ইমরান পরশ
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:২৩ পিএম
অলংকরণ : নিঝুম নিসর্গ। খুলনার রোজডেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী
গ্রামের মেঠো পথ। দুই দিকে গাছের সারি। পথটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেকদূর।
আদিবা, মাহিম আর রিচি তিন বন্ধু। প্রতিদিন এ পথেই স্কুলে যায়। এ পথটি মাঠের মাঝ দিয়ে চলে গেছে। ঝিরঝির বাতাসে ঢেউ খেলে যায় ধানক্ষেতে। ঠিক নদীর মতো ঢেউ তুলে।
মাঠের মাঝখানে একটি বিশাল বটগাছ। এ গাছে অনেক পাখির বাস। সন্ধ্যা হলেই কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় এলাকা। দূরদূরান্ত থেকেও অনেক লোক আসে। ছবি তোলে। ভিডিও করে। কেউ আবার পাখির ডাক রেকর্ড করে। গাছটি পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সকাল হতেই পাখিগুলো চলে যায়। সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসে।
এই তো কিছুদিন আগে যে ঝড় হলো, সেই ঝড়ে অনেক পাখি মারা গেছে। গাছের একটি বড় ডালও ভেঙে পড়েছিল। এলাকার লোকজন মাটি গর্ত করে পাখিদের কবর দিয়েছে। অনেকে কেঁদেছেও। ওরা তিনজনই দেখেছে সেই দৃশ্য। টিভিতেও দেখিয়েছে খবরটি। সে সময় লাহুড়িয়া গ্রামের নাম অনেকেই জেনে গেছে।
প্রতিদিনের মতো তিনজন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরছিল। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। তাদের ছায়াগুলো দ্বিগুণ দেখাচ্ছিল। আদিবা তার ছায়া অনুসরণ করে হাঁটছে। স্কুলব্যাগ কাঁধে তাদের। মজা করে যাচ্ছিল বাড়িতে। বড় বটগাছটির কাছে এসেই ওরা থমকে গেল।
অনেক লোকের জটলা। তারা এগিয়ে গেল। খুব কাছে। দেখল বন্দুক হাতে দুজন লোক। তাদের ঘিরে রেখেছে উৎসুক মানুষ। তারা গ্রামে বেড়াতে এসেছে। সবাই বলাবলি করছে আজ পাখি শিকার করা হবে। বিদেশি পাখি। গ্রামের ছেলেরা পিকনিক করবে। আঃ পাখির মাংসের কি স্বাদ!
এ কথা শুনে ওরা ভয় পেয়ে গেল। এ বটগাছে শীতের সময় বিদেশি পাখি আসে। সারা বছর তো দেশি পাখি থাকেই। সারা গ্রামের এই একটি গাছেই পাখি থাকে। আর জায়গাটি একটু নিরিবিলি। তাই পাখিরাও স্বচ্ছন্দে দিন কাটায়। এটি তাদের নিরাপদ আশ্রয়। এটি পাখির বাড়িঘর। গুলির শব্দ শুনলে তো পাখিগুলি ভয় পেয়ে যাবে। কত বাচ্চা পাখি আছে এখানে। তাদের মা যদি মারা পড়ে! কোথায় যাবে পাখিগুলো। কত দূর থেকে উড়ে আসে পাখিগুলো!
আদিবা ধীরে ধীরে বন্দুকধারীদের কাছে গেল।
বলল, দেখুন পাখি মারবেন না।
তার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল সবাই।
আদিবা আবার বলল, হাসবেন না। আমার কথা তো শুনুন।
একজন বলে উঠল, এই মেয়ে তোমার কথা কী শুনব। আমরা কি ছোট? তুমি আমাদের কথা শোনো। এরা অনেকদিন পরে গ্রামে এসেছে। পাখির মাংস দিয়ে পিকনিক করবে। আজ এখানে পাখি শিকার হবে। বিদেশি পাখি। আমরা তো দেশি পাখি মারব না। শালিক, বক মেরে কী হবে। বিদেশি পাখির মাংস অনেক। পিকনিক জমবে ভালো।
প্লিজ আপনারা পাখি মারবেন না। তিনজনই একসঙ্গে বলে উঠল, মারবেন না।
শহর থেকে আসা শিক্ষিত যুবক দুজন চমকে উঠল। গ্রামের এই ছোট বাচ্চাদের সাহস আর মেধা দেখে। একজন বলে উঠল, আমরা পাখি মারব। তোমরা চলে যাও তো।
ওদের মন খারাপ হয়ে গেল।
আদিবা বলল, দেখুন এখানে অনেক মা পাখি আছে। তারা যদি মারা পড়ে? তাহলে তাদের বাচ্চাগুলোর কী হবে ভেবে দেখেছেন। আপনাদের মাকে যদি কেউ মেরে ফেলে?
বন্দুকধারী দুজন একে অন্যের দিকে তাকাল।
তা ছাড়া পাখি শিকারে সরকারের নিষেধ আছে। পাখি শিকার করলে আইন অমান্য করা হয়। আপনারা যদি আইন অমান্য করেন তাহলে...।
একজন বলল, তাহলে পিকনিক?
আদিবা বলল, পিকনিক হবে। আমরাও আপনাদের সঙ্গে থাকব।
কিন্তু কীভাবে?
আমাদের তিনজনের বাড়িতে অনেক মুরগি আছে। আপনাদের দশটি মুরগি দেওয়া হবে।
কী বলো?
হ্যাঁ, যা বলেছি সত্য। উপস্থিত সবাই করতালি দিল।