এহসান রিয়াজ, কমলনগর
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৩২ এএম
মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে ৪৩১৬তম স্থান অর্জন করেন শিমা। প্রবা ফটো
অভাবের সংসার। অসুস্থ বাবার আয়-রোজগার না থাকায় স্বল্প আয়ের বড় ভাইদের ওপর নির্ভর পুরো পরিবার। যে কারণে বেতন-পরীক্ষা ফিসহ বিভিন্ন খরচ চালানো অসম্ভব হওয়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত। সবার সহযোগিতায় গত বছর কোচিং করেও ভর্তির সুযোগ মেলেনি। তবু থেমে যাননি দরিদ্র পরিবারের সন্তান মেধাবী শিমা আক্তার। জেদ ধরেন মেডিকেলে পড়ার। তাই টাকার অভাবে পুনরায় কোচিং করতে না পারলেও এবার আর চেষ্টা বিফলে যায়নি তার। বাড়িতে বসে ভর্তি গাইড পড়ে সুযোগ করে নিয়েছেন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে।
রবিবার প্রকাশিত ফলাফলে এ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন তিনি। শত বাধা পেরিয়ে রূপকথার গল্পের মতো শিমার এ কৃতিত্বে খুশি শিক্ষক ও স্বজনরা।
শিমার পরিবার ও এলাকাবাসীসূত্রে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার প্রতি শিমার প্রচণ্ড আগ্রহ। পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করেন। স্থানীয় চরপাগলা পাটওয়ারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ভর্তি হন চরকালকিনি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ৪.৮৯ জিপিএ নিয়ে ২০২১ সালে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে। কিন্তু বাড়ি থেকে জেলা শহরের এ কলেজটি দূরে হওয়ায় ও আসা-যাওয়ার ভাড়ার অভাবে নিয়মিত যাওয়া হতো না তার। তবু সেখান থেকে ৪.৮৩ জিপিএ নিয়ে ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করেন শিমা।
ওই বছর চেষ্টা করেও মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ না হওয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য কোথাও ভর্তি না হয়ে এবার পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেন। রবিবার প্রকাশিত মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে ৪৩১৬তম স্থান অর্জন করেন তিনি।
জানা গেছে, পরিবারের ছয় সন্তানের মধ্যে শিমা পঞ্চম। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের চরজাঙ্গালিয়ার দরিদ্র বাবা আলী আহাম্মদ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় আয়-রোজগারহীন। বড় দুই ভাই মো. রিপন ও জাহাঙ্গীর আলমের স্বল্প আয়ে কোনোরকম চলছে তাদের সংসার। চরকালকিনি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর টাকার অভাবে শিমার লেখাপড়া অনেকটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তখন শিক্ষকরা তাকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে পড়ালেখা করার সুযোগ দেন। এভাবেই দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা চলে তার। সেখান থেকে এসএসসি পাসের পর একই ধরনের সহযোগিতা পান লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েও। সেখান থেকে এইচএসসি পাসের পর রেটিনা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েও গেল বছর মেডিকেলে পড়ার সুযোগ করতে পারেননি। কিন্তু শিমার প্রবল ইচ্ছা মেডিকেলেই পড়ার। এ লক্ষ্যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি না হয়ে দ্বিতীয়বার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। টাকার অভাবে এবার আর কোচিংয়ে ভর্তি হতে না পারায় বাড়িতে বসে মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে হয় তাকে।
শিমার মা আয়েশা বেগম জানান, ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি খুব আগ্রহ শিমার। অনেক কষ্টে মেয়ের এমন কৃতিত্বে তারা আনন্দিত। তবে এর মাঝে রয়েছে দুশ্চিন্তাও। কারণ তার দুই ছেলে যে আয় করে তা দিয়ে সংসার ও মেয়ের মেডিকেল পড়াশোনার খরচ মেটানো অনেকটাই অসম্ভব।
চরকালকিনি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহমুদুর রহমান বেলায়েত জানান, শিমা ওই বিদ্যালয়ে পড়ার সময় টাকার অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তখন মেধার কথা চিন্তা করে তার পড়ালেখার সমস্ত খরচ মওকুফ করা হয়েছিল।
শিমা আক্তার জানান, দারিদ্র্য জয় করা বিভিন্ন গুণিজনের জীবনী পড়ে তিনি অনুপ্রাণিত হন। সেগুলো ধারণ করেই তিনি মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখেন। প্রথমবার যখন সেই স্বপ্ন অধরা হয়ে পড়ে তখন মনে জেদ ধরে তার। ওই জেদই তাকে এখন স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি পৌঁছিয়েছে। এ সাফল্যের জন্য মা, ভাই ও শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন শিমা।