রহিম শুভ
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:৪৫ এএম
মেডিকেলে চান্স পেয়ে অন্ধকার ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়েছেন মারুফ হাসান। প্রবা ফটো
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার লেহেম্বা ইউনিয়নের শালবাড়ী এলাকার কাঁঠালবাড়ী গ্রামের ইউসুফ আলী-মরিয়ম বেগম দম্পতির ছেলে মারুফ হাসান। তিন ভাইয়ের মধ্যে মারুফ সবার বড়। বসতভিটে ছাড়া তেমন সম্পত্তি নেই। অসুস্থ বাবা অন্যের দোকানে কাজ করে যা রোজগার করেন তা দিয়ে চলে সংসার। আর মারুফ অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করেন।
দারিদ্র্যকে জয় করে মারুফ এবার রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার এ সাফল্যে বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষ আনন্দিত। কিন্তু তার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে মেডিকেলে পড়ার খরচ জোগান দেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
-6799c057babfc.jpg)
পারিবারিকসূত্রে জানা যায়, অসুস্থতার কারণে প্রায় সময়ই কাজে যেতে পারতেন না মারুফের বাবা ইউসুফ আলী। একদিন খাবার না খেলেও চলবে কিন্তু ওষুধ প্রতিনিয়তই সেবন করতে হয় তাকে। একদিকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, অন্যদিকে অসুস্থতা। বাবার এ অসহায়ত্বের করুণ দৃশ্য দেখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তার বড় ছেলে মারুফ হাসান। নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে মাঠে যান শ্রম দিতে। অন্যের জমিতে কাজ করে যা মজুরি পান তা পড়াশোনা ও বাবার ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়। তবু যেন দরিদ্র ঘরের এ অন্ধকার কাটছেই না। তবে সেই অন্ধকারে এবার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন মারুফ হাসান।
মারুফ হাসান রাণীশংকৈল উপজেলার পাইল্ট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পান। এরপর ভর্তি হন রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজে। সেখানেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫। এ বছর এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় মারুফ অংশ নিলে রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। ভর্তিসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ যে অর্থের দরকার তা মারুফের হতদরিদ্র পরিবারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ যা সম্পত্তি ছিল তা বন্ধক রেখে সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করেছেন ইউসুফ আলী। বন্ধুর কীটনাশকের দোকানে কাজ করে যা বেতন পান তা দিয়েই চলে তাদের সংসার।
মারুফের বন্ধু জয়নাল হক বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করছি। সে অনেক মেধাবী। কাজ করে আবার পড়াশোনাও করে। মূল কথা তার ডাক্তার হওয়ার আগ্রহ ছিল অনেক। আল্লাহ তার মনের আশা পূরণ করেছেন। এখন সবার সহযোগিতায় যদি ভর্তি হতে পারে তাহলে উপজেলাবাসী একজন মানবিক ডাক্তার পাবে।’
বাবা ইউসুফ আলী বলেন, ‘বাবার জমির ভাগ পেয়েছি ২০ শতাংশ। আর বউ তার বাপের কাছ থেকে পেয়েছে ৩৩ শতাংশ। তার মধ্যে ২০ শতাংশ জমি ছেলের লেখাপড়ার খরচের জন্য বন্ধক রেখেছি। ৩৩ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করে যা ফসল হয় তা দিয়েই কোনোমতো সংসার চলে। ২০০৬ সাল থেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ। ভারী কাজ করতে পারি না। অসুস্থ শরীরে বাড়ির পাশে এক কীটনাশকের দোকানে কাজ নিই। কাজ করে যা পাই তা দিয়ে সংসার কোনোমতো চলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বহু ডাক্তারের চিকিৎসা নিয়েছি। স্বপ্ন দেখতাম আমার সন্তানকেও যদি ডাক্তার বানাতে পারতাম। এ কথা শুনে বড় ছেলে মারুফ গত বছরে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু ৩ নম্বরের জন্য মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। তার পরেও থেমে যায়নি মারুফ। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি বিষয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু কৃষি বিষয়ে তার আগ্রহ কম থাকায় বাড়ি চলে আসে। এরপর এলাকায় একটি কোচিংয়ে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করে। শতকষ্ট করে ছেলে আমার রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে। আমার সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। কিন্তু ওখানে অনেক টাকাপয়সা লাগে। আমার পক্ষে তা সম্ভব না। এজন্য সরকারি সাহায্য চাই আমি।’
মারুফের মা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘আমার বড় ছেলে অভাবের মধ্যেই পড়ালেখা করেছে। ছেলে বড় ডাক্তার হোক। গরিব মানুষকে বিনা টাকায় চিকিৎসা করবে এটাই চাওয়া। আমি খুবই আনন্দিত।’
মারুফ হাসান বলেন, ‘আমার বাবার অসুস্থতা ও ডাক্তারের কাছে আসা-যাওয়া দেখেই আমার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা। এ পেশাটাকে আমার অন্যরকম ভালো লাগে। মনে হতো আমি যদি তাদের মতো হতে পারতাম! সেভাবেই পড়াশোনা করি। তবে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে মাঠেও কাজ করেছি। কারণ আমার পরিবারের পক্ষে এত লেখাপড়া চালানো সম্ভব ছিল না।
মারুফ আরও বলেন, ‘আমার অক্লান্ত পরিশ্রম ও মা-বাবার দোয়ায় আমি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। দোয়া করবেন যেন ভালো ডাক্তার হতে পারি। অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।’
রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুল হাসান বলেন, ‘মারুফ হাসান মেধাবী শিক্ষার্থীদের মডেল, আইকন ও অনুপ্রেরণা। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাওয়ায় মারুফকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। তার মেডিকেলে পড়তে সব সময় উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা থাকবে।’