ভার্চুয়াল জগতের হাতছানি
বাসন্তী সাহা
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৫৫ এএম
ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়।
প্রযুক্তির উন্নয়নের সুবাদে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে সম্পূর্ণ নতুন এক জগতে। যার নাম ভার্চুয়াল জগৎ। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়। বিশেষ করে সাইবার বুলিং বা ভার্চুয়াল নিগ্রহের শিকার হচ্ছে টিনএজ ছেলে মেয়েরা। ভার্চুয়াল জগতের হাতছানি থেকে কীভাবে বাঁচাবেন আপনার সন্তানকে তা নিয়ে আজকের আয়োজন
কয়েকদিন আগেই রাজধানীর শাহবাগে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ফুল বিক্রেতা মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। পর্নোগ্রাফির সঙ্গে স্কুল পড়ুয়া মেয়ের মুখ বসিয়ে মায়ের কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। না দিলে ছবি ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি আসে। ধর্ষণের খবর পড়ে ছয়-সাত বছর আগের শিউলির মুখটা ভেসে উঠল। আমার ১৪ বছরের মেয়েটা স্কুলে যায়, প্রতি মুহূর্তে মা হিসেবে মেয়ের নিরাপদে ঘরে ফিরে আসার প্রত্যাশায় থাকি। স্কুলে, রাস্তায়, বাসার গেটে এমনকি ঘরে, কোথাও এই মেয়েশিশু এমনকি ছেলেশিশুরাও নিরাপদ নয়। এর সঙ্গে নতুন আতঙ্ক সাইবার বুলিং বা ভার্চুয়াল নিগ্রহ। এ মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন কোণে অব্যাহত নারীনিগ্রহ চলছেই। কোথাও আক্রান্ত নারী, মেয়ে-ছেলে শিশু সবাই।
আজ আর বলতে কোনো বাধা নেই, টিনএজ মেয়েদের মায়েরা নতুন এক আতঙ্কে ভোগেন, সেটা হচ্ছে মেয়ের নিরাপত্তা। কোভিডের পরে এসব টিনএজ ছেলেমেয়ের হাতে উঠে এসেছে মোবাইল ফোন। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান তখন করা হয়েছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। ফলে একটি ইন্টারনেট সংযোগসহ মোবাইল ফোন তার সঙ্গী হয়ে ওঠে। কোভিডের সময়টা কেটে যাওয়ার পরেও তারা এর আসক্তি থেকে বেরোতে পারেনি। যুগের হাওয়ার মোবাইল ফোনের বিভিন্ন অ্যাপ ও মাধ্যম ব্যবহারে এরা এতই দক্ষ যে, বাবা-মায়ের কোনো ধারণাই থাকে না ছেলে বা মেয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে বা ছবি পোস্ট করছে। ফলে এ ভার্চুয়াল জগতে ছেলে ও মেয়েশিশুর নিরাপত্তা বাবা-মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তাদের আসক্তি এতই বেশি যে, মোবাইল ফোন না পেয়ে মেয়ে আত্মহত্যা করেছে এমন ঘটনাও ঘটছে।
রোজকার জীবনে এ ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব কতখানি?
আমরা এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যেখানে বাবা-মায়ের চেয়ে ছেলে-মেয়েরা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি দক্ষ। বাচ্চারা এ সুযোগটাই নেয়। কোথায় কোথায় কতগুলো অ্যাকাউন্ট আছে সেটা বাবা-মায়ের পক্ষে জানাও সম্ভব নয়। হাতিয়ার মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রচুর লেখাপড়া না-জানা মানুষের হাতে দামি স্মার্টফোন! ফলে এসব ফোনের প্রযুক্তি, অবাধ তথ্যপ্রবাহ কাজের চেয়ে অকাজেই লাগছে বেশি। ভুল তথ্য, অপতথ্যে ভরে উঠছে ভার্চুয়াল জগৎ। লাইক আর ফলোয়ার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সবকিছু করতে পারে এখন এ জগতের তারকারা। ইউটিউবার বলে নতুন একটা শ্রেণিই গজিয়ে উঠেছে আজকাল। তাই বাবা-মায়েদের জন্য সময়টা অস্থির ও ভয়ের। একদিকে সন্তানের ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য লেখাপড়া, অন্যদিকে মাদক ও সাইবার আক্রমণের বাইরে সন্তানকে রাখার একটা চ্যালেঞ্জ চলে এসেছে সামনে। দেশপ্রেম, ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক জীবনাচরণ, মূল্যবোধ, সর্বোপরি সংস্কৃতিই তৈরি করে দেয় ভার্চুয়াল জগৎ। ফলে কখন কী ঘটবে, তার অভিঘাত আমাদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা বোঝার উপায় নেই কোনোভাবেই।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ভয়েসের গবেষণায় দেখা যায়, সাইবার সহিংসতার ক্ষেত্রে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত লিঙ্গভিত্তিক মামলা বিবেচনায় ৭০ শতাংশ নারী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। নারী পুরুষের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে নারীই বেশি শিকার হয়েছে।
কী ধরনের অপরাধ হয় সাইবার জগতে
সাইবার ক্রাইম বলতে সাধারণত কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে যে অপরাধ হয় তাকে বলে। সাধারণভাবে নারীর কোনো স্ট্যাটাস বা মন্তব্যের ওপর বাজে বা নোংরা মন্তব্য করা, ফেক ফেসবুক আইডি খুলে হয়রানি করা, নোংরা বার্তা পাঠানো, উত্তেজক ছবি পাঠানো, সম্পর্কে থাকার সময়ের অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেলও সম্প্রতি দেখা গেছে, পর্নো তারকার মুখের পরিবর্তে মেয়ের বা নারীর ছবি বসিয়ে ব্ল্যাকমেল বা হয়রানি করা, চাঁদা দাবি করা।
এ ছাড়া ফেসবুকে বা অন্য কোনো গণমাধ্যমে কাউকে নিয়ে মিথ্যা মানহানিকর ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা, ভিডিও আপলোড করা, কারও অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা চাওয়া এমনকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারও পোস্ট বা লাইক নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোকেও সাইবার অপরাধ বলা যেতে পারে। এ ছাড়া অনলাইন ব্যবহার করে যেকোনো অপরাধ করলে সেটাই হতে পারে সাইবার অপরাধ।
দেশে এ ধরনের সাইবার আক্রমণ দমনে কী ধরনের আইন রয়েছে
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমনে বা এর শিকার হলে প্রতিকার পাওয়ার জন্য বেশ কিছু আইন আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতাই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দিতে পারে। এসব গণমাধ্যম ব্যবহারে কিছু নির্দেশনা রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে বা সচেতন থাকলে এসব সাইবার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক তথ্য বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের উন্নত স্মার্টফোন বা প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। না হলে নারী-পুরুষ-শিশু সবারই সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্মানহানির বিষয়টি সবচেয়ে ভয়ংকর আকার ধারণ করবে।
সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু আইন রয়েছে
এ রায়ে আরও বলা হয়Ñ যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা, চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি, নোটিস, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, নোটিস বোর্ড, অফিস, ফ্যাক্টরি, শ্রেণিকক্ষ, বাথরুমের দেয়ালে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কোনো কিছু লেখা; এ ভিডিওটা দেখ, আনন্দ পাবে! আমায় টাচ্ করবেন না! যৌন হয়রানিমুক্ত শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ তৈরিতে হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত নীতিমালা; ঝ) ব্ল্যাকমেল অথবা চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিওচিত্র ধারণ করা; ঞ) যৌন হয়রানির কারণে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষাগত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা; ট) প্রেমনিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেওয়া বা চাপ প্রয়োগ করা; ঠ) ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনের চেষ্টা করা। উল্লিখিত ১ক-ঠ আচরণসমূহ নারীর স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং অপমানজনক। কোনো নারী যদি এ ধরনের আচরণের শিকার হন এবং যদি তিনি মনে করেন যে, এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তার কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা যেখানে তিনি আছেন সেখানকার পরিবেশ তার বিকাশের জন্য বাধা বা প্রতিকূল হতে পারে তাহলে উক্ত আচরণসমূহ নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৪-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেসে অবৈধভাবে প্রবেশ করে যদি কোনো অপরাধ সংঘটন করেন তবে সেই ব্যক্তি অনধিক ছয় মাস কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা ও উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া এ আইনে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সাত বছর কারাদণ্ড ও ২০ লাভ টাকা জরিমানা ও উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সাইবার ক্রাইম থেকে সুরক্ষার যথেষ্ট আইন থাকলেও এর ব্যবহারে সতর্ক না থাকা ও অভিযোগ না করার কারণে এ ধরনের অপরাধীরা সহজেই রক্ষা পেয়ে যায়। এ ছাড়া এ ধরনের অপরাধের শিকার হয় কম বয়সি নারী-পুরুষ যারা পরিবার-সমাজের ভয়ে প্রকাশ করতে পারে না বা অভিযোগও জানাতে পারে না। এ ছাড়া বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও সামাজিক মর্যাদার কারণে বাবা-মাও এ ধরনের অপরাধের শিকার হয়েও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে চান না। তবে এ ব্যাপারে সরকার, গণমাধ্যম ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও বেশি সক্রিয় ও আক্রান্ত ব্যক্তি বা নারীর প্রতি সহমর্মী হতে হবে। তাহলে অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ভয়াবহ অপরাধের মতো এ সাইবার ক্রাইমও কমিয়ে আনা যাবে।