শনিবারের হাসি
অমল সাহা
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৩৫ এএম
ডালপুরি-সংক্রান্ত বিশেষ আলোচনা। ছবি : সংগৃহীত
জনসংখ্যার অনুপাতে আমাদের দেশ ডালপুরি উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম। ভাতের পরে ডালপুরি আমাদের প্রধান খাদ্য। পুরির ভালো দিক হচ্ছে বেয়ারা চালের মতো এগুলো উৎপাদনে জমিজমার দরকার হয় না। স্থানসহায়ক। ময়দা একটু দলাইমলাই করে নিলেই হয়। যদিও গ্রীষ্মকালে কারিগরের দুয়েক ফোঁটা ঘাম ময়দার খামিরে পড়তেই পারে। তাতে লাভ বই ক্ষতি নেই। এতে লবণ সংযুক্ত হয়ে পুরির স্বাদ বাড়ায় বই কমায় না। আমাদের দেশে হেন কোনো স্থান নাই যেখানে পুরি উৎপাদিত হয় না। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ সব জায়গায় ডালপুরি টনকে টন উৎপাদিত হয়। সব মিলিয়ে কত হাজার মেট্রিক টন ডালপুরি উৎপাদিত হয় তা একমাত্র বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোই বলতে পারবে। আমাদের সাহিত্যে ডালপুরির অবদান অস্বীকার করলে সে একটি বিরাট বরখেলাপ হবে। জ্ঞানীরা মনে করেন, ডালপুরি না থাকলে কবি-সাহিত্যিকদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে যেত।
ডালপুরির দাম কম, পুষ্টি খারাপ না। আছে ময়দা, ডাল, তেল (যদিও ডালপুরি ভাজার তেলের রঙ থাকে বুড়িগঙ্গার পানির মতো আলকাতরার রঙের।) তাই আমাদের লেখার অনারারিয়াম ও রয়্যালটি না পাওয়া চ্যাপা শুঁটকির মতো শুকিয়ে যাওয়া বড় বড় লেখক ও কবির শক্তি ও প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে এ ডালপুরি। এ পুষ্টিটুকু না পেলে কবি-সাহিত্যিকরা নেরুদা, দেরিদা, আধুনিক, অনাধুনিক, উত্তরাধুনিক, সুরিয়ালিজম, দাদাইজম, শূন্য দশকের কবি, মাইনাস দশকের কবি এসব নিয়ে কীভাবে ‘ঝড়ের কাপে চা’ তোলার শক্তি পাবে?
কবি-সাহিত্যিকগণ বরাবরই চা-পুরির ওপর নিভর্রশীল। আমার বড় দুঃখ হয় এ হেন ডালপুরি নিয়ে আজ অবধি কোনো সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হলো না। বাদ দিলাম সিম্পোজিয়ামের কথা। কারণ সিম্পোজিয়ামের আক্ষরিক অর্থ নাকি ‘মদের আসর’! একটা সেমিনার বা কর্মশালা তো হতো পারত। এক ডালপুরিখোরকে বলেছিলাম ডালপুরি কী? উনি বললেন, ময়দার মধ্যে ডাল ভরে ভাজা খাদ্যকে ডালপুরি বলে। আমি বললাম, অনেক জায়গায় তো সুজি দিয়ে ডালপুরি বানায়। উনি এমন ক্ষেপে উঠলেন, সুজিওয়ালাদের উদ্দেশে অসাধারণ এক অশ্রাব্য খিস্তি দিয়ে বললেন,
ওই ওগো সুজির পুরি পা...। এটুকু বলতেই বললাম, বাদ দেন, আচ্ছা পুরির উৎপত্তি কোথায়? আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, আরে এটা তো আমাদের উপমহাদেশের খাবার।
দেহেন না, ডালপুরি, দোসা, লুচি, কুচুরি এগুলো সবই এক জাতের যেমন কুইত্তা, বন্য কুইত্তা, পাতিশিয়াল, খেঁকশিয়াল, নেকড়ে। আমি বললাম, থামেন। ওঃ! এরপর অনেকদিন পুরি খেতে পারিনি। দেখলেই মনে হতো, কুইত্তা, বন্য কুইত্তা.....
বিয়াল্লিশ বছর আগের ঘটনা। তখন এত সুন্দর সুন্দর খাতা পাওয়া যেত না। দিস্তা কাগজ কিনে সেলাই করে সবাই খাতা বানাত। আমি বাবার কাছে কাগজের কথা বলাতে, বলল, যা নিয়ে আয়। তখন কাগজের দিস্তা এক টাকা। কাগজ কিনে ফিরে এসে বাসার গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম বাবা উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন। বাজারে যাবেন। আমি সামনে যেতেই বাবা বললেন, দেখি। বলেই কাগজের পৃষ্ঠা গুনতে শুরু করলেন। আমি প্রমাদ গুনলাম। চব্বিশ পৃষ্ঠায় এক দিস্তা। এখানে তো ছয় পাতা কম আছে। ছয় পাতার দাম পঁচিশ পয়সা মানে চার আনা। বাবা গোনা শেষ করে সরাসরি আমাকে বলল, কী খাইছস?
চোর হাতেনাতে ধরা! কোনো উল্টাপাল্টা বলার সুযোগ নাই। তাই বলতেই হলো, ডালপুরি।