ডব্লিউএফএসএ
এস এম ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৩৫ পিএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম
লাল সবুজ পতাকা হাতে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্যরা
একরাশ বিষণ্নতা, দ্বৈতজীবনের ভার নিয়ে সকালেরা প্রতিদিন ফেরি করে ফিরে আসে। শুভ্র-শ্মাশ্রু মুহূর্তদের পাশে অন্য মুহূর্তগুলোর টালিটা দেখলে মুখটা স্রেফ হাঁ হয়ে যায়। এত সমস্যা! ওদিকে একনাগাড়ে চমকাচ্ছে মেঘ। আর সমাধানগুলো সংকুচিত হয়ে মিলিয়ে যায় কুগ্রহে। সে সময় উত্তাল সাগরে চতুর্থ বারে ঠিকই বিজয়কেতন ওড়াল তারা।
প্রভাতফেরির গান আরও বাঙময় করলেন আমাদের জেনজি ফেরি নকশাকাররা। কবিতায় নয়; প্রকৌশলে বিশ্ব জয় করলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো মানিকেরা (ব্ল্যাক পার্ল)। বিশ্বমঞ্চে এঁকে দিলেন নাইজা স্পিরিট। অর্জন করলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন খেতাব।
ডব্লিউএফএসএ চ্যাম্পিয়ন নাইজা স্পিরিট
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফেরি সেফটি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএফএসএ) বিশ্বজুড়ে ফেরি দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে নিরাপদ ফেরি ডিজাইন ও পরিচালনার কাজ করে আসছে। কয়েক বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠান নিরাপদ ফেরি ডিজাইন ছাড়াও পরিবেশদূষণ কমানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে; কেননা মোট পরিবেশদূষণের ২০ শতাংশ আসে নৌ-সেক্টর থেকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উদ্দেশ করে ফেরি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ ফেরি ডিজাইনের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ কমানোর লক্ষ্যেই এ সংস্থা প্রতি বছর একটি আন্তর্জাতিক ফেরি ডিজাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে এ প্রতিযোগিতার দ্বাদশ আসর। সে আসরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবায়ের ইবনে আওয়ালের তত্ত্বাবধানে নৌপরিবহনে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও নিরাপদ একটি নকশা উপহার দেন বুয়েটের সাত দামাল প্রকৌশলী। রাইনোসার্স থ্রিডিতে নাইজার স্পিরিট নামে এ ফেরির নকশাটি মাত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডব্লিউএফএসএর দ্বাদশ মঞ্চ। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর নকশা জমা দিলেও ফলাফল আসে ৯ ফেব্রুয়ারি। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে শিপবিল্ডিং ইনস্টিটিউট অব পলিটেকনিক সুরাবায়া, ইন্দোনেশিয়া এবং যুগ্মভাবে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে আইটিএস ইন্দোনেশিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব ইন্দোনেশিয়া, জাকার্তা।

সাত ভাই নাইজা স্পিরিট
বুয়েট নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাফায়েত হোসেন শিশির, মো. আবদুল কাদের, আবু রাসেল, মাহমুদুল হাসান শাহেদ, আফিফ বিন হাবিব অমিও, মো. আতিকুর রহমান ও মো. কাউসার মাহমুদ জিদান। তত্ত্বাবধান করেন অধ্যাপক ড. জোবায়ের ইবনে আওয়াল। এদের মধ্যে দলনেতা শিশির স্নাতকোত্তর করছেন। আর বাকিদের মধ্যে শিশির রাসেল, শাহেদ ও অমিও স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষে এবং আতিক ও জিদান তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। দলনেতা শিশির নকশার কাঠামো বিন্যাস, মিডশিপ ড্রয়িং, আনুমানিক ওজন নির্ণয়ের মতো নানা কাজ করেছেন। হাল সিলেকশন থ্রিডি কাঠামো, আউটফিটের মতো কাজগুলো করেছেন আবু রাসেল। দাম, প্রিন্সিপাল পার্টিকুলার্স, গতি ইত্যাদি বিষয়ে শাহেদ; নকশার স্থায়িত্ব ও সিএফডি বিশ্লেষণটা সেরেছেন অমিও। একইভাবে আউটবোর্ড প্রোফাইল ও জীবন সুরক্ষার পরিকল্পনায় নিয়োজিত ছিলেন কাওসার। পাওয়ার প্রেডিকশন ও তড়িৎশক্তি ব্যস্থাপনায় মনোযোগী ছিলেন আতিকুর রহমান। সবশেষ সদস্য আবদুল কাদের ইলেকট্রিক ও পরিবেশবান্ধব প্রোপালশন নিশ্চিত করার সঙ্গে ড্যামেজ স্ট্যাবিলিটি ও ফ্লাডেবল লেন্থ নিয়ে কাজ করছেন। টানা তিন মাস এ সাতজন সমান গতিতে ছুটে রূপ দিয়েছেন নাইজা স্পিরিটের। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করায় টিম ব্ল্যাক পার্ল ৫ হাজার ডলার পুরস্কার পায়।
যেভাবে বিশ্বজয়
প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট করা থাকে ফেরির রুট, যাত্রীসংখ্যা এবং ফেরির ধরন। এবারের আসরে রুট ছিল নাইজেরিয়ার লাগোস শহরের অভ্যন্তরীণ জলপথ ইকোরোডু টার্মিনাল থেকে সিএমএস। লাগোস নাইজেরিয়ার একটি অধিক জনবহুল শহর। অত্যধিক জনবহুল হওয়ায় তাদের পরিবহনব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত ব্যাঘাত ঘটে। এ সমস্যা দূরীকরণের লক্ষ্যেই লাগোস শহরের ইকোরোডু থেকে সিএমএস ২৫ কিলোমিটার জলপথের জন্য ফেরি ডিজাইন করাই ছিল মূল বিষয়বস্তু যা একইসঙ্গে ২০০ যাত্রী পরিবহনে সক্ষম এবং বিদ্যুৎ পরিচালিত হতে হবে।
টিম ব্ল্যাক পার্লের ডিজাইন করা সম্পূর্ণ বিদ্যুচ্চালিত নাইজা স্পিরিট ফেরিটির দৃঢ় কাঠামোর জন্য ফেরির কাঠামোটিতে অ্যালুমিনিয়াম দেওয়া হয়েছে। ২৮ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯ মিটার প্রস্থের দ্বিতলবিশিষ্ট ক্যাটামারান ফেরিটিতে প্রোপালশন সিস্টেম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে রিচার্জেবেল ব্যাটারি এবং জরুরি প্রয়োজনে সৌরবিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল যা কি না পরিবেশে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমিয়ে দেবে। রিচার্জেবল ব্যাটারি চার্জিং করতে লাগবে ২৪ মিনিট। ডিজাইন অনুযায়ী একটি চার্জিং স্টেশন ইকোরোডু টার্মিনালে স্থাপনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
উদ্ভাবন নিয়ে নাইজা স্পিরিট দলনেতা মো. সাফায়েত হোসেন শিশির বললেন, ‘ইকোরোডু টার্মিনাল থেকে সিএমএসের পরিবর্তনশীল পানির গভীরতায় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ফেরিতে ব্যবহার করা হয়েছে হাইড্রোলিক রিট্রাকটেবল এবং টিলটেবল প্রোপেলার। এ ছাড়া ফেরিতে ব্যবহার করা হয়েছে হাইড্রোকাইনেটিক টারবাইন এবং রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম যা ফেরি চলার সময় আলাদাভাবে পানি থেকে শক্তির জোগান দেবে; যা ব্যাটারির ওপর ইলেকট্রিক লোড কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে। এ ছাড়া নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফেরিটিতে রয়েছে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক, ফায়ার স্প্রিংক্লার, অপ্টিমাইজেড অ্যাবাকুয়েশন সিস্টেম; সঙ্গে ডিরেকশনাল সাউন্ড বেকন সিস্টেম। এ ছাড়া ফেরিটিতে রয়েছে আরও অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। ফেরিটি সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ১০টি ট্রিপ দিতে সক্ষম এবং প্রতিটি ট্রিপে ২৫ কিলোমিটার পাড়ি দিতে লাগবে ৪২ মিনিট। ফেরিটি তৈরিতে আনুমানিক খরচ পড়বে ১.০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।’
দলের আরেক সদস্য আতিক বলেন, ‘দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়ে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য নিয়ে আসা এটাই প্রতীয়মান করে যে বুয়েটের নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগ উদ্ভাবনী, প্রতিভাবান এবং দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ প্রকৌশলী তৈরি করছে, যারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক জাহাজশিল্পের অভাবনীয় বিকাশ ঘটানোর সক্ষমতা রাখে এবং একইসঙ্গে ওশান ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।