লেখা ও আঁকা : নুসাইবা নাওয়ার
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ১২:৪৪ পিএম
মেলা বসেছে। বাবা বললেন, চল বিলটু মেলায় যাই। সাইকেলে চড়তে পারবি? মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ-সূচক জবাব দিল বিলটু। সেই প্রথম সাইকেলে চড়া বিলটুর। কালো ফনিক্স সাইকেলটায় চড়ে মেলায় যাওয়া। বাবার দুই হাতের মাঝখানে বিলটুর ছোট্ট শরীর।
সাবধানে সাইকেল চালাচ্ছেন বাবা। সাইকেলের মাঝখানে বাবা বসে। আর সামনে লোহার রডটাতে বসে আছে বিলটু। কী খুশি তার চোখেমুখে। মা সুন্দর জামা-প্যান্ট পরিয়ে চুলে সিঁথি করে কপালে একটা ছোট্ট কাজলের ফোঁটাও দিয়েছেন। যেন কারও নজর না লাগে। বাড়ি থেকে মেলার দূরত্ব প্রায় ২ মাইল। ফরিদ মিয়া ছেলেকে বুকের খোপে রেখে আস্তে ধীরে চালাচ্ছেন। না হলে উল্কার বেগে ছুটত সাইকেল। ছেলেটা ছোট। কোনো বিপদ হলে বিলটুর মা আস্ত রাখবেন না তাকে। মেলায় আনতে বারণ করেছে অনেক। কিন্তু ফরিদ মিয়া ইচ্ছের রাজা। তার ইচ্ছে আজ বিলটুকে নিয়ে মেলায় যাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। সাইকেলে চড়ে বাবা-ছেলে দূরের হাটে মেলা দেখতে রওনা দিল। মেলা থেকে কী কী নিবা আমার বিলটু মিয়া? বাঁশি, ঘোড়া, হাতি, ঢাল-তলোয়ার যা-ই দেখব নিব। ওরে বাপরে! ঢাল-তলোয়ার দিয়া কী করবা? কেন, তুমি জানো না শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ। ছেলের কথায়, হো হো করে হেসে ওঠেন ফরিদ মিয়া।
ততক্ষণে তারা মেলায় পৌঁছে গেল। বিলটু পারলে সাইকেল থেকে লাফ দেয়। ফরিদ মিয়া কোনোমতে সাইকেলটা রেখে ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন। নাগরদোলায় চড়বে বিলটু। গোঁ ধরল, না চড়ালে সরবে না ওখান থেকে। উপায় না দেখে ছেলেকে কোলে নিয়ে নাগরদোলায় চড়লেন। বিলটু সে কী খুশি। বলল, আম্মারেও আনলে ভালো হইত। আমরা তিনজন একসঙ্গে চড়তাম। ফরিদ মিয়া যেন ছেলের সঙ্গে শিশুকাল ছুঁয়ে দিলেন। তার বাপের সঙ্গে তিনিও একই জায়গায় এ মেলায় আসতেন। হাত ধরে ঘুরতেন। এটাওটা কেনার বায়না তো ছিলই। মাটির হাঁড়ি কিনল একটা। সেখানে বাতাসা, নাড়ু, তিলের খাজা, চিনিবরবটি আরও কত কী কিনে কিনে ভরল বিলটু। তারপর মাটির হাতি, ঘোড়া, হরিণ, বাঘসহ নানা কিছু। দুই হাত ভরে জিনিস কিনল। তোমার মার জন্য কিছু নিবা না? কী নিব মার জন্য আমি তো জানি না। চলো তোমার মার জন্য চুড়ি আর আলতা কিনি। খুশি হইব তোমার মায়। হ আব্বা তাড়াতাড়ি লই চলেন। বিলটুর আর তর সইছিল না যেন। মেলায় এত এত মানুষ, এত এত দোকানপাট, এত পসরা সাজানো। অন্যরকম লাগল তার। মনে হলো একটা স্বপ্নের দেশে এসে পড়েছে সে। বেলা প্রায়ই শেষ। সূর্য লাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশে। ফরিদ মিয়া ছেলেকে বললেন, চলো বাজান বাড়ি যাই। বিলটুর হঠাৎ চোখ গেল হাওয়াই মিঠাই বিক্রেতার দিকে। আমি ওইটা খেতে চাই আব্বা। ইচ্ছে হলে খাবা। চলো নিয়ে দিই। হাতে হাওয়াই মিঠাই নিয়ে সাইকেলে চড়ল বাপ-ছেলে। সাইকেল চলতে লাগল সাঁইসাঁই করে। বিলটুর একটুও ভয় করল না। বিলটুর বাবা দুই হাত আর বুক দিয়ে ছেলেকে আগলে রেখেছেন শক্ত করে। সাইকেলটাকে বিলটুর মনে হলো এক পঙ্খিরাজ ঘোড়া। সাত সাগর তেরো নদী পার হয়ে তারা মেলা শেষে বাড়ি ফিরছে যেন। বিলটুর আনন্দ আর ধরে না। এত খুশি এত ভালো লাগা তার ছোট্ট এ জীবনে আর পায়নি। বাবার সাইকেলটা, সাইকেলে চড়া সবকিছু অন্য এক ঘোরের ভেতর নিয়ে গেল বিলটুকে। বাবাই তার দেখা সেরা মানুষ।
নবম শ্রেণি, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, চট্টগ্রাম