× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বই বই ঘ্রাণের এ মৌসুম

শফিক হাসান

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৫১ এএম

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১৪:৩৩ পিএম

ছবি : ফোকাস বাংলা

ছবি : ফোকাস বাংলা

দেশের প্রধান বইপাড়া ঢাকার বাংলাবাজার। বইয়ের আঁতুড়ঘর। সৃজনশীল ও মননশীল বইয়ের বৃহৎ উৎস হিসেবে বাংলাবাজার সব সময়ই সরগরম থাকে। আবার নোট-গাইড থেকে শুরু করে শ্রেণি পাঠ্যবইয়ের জন্যও প্রসিদ্ধ বাংলাবাজারের গলি থেকে উপগলি। বইমেলার আগের দু-তিন মাস পা ফেলার জায়গাটুকুও থাকে না এখানটায়। কিন্তু ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাবাজারও যেন হারিয়ে ফেলেছে দীর্ঘদিনের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য।

সরেজমিন ঘুরে প্রকাশকসহ বইসংশ্লিষ্টদের অলস সময় যাপন করতে দেখা গেছে। অন্য সময়ে সদরঘাট পোস্ট অফিস পেরোলেই লেখক-প্রকাশক-প্রেসকর্মী, মিন্তিসহ সংশ্লিষ্টদের শোরগোলে টেকা যেত না। এবারকার সুনসান রাস্তায় নির্বিঘ্নে পৌঁছানো গেল মান্নান মার্কেট পর্যন্ত। এ মার্কেটের নিচতলায় অনুপ্রাণন প্রকাশন-এর শোরুম। উদাস হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল শোরুম ম্যানেজার সাগর বিশ্বাসকে। চারপাশের খাঁখাঁ পরিস্থিতিতে তাকে ‘বইমেলার প্রস্তুতি কেমন’ জিজ্ঞেস করা এক ধরনের বাতুলতাই। তবু সে প্রশ্নই করতে হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় তিন দশক যাবৎ বইয়ের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত এই কর্মী বলেন, ‘অন্য বছরগুলোতে প্রকাশকরা দুপুরে খাওয়ার সময় পেতেন না। আর এখন গল্পগুজব করে অলস সময় পার করছেন। এবার নোট-গাইডসহ স্কুলপাঠ্য বইয়ের দোকানগুলোও খালি। অনেক প্রকাশক এখনও বইপত্র ছাপেননি।’

বাঁধাই করা বই মাথায় নিয়ে প্রকাশনাতে পৌঁছে দিচ্ছেন শ্রমিকরা। ছবি : আরিফুল আমিন

নেপথ্যের কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করে সাগর বিশ্বাস বলেন, ‘কাগজের দাম বেড়েছে আবার, রিমপ্রতি এক থেকে দেড়শ টাকা। প্রকাশকরা নতুন বই ছাপতে সাহস পাচ্ছেন না। মজুদ ফুরিয়ে গেছে এমন বইয়ের পুনর্মুদ্রণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।’

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ-এর শোরুমে গিয়ে পাওয়া গেল প্রকাশক আদিত্য অন্তরকে। বই প্রকাশের তোড়জোড় ও মেলার প্রস্তুতি কেমনÑ এমন প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, ‘এবার সবকিছুতেই কেমন যেন দীর্ঘসূত্রতা দেখতে পাচ্ছি। সময়ের কাজ সময়ে হচ্ছে না। তবে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে বাস্তবতা অনুধাবন করে কিছু বই প্রকাশ স্থগিত রাখতে হয়েছে।’

বইমেলায় প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ ও এর আকৃতি পরিবর্তন বিষয়ে এ প্রকাশক বলেন, ‘বিশ্বের কোন জায়গায় এমন খোলা মাঠে প্যাভিলিয়ন করা হয়! খালি একটা মাঠ বুঝিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। এর মাধ্যমে পরিবেশ-প্রকৃতি দূষিত হচ্ছে। পরিবেশবাদীদের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা নিশ্চুপ। প্যাভিলিয়নকে নিয়ে যদি আমরা আন্তর্জাতিক মান চিন্তা করি, তাহলে সব দিকই ভাবনায় রাখা উচিত। পরিকল্পনায় যেন সাযুজ্য থাকে, আকাশকুসুম না হয়।’

বাংলাবাজার এলাকার একটি মুদ্রণ কারখানায় ব্যস্ত দুই শ্রমিক

বিভাস-এর প্রকাশক রামশংকর দেবনাথ আশাবাদী বইমেলা নিয়ে। বইমেলা সন্তোষজনক হবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জানান, এবার তিনি ২০টির মতো বই প্রকাশ করছেন। কবিতার বই ১৫টি। অন্যতম আকর্ষণ নির্মলেন্দু গ‍ুণের উপন্যাস ‘আই লাভ ইউ’, যতীন সরকারের অখণ্ড আত্মজৈবনিক ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু ও ভূতদর্শন’, বিপাশা মণ্ডলের দুটি অনুবাদ ও মজিবর রহমানের প্রবন্ধের বই নিয়ে বইমেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভাস।

বর্ণমালা সুপার মার্কেটে গিয়ে চর্চা গ্রন্থপ্রকাশ ও খড়িয়া প্রকাশনে গিয়ে হতাশই হতে হলো। আশপাশে কোথাও নেই প্রকাশক অমর্ত্য আতিক। ফোনকল দিয়ে জানা গেল তিনি গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে অবস্থান করছেন। এমন অবস্থানই বুঝিয়ে দিল তার প্রকাশনার বর্তমান অবস্থা। বাড়তি কোনো প্রশ্ন করতে হলো না তাই!

বাংলাবাজারের কোনো কোনো ভবনে দিনের বেলায়ও কেমন যেন আবছা অন্ধকার লুকোচুরি খেলে। যেন এসে পড়েছি নিঝুমপুরীতে! এমনই একটি আলো-আঁধারির রাজ্যে দেখা গেল তুষার প্রসূনকে। মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করছেন। অনুভব প্রকাশনীর 

বই পেস্টিংয়ে ব্যস্ত এক শ্রমিক

তুষার প্রসূন জানান, মেলা যেমনই হোক, অংশগ্রহণ থেমে থাকবে না। পাঠক-ক্রেতারাও আগের মতো ভিড় জমালে বইমেলা রূপান্তরিত হবে প্রাণের মেলায়। অনুভব এবার ১৫টি বই প্রকাশ করছে বলে জানান তিনি।

সেবা প্রকাশনী ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। বছরজুড়ে প্রতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হয় এক বা একাধিক বই। এর পাঠক ও লেখকরাও ‘মৌসুমি’ নন। মান্নান মার্কেটের নিচতলায় সেবা ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রজাপতি প্রকাশন-এর শোরুম পাশাপাশি। এখানেও বিরাজ করছে খাঁখাঁ নিঃসঙ্গতা, ক্রেতা বা কৌতূহলী দর্শনার্থী কেউই নেই। অথচ পাঠক-ক্রেতার ভিড় বছরজুড়ে কমবেশি থাকেই।

ইসলামি টাওয়ারের তৃতীয় তলায় ভাষাপ্রকাশ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল প্রকাশক ড. মিজান রহমান ট্রেসিংয়ের নির্দিষ্ট স্থানে পেনসিল দিয়ে দাগাচ্ছেন। পাণ্ডুলিপি ফাইনাল করার পর কিছু ভুল রয়েই গেছে। সেসব সংশোধন করে পুনরায় ট্রেসিং নিতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেকেই এখন সিটিপির (সরাসরি পেস্টিং-প্লেট) দিকে ঝুঁকেছেন। সেখানে তিনি এখনও ট্রেসিংয়ে পড়ে আছেন কেনÑ এমন প্রশ্ন করতে হলো না। যেহেতু সিটিপিতে সংশোধন ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিসাপেক্ষ!

রুমী মার্কেটের নিচতলায় রয়েছে নামকরা কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার অফিস কাম শোরুম। মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে জনতা প্রিন্টার্স। মেশিনম্যান মোহাম্মদ জয়নাল জানালেন, এবার সৃজনশীল বইয়ের কাজ নেই। গাইড বইয়ের কাজও তেমন নেই। বর্তমানে অল্প কিছু গাইড বইয়ের কাজ চলছে। থরে থরে সাজানো বেশ কিছু সাদা কাগজ দেখা গেল প্রেসে। কাগজগুলো এখনও শুধুই ‘সাদা পাতা’। মেশিনে ওঠানোর পর এগুলোতে কালির আঁচড় পড়লেই হয়ে উঠবে মূল্যবান কিংবা মূল্যহীন। মূল্যহীন এ অর্থে, সব বইয়ে থাকে না চিন্তার অনুরণন, দীপ্তির রেখা।

বাংলাবাজারের জনপ্রিয় খাবারের দোকান ক্যাফে কর্নার। সারা দেশ থেকে আসা লেখকদের কোনো কোনো প্রকাশক এখানে আনেন আপ্যায়ন করানোর জন্য। ভেতরে গিয়ে একজন লেখক-প্রকাশক কোনো পক্ষেরই দেখা মিলল না।

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন শুরু হবে বাঙালির প্রাণের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। চলছে প্রস্তুতি পর্ব। বই উৎসবের সঙ্গে জড়িত লেখক, পাঠক, প্রকাশক, মুদ্রাকর, বাঁধাইকর থেকে শুরু করে পুস্তক ব্যবসায়ী, স্টল নির্মাণশ্রমিকসহ নানা পেশা-শ্রেণির মানুষ। এই মেলা যেমন সকল বাঙালির আবেগের জায়গা। এ মুহূর্তে যেন তাদের দম ফেলার ফুরসতটুকু নেই। বইমেলার প্রস্তুতি নিয়ে লেখা...

পুস্তক বাঁধাই ব্যবসায়ী সমিতির একজন নেতা হাবিব খন্দকার। তার প্রতিষ্ঠান খন্দকার বুক বাইন্ডিং ওয়ার্কস-এর দুটি শাখা লক্ষ্মীবাজারের সুভাষ বোস অ্যাভিনিউ ও শ্রীশ দাস লেনে। কাজল ব্রাদার্স-এর চৌহদ্দি পেরিয়ে পাওয়া গেল হাবিব খন্দকারকে। তিনি বলেন, ‘বইমেলা উপলক্ষে কাজের চাপ প্রচুর। বইমেলা ছাড়াও বছরজুড়ে চিরায়ত বইয়ের বাইন্ডিং করি আমরা। এবার ইতিহাসভিত্তিক বই আসছে বেশি। শ্রীশ দাস লেনের কারখানায় কাজ করছেন ২৫ কর্মী, লক্ষ্মীবাজারে ১২ জন। কাজের চাপ দেখে মনে হচ্ছে কর্মীসংখ্যা বাড়াতে হবে।’ হাবিব খন্দকার মনে করেন, তার ব্যস্ততা আরও বাড়বে। নতুন বইয়ের বায়না আসছে এখনও। সৃজনশীল বই নিয়ে ব্যস্ততার কথা বললেও তার দুটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেল, পাঠ্যবইয়ের কাজ চলছে। সৃজনশীল বই তুলনামূলক কম। ঢাকা প্রিন্টার্স-এ ছাপা হচ্ছে একটি প্রবন্ধের বই। মেশিনের গোলযোগে থামিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করছেন দুজন তরুণ কর্মী। ঢাকা প্রিন্টার্সের আরেকটি অংশে নীরবে কাজ করছেন একজন বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মী। প্রতিবেদনের কথা শুনে বললেন, ‘গত বছরও একজন আইছিল, কী লেখছিল জানি না। পরে আর পত্রিকা দেয় নাই।’ বাস্তবতার ফেরে লেখক বা সাংবাদিক পুনর্বার ‘উৎস’ অভিমুখে ফেরেন না। যাদের ছবি-সংবাদ প্রকাশিত হয়, সংশ্লিষ্টরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জানেনই না কী হলো! বিপুল শ্রম-ঘাম দিয়ে একেকটি বই নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যারা থাকেন, তারা কি বই পড়েন? আবার যারা বই পড়েন তারা কি খোঁজ রাখেন কারা বইটি পরিপাটিরূপে হাতে তুলে দেন?

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্টল তৈরিতে ব্যস্ত এক শ্রমিক

এমন অনেক পারস্পরিক দূরত্বের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয় বই, পাঠকের ঘর আলোকিত করে। বিভা ছড়ায় একুশে বইমেলার সুবিন্যস্ত স্টলগুলোতেও। কদিন পরই বইমেলা। নিজেদের চিন্তার মুক্তি, নিছক বিনোদন কিংবা প্রশান্তির জন্যও অক্ষরপ্রেমীরা ছুটবেন বাঙালির প্রাণের জায়গা, অস্তিত্বের শেকড় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আনন্দ-বেদনার সরোবরে ভাসাবে বইপ্রেমীদের!

বই বাড়ি বাংলাবাজার থেকে বেরিয়ে এসে পৌঁছালাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। মাসব্যাপী বইমেলা মহাকর্মযজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত স্টল নির্মাণ শ্রমিক থেকে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে এখন হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ। কেউ কাঠে রঙ করছেন, কেউ মাটি খুঁড়ছেন, কেউবা বাঁশ কাটায় ব্যস্ত। বাংলা একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে এখন বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। কথা হয় বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. সরকার আমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এবারের বইমেলা আয়োজনের কাজ দারুণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন। আমরা দারুণ একটা মেলা উপহার দিতে চাই। তিনি আরও জানান, মেলার নকশা গতবারের মতো থাকছে। বিশেষ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ বছরে মেলার মেইন গেট থাকবে চারটি। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের গেটটি আরও পরিকল্পিতভাবে সাজানো হবে।’ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা