× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাইবার ক্রাইম

নারী যখন প্রধান শিকার

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:০৬ এএম

নারী যখন প্রধান শিকার

সাইবার হামলার শিকার নারীদের বেশিরভাগই বুঝতে পারেন না কোথায় গেলে প্রতিকার পাবেন। সমাজমাধ্যমে হামলার শিকার বেশিরভাগই নারী। এমনকি হামলার শিকার থেকে রেহাই পাননি জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নারীরাও। কখনও বিকৃত ছবি তৈরি করা, ভিডিও তৈরি করা, অশ্লীল মন্তব্য ও বিদ্বেষ ছড়ানো মন্তব্যের শিকার হয়েছেন তারা।

তাদের অনেকে জানান, রাজনৈতিক কারণেও নারীদের হেনস্থা করা হয়েছে। কখনও বিরূপ মন্তব্য এসেছে। কখনও ছবি নোংরাভাবে এডিট করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে মেনোবল ভেঙে দেওয়ার। অনেক নারীই সরে যান রাজপথ থেকে।

এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘নারীরাই বেশি সাইবার হামলার শিকার। যখন প্রয়োজন ছিল এদের মুখগুলো ভাইরাল করেছেন। পরবর্তীতে এ মুখগুলো যখন কথামতো চলছে না তখন হয়তো আবার টার্গেটের ক্ষেত্রে নারীরা সবচেয়ে বেশি হয়। তাদের পেছনে যে বুলং হয় সেই অ্যাটাকটা দীর্ঘ সময় ধরে চলে। সেটা অনেকদিন টিকে থাকে। শাহবাগ আন্দোলনে স্লোগানকন্যা হিসেবে অনেককে দেখা যায়। যার নাম এবং নম্বর পর্ন সাইটে দেওয়া হয়েছিল সে এখনও ফোন কল পায়। নারী অ্যাকটিভিস্ট হওয়ার কারণে আপনারা যে বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন তা একজন পুরুষের হতে হয় না। শুধু জেন্ডার ইস্যুটার কারণে।

শুধু আন্দোলনের নারীরাই নয়, সাইবার হামলার শিকার হতে হচ্ছে সমাজের সর্বস্তরের নারীকে। অনেকেই এমন অবস্থায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চান। সমাজমাধ্যমে সিগারেট খাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে দেন নুসরাত (ছদ্মনাম) ও তার চাচাতো বোনের। নুসরাত বলেন, ‘আমার হাতে কোনো সিগারেট ছিল না। পাশে একজন খাচ্ছিলেন সেজন্যই ভিডিওটা করা হলো। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পর কমেন্টবক্সে আমাকে টার্গেট করে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করা হয়। এত দ্রুত ভিডিও ছড়াতে থাকে। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। একটা সময় মনে হলো আত্মহত্যা করি। কোথায় গেলে প্রতিকার পাব তা-ও জানতাম না। পরে আইনি সহায়তা নিই। তবে আমার সঙ্গে আমার যে বোন ছিল সে আইনি সহায়তাও নিতে চায়নি ভয়ে।’

ইন্টারনেট-নির্ভরতার এই সময়ে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে সবাই। যার প্রধান লক্ষ্য থাকে নারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ফেক ভিডিও কিংবা এডিটেড ছবি, প্রতিদিনই ঘটছে নারীকেন্দ্রিক এমন ঘটনা...

কখনও কখনও এসব ঘটনা আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। ফেসবুক আইডিতে নাম ব্যবহার করে অবিকল দুটি আইডি খোলা হয়েছে। আইডিগুলোয় তার সাধারণ ছবিগুলো অশ্লীল ছবির সঙ্গে যুক্ত করে পোস্ট করা হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই আইডি দুটি থেকে হয়রানির মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। ভুক্তভোগীর ছবিই শুধু না, তার আত্মীয়ের ছবির সঙ্গে ভুক্তভোগীর ছবি ও তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর যুক্ত করে আপত্তিকর ক্যাপশনসহ পোস্ট করে সামাজিকভাবে মানহানি করা শুরু করে। এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন ফারজানা রহমান। পরে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে খায়রুজ্জামান ডালিম এবং রাসেল মোল্ল্যা নামে দুজনের নাম। খায়রুজ্জামান ছিলেন ফারজানার প্রতিবেশী। জমিজমার বিরোধের জেরেই এ কাজ করেন।

গত প্রায় চার বছরে ৩৯ হাজার ৩০১ জন নারী সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ডক্সিং (ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে সমাজমাধ্যম থেকে ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করা) ও ব্ল্যাকমেলের শিকার হচ্ছে বেশি। ডিজিটাল প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার যেমন আশীর্বাদ তেমন তা সহজলভ্য হওয়ায় অপব্যবহারও কম নয়। সময়ের পরিবর্তনে সাইবার অপরাধেরও নতুন ধরন দেখা যাচ্ছে। সাইবার অপরাধের শিকার নারীদের নিয়ে কাজ করা পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন বলছে, নারীদের কাছ থেকে এখন ডক্সিং ও ব্ল্যাকমেলের অভিযোগ মিলছে বেশি। জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ হাজার ৬৪৫ জন নারীর অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সেবাপ্রত্যাশীরা পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে ৬০ হাজার ৮০৮টি মেসেজ, ৮৬ হাজার ১৮২টি ফোন এবং ৯৭৭টি মেল দিয়েছে। অভিযোগের মধ্যে ৭ হাজার ১টি ছিল ডক্সিংয়ের; যা মোট অভিযোগের ৪১ শতাংশ। ব্ল্যাকমেলের অভিযোগ এসেছে ৩ হাজার ১০৬টি; যা মোট অভিযোগের ১৮ শতাংশ। আইডি হ্যাকের সংখ্যাও কম নয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে ২ হাজার ৯৮৬টি; যা মোট অভিযোগের ১৭ শতাংশ। নারীরা যে ধরনের অপরাধের শিকার হয়ে থাকেন সে অনুযায়ী সাইবার অপরাধকে আটটি ধাপ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো ডক্সিং। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীর ছবি, মোবাইল নম্বর, বাসার ঠিকানা, এনআইডি বা যেকোনো পরিচিতিমূলক তথ্য সমাজমাধ্যমে (প্রকৃত বা এডিট করে) পোস্ট করে, কমেন্ট করে, কাউকে মেসেজের মাধ্যমে পাঠিয়ে হয়রানি করা হয়। এর পরের ধাপ ইমপারসোনেশন। ভুক্তভোগীর ছবি, নাম বা যেকোনো পরিচিতিমূলক তথ্য ব্যবহার করে ভুক্তভোগী সেজে ছদ্মবেশে হয়রানি করা হলো ইমপারসোনেশন। এর পরের ধাপ আইডি হ্যাক। এতে সমাজমাধ্যমের কোনো আইডি বা ইমেল অ্যাড্রেস বা অন্য কোনোভাবে ডিজিটাল তথ্য হ্যাক করে অপরাধ করা হয়। এরপর রয়েছে ব্ল্যাকমেলিং। এটি হচ্ছে টাকা দাবি করা বা আপত্তিকর ছবি বা আপত্তিকর অবস্থায় ভিডিও কলে আসতে বলা বা আপত্তিকর ভাষায় চ্যাট করার জন্য ভয়ভীতি দেখানো বা হুমকি দেওয়া। পরের অবস্থানে সাইবার বুলিং। এতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন পোস্টে বা মেসেজের মাধ্যমে আপত্তিকর ভাষায় কমেন্ট করা, মেসেজ করা, পর্নোগ্রাফিক ছবি বা ভিডিও পাঠানো। এরপর আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ছড়ানো। এটি হচ্ছে ভুক্তভোগীর আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে বা মেসেজ-ইমেলের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। সপ্তমটি হচ্ছে মোবাইল হ্যারেজমেন্ট। এতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কল বা এসএমএস দিয়ে হয়রানি করা হয়। এ ছাড়া উপরোক্ত কোনো অপরাধের তালিকায় পড়ে না এমন অন্য অভিযোগও রয়েছে অষ্টম ধাপে।

আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অনন্যা। তারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়। হ্যাকার তার আইডি থেকে তার ভাইয়ের আইডিতে মেসেজ দিয়ে আইডি ফেরত নেওয়ার জন্য টাকা পাঠাতে বলে। হ্যাকারকে প্রথম পর্যায়ে টাকা পাঠালে পুনরায় টাকা চায়। টাকা না দেওয়ায় বিভিন্ন অশ্লীল ছবির সঙ্গে মেয়েটির ছবি যুক্ত করে আপত্তিকর ক্যাপশন লিখে পোস্ট করে। জিডির পরিপ্রেক্ষিতে থানা থেকে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে প্রযুক্তিগত সহায়তায় অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হয়। থানা পুলিশ ভুক্তভোগীর করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এমরান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। আসামি ছিলেন মেয়েটিরই গ্রামের একজন দোকানদার।

পুলিশ সদর দপ্তর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ)-এর তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে ৯ হাজার ১১৭টি হয়রানির অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭১৫, ফেব্রুয়ারিতে ৬৫৩, মার্চে ৭২৩, এপ্রিলে ৭৩০, মে মাসে ৭৭৩, জুনে ৮৪২, জুলাইয়ে ৭১০, আগস্টে ৬৩০, সেপ্টেম্বরে ৯৭৯, অক্টোবরে ৮৮১, নভেম্বরে ৭১৪ ও ডিসেম্বরে ৭৬৭টি অভিযোগ আসে।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সূত্র বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য আদানপ্রদান বা নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক নয়। পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না থাকলে পুলিশও অনেক সময় মামলা নিতে আগ্রহী হয় না। সাইবার স্পেসে নারীদের হয়রানির বিষয়ে গুরুত্বসহকারে তথ্যানুসন্ধান করে যথাসম্ভব দ্রুত অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করে তারা। এ ছাড়া ভুক্তভোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তিগত ও আইনি পরামর্শও দেওয়া হয়। গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সমাজমাধ্যম কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করে। এ-সংক্রান্ত মামলা বা জিডির অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তিগত সহায়তাও করে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন।

প্রযুক্তিবিদেরা বলছেন, ডক্সিং থেকে উত্তরণের জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য (ঠিকানা, ফোন নম্বর, জন্মতারিখ, ইমেইল) যতটা সম্ভব গোপন রাখতে হবে এবং এমন তথ্য প্রকাশ এড়িয়ে চলতে হবে। সমাজমাধ্যমের প্রাইভেসি সেটিংস পরিবর্তন করা। দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবহার করা। অ্যাড্রেস বা ফোন নম্বর অনলাইনে পোস্ট না করা। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ডক্সিংয়ের শিকার হলে অনলাইনে প্রকাশিত তথ্য যত দ্রুত সম্ভব সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্য নেওয়া।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা