীভাবে সেবা নেবেন?
পোষ্য মালিকরা সুস্থতার সেবা নিতে পারেন তাদের হটলাইন নম্বর ০৯৬০১২২২৭৭৭-এ কল করে অথবা ভিজিট করতে পারেন তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.susthotaa.com-এ।
‘সুস্থতা’র এ উদ্যোগ শুধু একটি সেবা নয়, এটি একটি মানবিক দায়বদ্ধতা। প্রাণীদের জীবন বাঁচানোর এ প্রচেষ্টা সমাজে তৈরি করবে আরও বেশি দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা।