× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বইমেলার স্টলসজ্জায় নান্দনিকতা

হাসনাত মোবারক

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৫২ পিএম

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:০৮ পিএম

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির আদলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টল 	ছবি : আলী হোসেন মিন্টু

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির আদলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টল ছবি : আলী হোসেন মিন্টু

চলছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেকটা অংশ জুড়ে বসেছে মেলা। এবারে মেলায় স্থান পেয়েছে ৭০৮টি প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান। মেলার সঙ্গে যেহেতু ক্রেতা-বিক্রেতা এবং বস্তুর একটা সম্পর্ক আছে, তাই ক্রেতা ও দর্শনার্থী কাছে টানতে প্রকাশকরা স্টল সাজিয়েছেন নিজস্ব রুচি ও আভিজাত্যে; যা হয়ে উঠেছে নান্দনিক। এমন চিত্তাকর্ষক কয়েকটি স্টল নিয়ে এ আয়োজন

লেখক, পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখর বইমেলা চত্বর। বলা যায় বাঙালির সংস্কৃতিচর্চার নান্দনিক পরিসর হয়ে উঠেছে এ প্রাঙ্গণ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম সমঝদার প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এ প্রতিষ্ঠানটি পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এদের একটি নিজস্ব প্রকাশনাও রয়েছে। এ প্রকাশনাটিও দীর্ঘদিন ধরে বইমেলায় স্টল নিচ্ছে। তাদের স্টলসজ্জা এবারের বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ। চার ইউনিটের এ স্টলটির সামনে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণা করছিলেন ধানমন্ডি থেকে মেলায় আসা সিনথিয়া ইসলাম নামে এক পাঠক। তিনি জানালেন, ‘আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন থেকে আমার ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সঙ্গে পরিচয়। এবার মেলায় ভ্রাম্যমাণ গাড়ির আদলে স্টল দেখে ভালো লাগছে।’ এ পাঠকের মতো অসংখ্য দর্শনার্থী ভিড় জমাচ্ছেন এ স্টলটির সামনে। ছবি তুলে তা সমাজমাধ্যমে প্রচারও করছেন। দৃষ্টিনন্দন এ স্টলটির কারিগর সঞ্জীব কুমার সাহা। এ নকশাকার পরপর তিন বছর এ স্টলটির অঙ্গসজ্জা করছেন। এবারের নকশাটি তার দুই বছর আগে করা। কিন্তু গত দুই বছর স্টলের ডিজাইন ছিল বই দিয়ে। এবারের লাল রঙের বাসের আদলে করা স্টলটি যেন তাক লাগিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। কথা হয় সঞ্জীব কুমার সাহার সঙ্গে। অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, ‘জীবনে অনেক কাজ করেছি। তবে এ বছর বইমেলায় আমার করা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলটির প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত। যখন স্টল বানানোর কাজ চলছিল তখন একদল কিশোর এলো। ওদের ধারণা গাড়ির দ্বিতীয় তলায়ও গিয়ে বই পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। তাই ওরা আমাকে বলল, আঙ্কেল গাড়ির সিঁড়ি কই। আমরা কীভাবে ওপরে উঠব? তখন ওদের আশ্বস্ত করে বললাম, ওইটা ডিজাইন। ওপরে বইপত্র থাকবে না।’

একুশের আলপনা দিয়ে তৈরি কবি প্রকাশনীর স্টল

কবি প্রকাশনী। বরেণ্য আর চিরায়ত বইয়ের প্রকাশনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি। মানে ভালো আর নান্দনিক বইয়ের জুড়ি যেন এ প্রতিষ্ঠান। বইয়ের প্রচ্ছদ আর নকশায় খুব যত্নশীল তারা। আর হবেই না বা কেন! কবি’র অধিকাংশ বইয়ের কাজ করেন খ্যাতিম্যান শিল্পী সব্যসাচী হাজরা। এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সাল থেকে বইমেলায় স্টল নিয়ে বসছে। তিন বছর ধরে তারা স্টলে আনছে ভিন্নমাত্রা। দুই ইউনিটের স্টল নিয়েও যে দর্শনার্থীর নজর কাড়া যায়, তার প্রমাণ স্টলটি। একুশের আলপনা দিয়ে তৈরি। সাদা-কালো মিশেলে তৈরি এ স্টলটির নকশাকারও শিল্পী সব্যসাচী হাজরা। প্রকাশনাটির স্বত্বাধিকারী সজল আহমেদ বলেন, ‘কালোকে ধারণ করা হয়েছে একুশের শোক থেকে। আর একুশের প্রভাতফেরিতে আমরা শহীদ মিনারে যে ফুল অর্পণ করি তার রঙ সাদা। মূলত এ ভাবনা থেকে শিল্পী স্টল নির্মাণ করেছেন।’

রংপুরের লোকশিল্প শতরঞ্জির আদলে নবান্ন প্রকাশনীর স্টল

ঐতিহ্যবাহী নাম ধারণ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘নবান্ন’। এবার এ প্রকাশনার স্টলটি সেজেছে দুই ইউনিটের পরিসর নিয়ে। প্রকাশনাটি বয়সে নবীন হলেও তারা ধারণ করছে হাজার বছরের বাংলা ঐতিহ্য। শুরু থেকে তারা লোকশিল্পের ঐতিহ্য ধারণ করে আসছে স্টল নির্মাণের বেলায়। প্রথম বছর লোকজ আঙ্গিকে সাজানো হয়েছিল। দ্বিতীয় বছরে তাদের স্টল সাজানো হয়েছিল রিকশাচিত্র দিয়ে। মজার ব্যাপার, সে বছর মেলার কয়েক মাস পর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় ‘রিকশা ও রিকশাচিত্র’। গত বছর পাহাড়িদের জুম চাষের মাচাং ঘরের আদলে এ প্রকাশনী স্টল নির্মাণ করে। এ বছর তারা স্টল বানিয়েছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি দিয়ে। শতরঞ্জি শিল্প জনসম্মুখে তুলে ধরতে তাদের স্টলটি বানানো হয়েছে। লোকঐতিহ্য সুরক্ষার জন্যই মূলত এ স্টল তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন রংপুরের বিউটি শতরঞ্জির স্বত্বাধিকারী শিল্পী আনোয়ার হোসেন এবং তার মেয়ে সীমা। রঙের মাধ্যমে ঐতিহ্য যেন ছুঁয়ে যায় এজন্য রিকশা পেইন্টিংও কাজে লাগানো হয়েছে। রিকশা পেইন্টিং শিল্পী নূর আলী যুক্ত ছিলেন। লোকশিল্পীরাই মূলত এ স্টল নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। শিল্পী আনোয়ার হোসেনের কাছে তার অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, ‘মুই অনেক খুশি। লোকশিল্প নিয়ে কাজ করি। এত মানুষের কাছে কাজ তুলে ধরতে পারি ভালো লাগিছে।’ নবান্ন প্রকাশনীর উপদেষ্টা ড. আমিনুর রহমান সুলতানের সঙ্গে দেখা হলে বলেন, ‘বইমেলায় নবান্নের স্টলের সার্থকতা দর্শনার্থী এসে থমকে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বিদেশি দর্শনার্থী স্টলের সামনে দোভাষীর কাছে জানতে চান স্টলটির সজ্জা সম্পর্কে। তখন দোভাষী জানিয়ে দেন, এটি দেশের উত্তর জনপদ রংপুরের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প শতরঞ্জি ধারণ করে বানানো হয়েছে।’

বাংলা দোচালা ঘরের আদলে বাতিঘরের প্যাভিলিয়ন 

বাতিঘর মানেই ক্রেতা ও দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখরিত এক প্রাঙ্গণ। বইমেলায় প্রতিষ্ঠানটি এবার প্রথম প্যাভিলিয়ন পেয়েছে। এ প্যাভিলিয়নের ভেতরে ঢুকে ঘুরেফিরে বই দেখা ও কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার প্যাভিলিয়নটিকে ফ্রেমে রেখে ছবি তুলছেন অনেকেই। কেননা সন্ধ্যাবাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এ প্যাভিলিয়নটির সৌন্দর্য যেন আরও বেশি ঠিকরে পড়ে। সাত-আট বছর ধরে বাতিঘরের স্টলটির অঙ্গসজ্জার কাজ করে আসছেন নকশাকার শাহানুর রহমান। আট বাই আট। অর্থাৎ বাতিঘর যখন এক ইউনিটের স্টল নিয়ে বইমেলায় এসেছিল, তখন থেকেই স্টল নির্মাণের কাজ করছেন এ শিল্পী। তিনি জানান, ‘বাংলা ভাষাভাষীদের একটা মাত্র ম্যাটেরিয়াল যা পৃথিবীজুড়ে গর্ব করার বিষয়। সেটি হলো বাংলো। অর্থাৎ দোচালা বা চারচালা ঘর। বাংলার মৌলিক স্থাপত্য হলো বাংলো। সেই ঐতিহ্য তুলে ধরতেই এ প্যাভিলিয়নটি বানানো হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘এ স্টল বানানোর জন্য ব্যবহৃত উপাদানগুলো আমাদের ঐতিহ্যের।’ আক্ষরিক অর্থে এ প্যাভিলিয়নটি তা-ই। রয়েছে মুঘল-ইসলামি স্থাপত্যের ছোঁয়া। ভেতরে মাঝখানের গোল মিনারে রাখা আছে বই। আবার দেশি বাঁশের দেয়াল এবং মাটির তৈরি টালি দিয়ে ছাদ; যা পরিবেশবান্ধব। সঙ্গে আমাদের স্থানীয়, ইউরোপিয়ান ও মুঘল স্থাপত্যের অনবদ্য ফিউশন।

মেলায় নজর কাড়ছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের আদলে তৈরি অন্যধারার প্যাভিলিয়ন ছবি : আলী হোসেন মিন্টু

অন্যধারার প্যাভিলিয়ন। স্টলের সামনের পাঠক-ক্রেতা সরিয়ে দিলে দূর থেকে হঠাৎ কেউ ভুল করে বসবেন আরে! শেরেবাংলানগরের জাতীয় সংসদ ভবন এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে! ভ্রম ভাঙবে স্টলের সামনে গিয়ে থরে থরে সাজানো বই দেখে। ১৯৯৯ সাল থেকে এ প্রকাশনাটি বইমেলায় স্টল নিচ্ছে। কিন্তু এ বছরই তারা প্রথমবারের মতো পেয়েছে প্যাভিলিয়ন। আর  এ বছরে পাঠক ও দর্শনার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে প্রকাশনা সংস্থাটি। চারপাশে খোলা পরিসর। পাঠক ঘিরে রেখেছে এ প্যাভিলিয়নটি। কেননা তারা তৈরি করেছে জাতীয় সংসদের আদলে প্যাভিলিয়ন! কাজটির পেছনে ভূমিকা পালন করেছেন এ প্রকাশনার প্রকাশক মনির হোসেন পিন্টু। নকশা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘বাংলা একাডেমির বইমেলায় যে বছর থেকে প্যাভিলিয়ন প্রথা চালু হয়, তখন থেকে মনের মধ্যে স্বপ্ন গাঁথা ছিল। প্রথম বছর প্যাভিলিয়ন পেলেই জাতীয় সংসদের মতো করে প্যাভিলিয়ন বানানো। এবার মনের আশা পূরণ হয়েছে।’ জাতীয় সংসদের নকশা থেকে। প্যাভিলিয়নটি বানানোর জন্য প্রকাশক দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিস্ত্রি কামরুল ইসলামকে। বাকি কাজটুকু এ শিল্পীই করেছেন।

বইয়ের আদলে তৈরি পুথিনিলয়ের প্যাভিলিয়ন

পাঠক ঘুরে ঘুরে পছন্দসই বই খুঁজছেন আর স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন পুথিনিলয় প্যাভিলিয়ন সামনে রেখে। এ প্যাভিলিয়নের থিম বই। কথা হয় এ প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী শ্যামল পালের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘বইয়ের আদলে ছাদ বানানো হয়েছে। চারপাশের খুঁটিও বই দিয়ে বানানো। অর্থাৎ আমরা চেয়েছি বইয়ের ছায়ায় থাকতে।’ প্যাভিলিয়নের নকশা কে করেছেন, জানতে চাইলে এ প্রকাশক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বইমেলার সঙ্গে যুক্ত থাকায় অনেকটা অভিজ্ঞতা নিজেদেরই হয়েছে। প্যাভিলিয়নের ডিজাইন আমরাই দিয়েছি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টর কারিগররা সে নকশা ধরে কাজ করেছেন।’ দৃষ্টিনন্দন স্টলের জন্য বই বিক্রি বাড়ে কি না? এমন প্রশ্নে কবি প্রকাশনীর ম্যানেজার সজীব জানান, ‘কিছুটা বাড়ে। ক্রেতারা তো বাড়ি থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েই আসেন। সুন্দর গোছানো দেখে দূর থেকে স্টলের কাছে আসেন। সে ক্ষেত্রে স্টলে যদি ভালো বই থাকে তাহলে কিছু পাঠক বই কেনেন।’


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা