নাহিয়ান
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৫ ১০:২৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
গত বছর সিলেটের ছোট্ট মুনতাহার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল। তার লাশ পাওয়ার খবরে সারা দেশ শোকাহত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, শিশু নিখোঁজের ঘটনা এখন প্রায় নিত্যদিনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানকে একা কোথাও পাঠানোর সময় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আত্মীয়-প্রতিবেশীর প্রতি আস্থাও দিনদিন কমে যাচ্ছে। মানসিকতার পরিবর্তন এক দিনে সম্ভব নয়, তাই আমাদের সতর্ক হতে হবে। এ সতর্কতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর প্রস্তুতি চলছে। এ উদ্যোগ সফল হলে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
অ্যাম্বার অ্যালার্ট কী?
অ্যাম্বার অ্যালার্ট (Amber Alert) হলো একটি জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা, যা অপহৃত শিশুদের দ্রুত সন্ধান ও উদ্ধারে সাহায্য করে। শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটলে জনগণকে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করে এ সিস্টেম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপের ৩১টি দেশ, নাইজেরিয়া, চীন ও কেনিয়ায় অ্যাম্বার অ্যালার্ট সফলভাবে চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও শিশু অপহরণ, নিখোঁজ ও পাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
অ্যাম্বার অ্যালার্টের ইতিহাস
১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নয় বছর বয়সি অ্যাম্বার হেগারম্যানকে অপহরণ ও পরে হত্যা করা হয়। এ মর্মান্তিক ঘটনার পর তার পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটি একটি জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়, যাতে অপহৃত শিশুদের দ্রুত সন্ধান পাওয়া যায়। অ্যাম্বারের নামানুসারে এ ব্যবস্থার নামকরণ হয় ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ (America’s Missing Broadcast Emergency Response)। পরে এটি যুক্তরাষ্ট্রে সরকারিভাবে চালু হয় এবং ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
অ্যাম্বার অ্যালার্ট কীভাবে কাজ করে
অ্যাম্বার অ্যালার্ট সাধারণত কয়েকটি ধাপে কাজ করেÑ
১. অপহরণের রিপোর্ট : কোনো শিশু অপহরণের ঘটনা পুলিশে রিপোর্ট করা হলে তারা যদি নিশ্চিত হয় যে এটি একটি শিশু অপহরণের ঘটনা এবং শিশুটির জীবন বিপন্ন হতে পারে, তখন অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু করা হয়।
২. তথ্য সংগ্রহ : অপহৃত শিশুর ছবি, বর্ণনা, অপহরণকারীর তথ্য, ব্যবহৃত গাড়ির নম্বর, সময়, স্থানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা হয়।
৩. তথ্য প্রচার : এ তথ্যগুলো টেলিভিশন, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল বিলবোর্ড, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত প্রচার করা হয়। এর মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করা হয় এবং তারা যদি অপহৃত শিশুটিকে দেখতে পায়, তবে পুলিশকে জানাতে পারে।
৪. পুলিশের পদক্ষেপ : একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। অপহরণের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, কারণ এ সময়ের মধ্যে শিশুকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
বাংলাদেশে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর উদ্যোগ
বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর জন্য কাজ করছে ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন’ নামে একটি সংস্থা। এ সংস্থাটি ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাদাত রহমানের নেতৃত্বে গঠিত। সাদাত রহমান এ উদ্যোগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাদাত রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর তাদের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। যদি নিখোঁজ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে সন্ধান চালানো যায়, তবে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। অনেক শিশু স্বেচ্ছায় বাড়ি বা মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যায়, আবার অপহরণ ও গুমের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনাগুলো ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই যদি অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু করা যায়, তবে খারাপ কিছু হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।’
জিরো মিসিং চিলড্রেন সামিট
শিশু নিখোঁজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ২২ মার্চ, ২০২৫-এ বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র, আগারগাঁওয়ে ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন সামিট’ আয়োজন করা হচ্ছে। এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য হলোÑ
এ সামিটে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি অ্যাম্বার অ্যালার্ট বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন। এ ছাড়া নিখোঁজ শিশুদের পরিবারও এ সম্মেলনে অংশ নেবে। এ আয়োজনের মাধ্যমে সরকারের কাছে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর জন্য পিটিশন জমা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ১ লাখের বেশি মানুষ এ দাবিতে স্বাক্ষর করেছে এবং ক্রমেই এ সংখ্যা বাড়ছে।
সরকারের ভূমিকা
অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর জন্য সরকারের সদিচ্ছা অপরিহার্য। এ সিস্টেম চালু করতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। সরকার যদি এ উদ্যোগ সমর্থন করে, তবে বাংলাদেশেও শিশু নিখোঁজের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে।
শেষ কথা
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু হলে শিশু নিখোঁজের ঘটনা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন’ সংস্থা এবং সাদাত রহমানের নেতৃত্বে চলমান আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা যদি সবাই একত্র হয়ে কাজ করি, তবে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আসুন, আমরা সবাই মিলে এ উদ্যোগ সমর্থন এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।