ফারহাত মাইশা
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৪:৫০ পিএম
একুশে পদক গ্রহণ করলেন অভ্র’র চার নির্মাতা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক গ্রহণ করেছেন অভ্র কিবোর্ডের চার নির্মাতা। তারা হলেন মেহদী হাসান খান, রিফাত নবী, মো. তানবিন ইসলাম সিয়াম ও শাবাব মুস্তাফা। (২০ ফেব্রুয়ারি) এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন।
২০০৩ সালে চালু হওয়া অভ্র কিবোর্ড বাংলা টাইপিংয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। ধ্বনিগত টাইপিং পদ্ধতির মাধ্যমে এটি ব্যবহারকারীদের জটিল কিবোর্ড লেআউট ছাড়াই বাংলা লেখার সুযোগ দেয়, যা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। চলতি বছরে এই ক্যাটাগরিতে একুশে পদকের জন্য প্রথমে শুধু মেহদী হাসান খানকে মনোনীত করা হয়েছিল, যাকে অভ্র কিবোর্ড তৈরির কারিগর বলা হয়। পরে মেহদী হাসানের অনুরোধে অভ্র তৈরিতে তার সঙ্গে বাকি তিনজনকেও পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ কিবোর্ড তৈরি করতে গিয়ে তার ও সহযোগীদের পথচলা তুলে ধরেছেন মেহদী হাসান। বলেছেন, এ পথচলায় স্বার্থহীন মানুষ যুক্ত ছিলেন বলে স্বার্থপর লোকজন তাদের আটকাতে পারেননি।
অভ্র কিবোর্ডের শুরুর দিকের কথা তুলে ধরতে গিয়ে ফেসবুকে মেহদী হাসান খান লেখেন, ‘২০০৩ সালে যখন অভ্রর কাজ শুরু করলাম, তখন অভ্র বা আমাকে কেউই চিনত না। একটা ফোরাম বানালাম মানুষের টেকনিক্যাল সমস্যার সমাধান দেওয়ার জন্য। ইউনিকোডের ব্যবহার তখনও নতুন, হাজারটা সমস্যা। ধীরে ধীরে মানুষ জমতে শুরু করল অনলাইন ফোরামে। তারা সমস্যা নিয়ে আসে, আমি সমাধান বের করার চেষ্টা করি অথবা বাগ (ত্রুটি) থাকলে ঠিক করে নতুন রিলিজ দিই। কিছু মানুষ, আমি যাদের চিনি না, তারাও আমাকে চেনে না, এরা শুধু সমস্যা নিয়ে আসার বদলে ধীরে ধীরে বাকিদের সমস্যা সমাধানে আমার সঙ্গে যোগ দেওয়া শুরু করল। একসময় অনলাইন ফোরামের বাইরে এদের সঙ্গে দেখা করলাম। সবাই ছাত্র তখন আমরা। কোনো কারণে অভ্রর মিশনটায় তারা বিশ্বাস করেছে, এর বাইরে আর কোনো চাওয়াপাওয়া নেই তাদের।’
মেহদী হাসান লেখেন, ‘ফোরাম থেকে শুরু হয়ে বাংলা ফন্ট বানানো, সফটওয়্যার বানানো সবকিছু একসঙ্গে করলাম আমরা। বিভিন্ন সময়ে এ রকম অবদান রাখা অনেকে এসেছেন, চলেও গিয়েছেন নানা কারণে। কিন্তু কোনো কারণে হাতেগোনা কয়েকজন লেগে থাকলাম আমরা বছর দশেকের ওপর। স্বার্থহীন এমন মানুষজন একসঙ্গে ছিল দেখে স্বার্থপর লোকজন চেষ্টা করেও আমাদের আটকাতে পারেনি।’ একুশে পদক প্রসঙ্গে মেহদী হাসান খান বলেন, ‘আমি সবাইকে খুশি করতে পারব না। কিন্তু দলের কাজের কৃতিত্ব একক ব্যক্তি না পাক, আমার সামর্থ্য দিয়ে এটুকু চেষ্টা করতে পারি। একুশে পদক ঘোষণার পরে অ্যাডভাইজার (উপদেষ্টা) ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। ওনাকে ব্যাপারটা বোঝাতে খুব বেশি চেষ্টা করতে হয়নি, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। ২০০৩ সাল থেকে অনেকে অভ্রর কাজে সাহায্য করেছেন, এদের সবার অবদান আছে। কিন্তু শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত আমরা যারা একসঙ্গে কাজ করেছি- রিফাত, সিয়াম, শাবাব এদের ছাড়া আমি অভ্রর নামে একুশে পদক গ্রহণ করতে পারব না। উনি মেনে নিয়েছেন, বাকিদেরও রাজি করিয়েছেন। ওনাদের কথা ছিল- পদক গ্রহণ করা বা না করার কথা পরে, রাষ্ট্রের কাজ জানানো যে আপনাদের কাজের জন্য রাষ্ট্র কৃতজ্ঞ। তারা তা-ই করেছেন। আমিও মেনে নিয়েছি। পরের প্রজন্মের জন্য অভ্রর মিশনটা যদি রেখে যেতে হয়, সঙ্গে আমাদের টিমওয়ার্কটাও উদাহরণ হিসেবে থাকুক। একা একা তো বেশি দূর যাওয়া যায় না।’
আগে কম্পিউটারে বাংলা লেখা ছিল খুব কঠিন একটা কাজ। একমাত্র বিজয় কিবোর্ডের মাধ্যমেই কাজ চলত বাংলা লেখা। এখন আমরা বিজয়ের পাশাপাশি অভ্র নামে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করি, যার মাধ্যমে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোনে বাংলা সহজেই লেখা যায়। সফটওয়্যারটি দিয়ে ইংরেজি অক্ষরে ‘ami vat khai’ টাইপ করলে খুব সহজেই বাংলায় ‘আমি ভাত খাই’ লেখা হয়ে যায়।
অভ্রর আবিষ্কারক মেহদী হাসান খান। তার আবিষ্কৃত সফটওয়্যার যত সহজে কম্পিউটারে বাংলা লেখার দীর্ঘ ঝক্কিঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে, অভ্র তৈরির পথটা কিন্তু ততটা সহজ আর মসৃণ ছিল না। ২০০৩ সাল। বাংলা একাডেমিতে চলছে বইমেলা। সে বইমেলায় ‘বাংলা ইনভেনশন থ্রু ওপেন সোর্স’, সংক্ষেপে বায়োস নামে একটি সংগঠন অংশ নিয়েছিল। সংস্থাটি বইমেলায় এসেছিল একটি প্রদর্শনী করতে। এ সংগঠনের সদস্যরা মেলায় বাংলায় লোকালাইজ করা একটি লিনাক্স ডিস্ট্রোর প্রদর্শনী করেছিলেন। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কম্পিউটারে বাংলা লেখাসহ টাইটেল মেনু ও ট্যাবের নাম বাংলায় লেখা। ওই সিস্টেমটি নজর কাড়ে সবার, পরিচিতি পায় বায়োস।
সেদিন সে প্রদর্শনীর একজন খুদে দর্শনার্থী ছিলেন মেহদী। বায়োসের প্রদর্শনী দেখে তার মাথায় আসে এক অন্যরকম চিন্তা। কীভাবে এমন একটি সহজ সমাধান বের করা যায় যার মাধ্যমে কম্পিউটারে কোনো ঝামেলা ছাড়াই বাংলা লেখা যাবে। ২০০৩-এর বইমেলার সেই ছোট্ট ছেলেটিই ২০১৪ সালে অভ্র সফটওয়্যারের আবিষ্কারক ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র মেহদী হাসান খান।
অভ্রর আবিষ্কারে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে মেহদী হাসানকে। তার কম্পিউটার উইনডোজ বেইজড হওয়ায় লিনাক্স নিয়ে কাজ করাটা তার জন্য দুরূহ হয়ে ওঠে। বাংলা লিনাক্সের ওই ফন্টটি ইনস্টল করেন তিনি। এ সময়ই তার চোখে পড়ল অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড কিবোর্ডের ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে ওই ফন্টের ক্যারেক্টারগুলো বেশ ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এটি খুবই যন্ত্রণাদায়ক এবং সময়সাপেক্ষ। আরও কষ্টকর ছিল যুক্তাক্ষর লেখা।
এবার তিনি ভাবলেন, একটি কিবোর্ড এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তিনি ভেবেছিলেন কোথাও থেকে একটি কিবোর্ড নামিয়ে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা আর হলো না। তিনি বুঝতে পারলেন, এমন কিবোর্ড পেতে হলে তাকে কিবোর্ড তৈরি করতে হবে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব সেটা? ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ইউনিকোডভিত্তিক কিবোর্ড বানানোর চেষ্টা, দুটোই সমান্তরালে চলছে।
কষ্টের ফলস্বরূপ মাইক্রোসফটের ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে উইনডোজের জন্য একদিন বানিয়ে ফেললেন একটি প্রোটোটাইপ। কিন্তু তাতেও হলো না সঠিক সমাধান। ভারতে আয়োজিত বাংলা ফন্ট তৈরির প্রতিযোগিতায় তার পাঠানো প্রটোটাইপ বারবার ক্র্যাশ করছিল।
সমস্যা সমাধানে তিনি ক্লাসিক ভিজুয়ালের ওপর ভিত্তি করে নতুন আরও একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করলেন। ফলে ক্র্যাশের হাত থেকে মুক্তি পেল প্রোটোটাইপটি। সার্থক হলো তার সে বইমেলায় বায়োসের তৈরি ফন্ট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করা দীর্ঘ যাত্রা।
অভ্রর যাত্রায় মেহদী একা থাকলেও শেষে ধাপে ধাপে যুক্ত হয়েছেন অনেকেই, তৈরি হয়েছিল অভ্র টিম। অভ্রর ম্যাক ভার্সন প্রস্তুতকারী রিফাত উন নবী, অভ্রর কালপুরুষ ও সিয়াম রুপালি ফন্টের জনক সিয়াম, অভ্রর বর্তমান ওয়েবসাইট ও লিনাক্স ভার্সন প্রস্তুতকারী সারিম, ভারতের নিপন এবং মেহদীর সহধর্মিণী সুমাইয়া নাজমুনসহ অনেকের কষ্টের ফসল আজকের অভ্র।
অনেক কারণে অভ্র কিবোর্ড বেছে নিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। অভ্র দিয়ে যেকোনো কিবোর্ড লেআউট সাজানো যায়। অভ্রর কিবোর্ড সফটওয়্যারের সঙ্গে দেওয়া কিবোর্ড লেআউটের মাধ্যমে কাস্টম লেআউট নিজের মতো বানানো যায়।
অভ্র একটি ফ্রি সফটওয়্যার, সবার সঙ্গে সহজেই কপি শেয়ার করা যায়। অন্যদিকে বিজয় এন্ড-ইউজার লাইসেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অভ্রর যেকোনো সমস্যা, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের জন্য ওমিক্রন ল্যাবের মাধ্যমে সব ধরনের গ্রাহক সাপোর্ট দেওয়া হয়। এসব বিষয় অভ্রর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিনদিন বাড়িয়ে তুলছে।