প্রেমের অণুগল্প
পিন্টু রহমান
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:১৮ পিএম
মেসের ছোট্ট ঘরটায় নীলনয়না কিছুতেই সুস্থির হতে পারে না, সময় তাকে অস্থির করে তোলে; অস্থিরচিত্তে হাতের মুঠোয় ভাঁজ করা চিরকুট প্রত্যক্ষ করেÑ নীল, কখনও ফিরব কি না জানি না। কিন্তু বিশ্বাস করো, এ-লড়াই শুধু আমার নয়, আমাদের সবার। দুঃখ কোরো না।
দুঃখ করতে না চাইলেও দুঃখরা তাকে নিঃসঙ্গ হতে দেয় না। চিরকুটের প্রতিটি শব্দ মুছে ফেলতে ইচ্ছে হয়। একবার নয়, বারবার বুঝিয়েছেÑ আমি কেবল তোমাকে চাই। আন্দোলন যারা করছে করুক, তুমি কেন নিজের জীবন বাজি রাখবে!
মৃদু হেসে আবু সাঈদ শুনিয়েছে ভিন্ন কথাÑ আমি না গেলে তোমার চোখের গহিনে যে আকাশ, ওই আকাশ মেঘমুক্ত করবে কে!
মুক্তির গল্প শোনালেও সে নিজে অবরুদ্ধ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নেতৃত্বে একটি মিছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে এসে জড়ো হয়েছিল। অগ্রভাগে স্বয়ং আবু সাঈদ। পুলিশ বাধা দিলে ছেলেটি প্রজাতির মতো দুই হাত প্রসারিত করে রাষ্ট্রীয় বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। নিমেষে মুছে গিয়েছিল নীলনয়নার আকাশের যাবতীয় রঙ। মেয়েটির জীবন এখন রঙহীন। লাশ বহনকারী গাড়ির পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। পাথরচোখে রাতের আকাশ দেখছিল। আকাশও তার মতো শোকাহত। কোথাও কোনো আলো নেই। শুধু প্রাচীন অন্ধকার। গাড়ির অভ্যন্তরে কালো কাপড়ে মোড়ানো আবু সাঈদের নিথর দেহ। ধারেকাছে শত শত মানুষের কোলাহল। অথচ নীলনয়নার কানে কোলাহলের শব্দ পৌঁছায় না। তার দুই চোখে কেবল প্রেমিকের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। অমলিন মুখচ্ছবি নিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। আহা, কতদিন তারা মুখোমুখি বসে ছিল! সুখস্বর্গ রচনার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছিল! আগামীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে জানিয়েছিলÑ আমরা একদিন জিতব, নীলনয়না। তুমি দেখবে, একদিন এ দেশের আকাশে আর কোনো অন্যায়ের মেঘ থাকবে না।
মাটির ঠিকানায় লাশবাহী গাড়ি ছুটে চলে। এক পা দুই পা করে মেয়েটি পিছু হটে। নীরবে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা জল। বহুদিন বাদে মনে হয়, আকাশ নীল নয়; মলিন। মলিন মুখে নীলনয়না আকাশ দেখে। তার চোখে আবু সাঈদের দেখা মুক্ত আকাশের স্বপ্ন এখনও জ্বলজ্বল করে।