প্রেমের অণুগল্প
শফিক হাসান
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:১৪ পিএম
মেয়েদের বিতর্ক নাকি কুতর্ক কী একটা অনুষ্ঠান ছিল জাঁহাবাজ অডিটোরিয়ামে। খবর পেয়ে চলেও এসেছি। এসে আক্কেলসেলামি দিতে হলো। গেটে বড় করে লেখাÑ ছিন্নপাতার তরণী। তরুণী লিখতে গিয়ে হয়তো ভুল করে হ্রস্ব উ-কার দেয়নি। না দিক, আজকাল বানান ভুল করাটাও স্মার্টনেসের লক্ষণ! যেমন স্মার্ট তরুণীরা মাঝেমধ্যে পাতার পোশাক পরে ফ্যাশন শো করে। দেখতে খারাপ লাগে না, চোখ আরাম পায়। বহু আগে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম। পোশাক পুকুরপারে রেখে স্নান করতে নেমেছিল নায়িকা। এদিকে দুষ্টু ছাগল খাবার মনে করে পোশাকগুলো নিয়ে হাওয়া! শেষমেশ নায়িকাকে গাছের পাতা-লতা পরেই ডেরামুখী হতে হয়েছিল। লাজ-নম্রতার ফাঁকে আমি দেখতে পেয়েছিলাম শরীরজুড়ে ঠিকরে বের হওয়া সৌন্দর্যরাশি।
দেশে এখন পুকুর নেই। থাকলে দুষ্টু ছাগলপালকে লেলিয়ে দেওয়া যেত। গাছের মগডালে বসে কাঁঠালপাতা চিবাতাম আর গোপন সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। দাঁত খিলালের কাজটাও পাতা চিবানোর সঙ্গে হয়ে যেত। আহারে পুকুর, তোরা ফিরে আয়! নগদ কথায় ফিরে আসি। অনুষ্ঠানে তরুণীদের দেখা পেলামই না, তাদের মা কিংবা দাদি-নানিও নেই। বরং থুত্থুড়ে বুড়োর সমাবেশ বড় হতে লাগল। বললে রাগ করবেন না এমন একজনকে পাকড়াও করে জানতে চাইলাম, ‘দাদু, ভেতরে কীসের অনুষ্ঠান চলছে?’
চেহারা সব সময় ভেতরের কথা বলে না। বুড়ো খেপে গিয়ে বললেন, ‘দেখছ না ছোকরা, ব্যানারে লেখা আছে ছিন্নপাতার তরণী?’
‘জি, দেখেছি। কিন্তু তরুণীরা কোথায়? পাতাগুলো ছিঁড়বে কোন জঙ্গল থেকে!’
এবার আরও রেগে গেলেন দাদুÑ ‘তুমি দেখছি আস্ত গোবরগণেশ! তরণী শব্দের অর্থ নৌকা। নৌকায় তরুণীরা চড়ে বটে, তাই বলে তরণী কখনও তরুণী হয়ে যায় না! ছিন্নপাতাও একটা প্রতীকী বিষয়।’
মনঃকষ্টে বহুক্ষণ বসে ছিলাম অডিটোরিয়ামের বাইরে। অনেকক্ষণ পর একটা ছেঁড়া কাগজ টুকিয়ে নিয়ে লিখলাম, দেখিতে এসেছি বহু, তবু...।
আর কী লিখব, ভেবে না পেয়ে কাগজটা ফেলেই দিলাম। হাঁটা ধরলাম কিছুক্ষণ পর। অন্য কোথাও সমাবেশের খবর জানা নেই। দেখি, হাঁটতে থাকি, যদি কিছু পাওয়া যায়। ইদানীং স্কুল-কলেজের গেটে গিয়েও সুবিধা হচ্ছে না। মেয়েগুলো যেন একেকজন বিপ্লবিনী! চোখ-মুখ শক্ত করে রাখে, শত্রুজ্ঞানে অপাঙ্গে তাকায়।
কী করব কোথায় যাব সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই পেছন থেকে সুরেলা ডাক ভাসলÑ ‘অ্যাই, শোনো’!
তাকিয়ে জমে গেলাম। ষোড়শীর (অষ্টাদশী কিংবা দ্বাদশীও হতে পারে) হাতে আমার লেখা কাগজটা! মিষ্টি হেসে বলল, ‘আমি জানি, প্রতিদিন তুমি আমাকে চুরি করে দেখতে আসো। আজ আবার চিঠিও লিখেছ। নাম ভুল বানানে লিখেছ কেন! আমার নাম তুবা। ত হ্রস্ব উ, ব আকার।
মুখে কথা জমল অনেক পরে। বললাম, ‘আর কখনও ভুল হবে না।’
প্রতিশ্রুতি পেয়েই কি না কে জানে, তুবা যেন উড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। দুই হাতে খামচে ধরল পিঠ। কিছুক্ষণ পরপর কেঁপে কেঁপে উঠছে। প্রেমজ্বরে কাঁপছে নাকি? আমি কি তাহলে ডুবোচর! এ চরের সামনে পড়লে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে?
নিশ্চিন্ত হলাম। আগামী কয়েকদিন পা ও চোখ দুটো বিশ্রাম দিতে পারব। এখন তুবাকে নিয়ে কী করি, কোথায় যাই?
শেষ কাঁপুনিটা আমার বুকে আছড়ে ফেলে অবমুক্ত করল নিজেকে। বলল, ‘আইসক্রিম খাবে?’
ভ্যানিটি ব্যাগে হাত দিল উড়ে এসে হৃদয় জুড়ে বসা তুবা। আমি হাত দিলাম পকেটে। যদি খুচরো পাঁচটা টাকাও পাওয়া যায়, প্রেমদেবীকে একটা লাল টিপ কিনে দেব।