আজারবাইজান
রাজিব চৌধুরী
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:০১ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:০৫ এএম
ওল্ড সিটি হল বাকুর সবচেয়ে প্রাচীন অংশ, যা দেয়াল দিয়ে ঘেরা
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এক দেশ আজারবাইজান। পূর্ব ইউরোপের এটি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। কৃষ্ণসাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সবচেয়ে পূর্বে অবস্থান দেশটির
বিমান যে মুহূর্তে ল্যান্ড করছিল বাকুর আকাশে, তখন তারা ফুটতে শুরু করেছে। সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩০। ঢাকা থেকে বাকুতে সরাসরি ফ্লাইট নেই। শারজায় ট্রানজিটে দুই ঘণ্টা কাটিয়েছি। সব মিলিয়ে নয় ঘণ্টার জার্নি। বাকুর এয়ারপোর্টের ভেতরটা বিশাল। পরিবেশ, ঠান্ডা আবহাওয়ায় দ্রুত মানিয়ে নিয়েছি। বাকুতে তাপমাত্রা ৮-৯ থাকলেও ভেতরে তেমন টের পাওয়া যাচ্ছে না ঠান্ডা। বাকুর এ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম হায়দার আলিয়েভ। আজারবাইজানের ছয়টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে এটি অন্যতম। সাবেক রাষ্ট্রপতির নামে নামকরণ। আমরা এসেছি কপ২৯ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে। এবার সম্মেলনের আয়োজক আজারবাইজান। পূর্ব ইউরোপের এটি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। এ সুযোগে দেশটাও ঘুরে দেখা যাবে। বিমানবন্দরে কপ২৯-এর একটি কর্নার পেলাম। ভলান্টিয়ারদের দুজন এগিয়ে এসে স্বাগত জানালেন। ভার্সিটি স্টুডেন্ট। বেশ কিছু তথ্য জেনে নিলাম। এবার একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলের উদ্দেশে যাত্রা। প্রথম দিন আমাদের হোটেল বিখ্যাত নিজামি স্ট্রিটে। ব্যস্ত শহর বাকু। বাইরে বেরোতেই শীত জেঁকে বসল। বাতাসও আছে। যেহেতু কাস্পিয়ান সাগর দূরে নয়। রাস্তাঘাট চওড়া। অনেক পুরোনো ভবনের সঙ্গে নতুন ভবনগুলোও আলোকসজ্জিত। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর শব্দ ও বায়ু দূষণমুক্ত শহর বুঝতে আর বাকি নেই। ২৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম হোটেলে। ঐতিহ্যবাহী এ জায়গায় হোটেলগুলো পুরোনো সব চমৎকার ভবন ঘিরে। হোটেল থেকে কাছেই পাথরবাঁধানো রাস্তা। অদূরে স্ট্রিটফুডের লোভ সামলাতে পারিনি। ভেড়ার কাবাব, রুটি, শর্মায় ডিনার শেষ করি। পরের তিন দিন গেল অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে। কপ২৯-এ নানা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ছিল। চতুর্থ দিন থেকে ব্যস্ততা কমে এলো। ককেশাস অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এ দেশ ঘুরে দেখার আগ্রহ কার না থাকবে! প্ল্যান সাজিয়ে নিলাম। বাকুর মেট্রোরেল গেছে পাতাল দিয়ে। সবচেয়ে বড় সুবিধা এমনভাবে প্রতিটি স্টেশন যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো খুব কাছে।

কাস্পিয়ান সাগর ও বাকুর নাইট লাইফ
চতুর্থ দিন। রৌদ্রোজ্জ্বল বিকাল। আসার দুই দিন পর আমরা হোটেল চেঞ্জ করি। ইনসেতচিলার স্টেশনের নিকটবর্তী একটা আবাসিক এলাকায়। অ্যাপার্টমেন্ট ঠিকানা হয়। এ কদিনে স্টেশন সব মুখস্থ হয়ে গেছে। সাহিল স্টেশন থেকে কাস্পিয়ান সাগর দূরে নয়। স্থানীয়রা দারুণ হেল্পফুল। সহজেই পথ ধরে চলে এলাম। আমাদের সমুদ্রের মতো নয়। শব্দ আর ঢেউ উপচে পড়বে। আসলে এটা হ্রদ। বাকু শহর, বন্দর কাস্পিয়ান সাগরতীরে গড়ে উঠেছে। সাগরতীরে বাতাসের বেগ আছে। বিরাট আকৃতি নিয়ে আকাশে চাঁদের দেখা মিলল। তীর ঘেঁষে মানুষের হাঁটার বসার জন্য দারুণ রাস্তা ও ভিউ পয়েন্ট বানিয়ে রাখা হয়েছে।
শেষ বিকালে সূর্য হেলে পড়ছে। ঠান্ডা বাতাস। সন্ধ্যা নামে। তার আগে বিভিন্ন ভবনে লাইট জ্বলে উঠেছে। অনেক সিগাল ভিড় জমিয়েছিল।
ঘণ্টা দুই তীরে কাটিয়ে প্রশস্ত রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করি। পার্ক, ক্যাফে, স্ট্রিট ফুড, শপিং সেন্টার সবই কাছে। হাঁটাহাঁটিতে কোনো ভিড় নেই। ট্রাফিক আইন দারুণ মানা হয় এখানে। সাহিল স্টেশনে এসে নিজামির পথ ধরলাম। মেট্রোয় ১৫ মিনিট নিল। নিজামি স্টেশন। একজন কবির নামে নামকরণ হয়েছে। মেট্রো স্টেশনের ওয়ালজুড়ে অনেক পেইন্টিং ও খোদাই করে ছবি আঁকা। যেখানে নিজামির লেখা চরিত্রের অনেক অনুষঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা সময় হাঁটতে হয়। নিজামি স্ট্রিট পর্যটক ও স্থানীয়দের ভিড়ে মুখরিত। সব ট্যুরিস্ট এখানে আসবেই। স্ট্রিটের দুই পাশে স্থাপত্যশিল্পের অনুপম অট্টালিকা। নতুন ভবন আর পুরোনো ভবনগুলোর আলো অন্যরকম অনুভূতি জাগায়।
বাকুর সবচেয়ে বড় বুকশপ এখানে। বিশাল বুক ক্যাফে। এমন বুক ক্যাফেতে সারা দিন পড়ে থাকলেও বিরক্তি আসবে না। অধিকাংশ বই তাদের ভাষায় লেখা। বেরিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এ ব্যস্ত পথের পাশে অট্রালিকা যা পুরোনো থেকে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণে প্রায় ৩ কিলোমিটারের বেশি প্রসারিত। বিলাসবহুল ব্র্যান্ড, স্থানীয় বুটিক, ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁ দেখতে দেখতে ৯টা বাজল। সাংস্কৃতিক ল্যান্ডমার্ক প্রাণবন্ত পরিবেশ, কেনাকাটার দৃশ্যগুলো ঐতিহাসিক আকর্ষণে টেনে নেয়।

অল্ডসিটি, মেডেন টাওয়ার ও ক্ষুদ্রাকৃতি বইয়ের জাদুঘর
আজকের পুরো দিন অল্ডসিটির জন্য। ইচেরশেহের মেট্রোর শেষ স্টেশন। বাকুর ঐতিহাসিক শহর। কাস্পিয়ান সাগরের তীরে গড়ে উঠেছিল কয়েক শতাব্দী আগে। পুরোনো এ শহর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। স্টেশন থেকে নেমেই ৫ মিনিট হাঁটলে ঢোকার গেট। অন্যরকম অনুভূতি দোলা দেয়। ফিরে গেলাম কয়েক শতাব্দী আগে। ১২ শতকের দেয়ালদ্বারা বেষ্টিত শহর। প্রাচ্যের স্থাপত্য ও ইতিহাসে পরিপূর্ণ এ সিটিতে ওয়াকিং ট্যুর দেব সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে গাইডের কাছ থেকে সৌজন্য গাইড ম্যাপ পেলাম। কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ দিতে কার্পণ্য দেখালাম না একটুও। ভেতরের দিকে পা বাড়াই। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অনুপম অট্টালিকার সরু গলিগুলো গোলকধাঁধার মতো মনে হলো। অবাক লাগল দেখে এটা মুখহীন ধ্বংসাবশেষ নয়। প্রাচীন বাড়িগুলোতে এখনও মানুষ বসবাস করছে। এমন একটি পরিবারের সঙ্গে ভাব জমিয়েছিলাম। ইংরেজি জানে না। ইশারায় সবকিছু।
হাঁটছি আর দেখছি। জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ, আর্ট গ্যালারি সব ধরনের খাবারের দোকান আছে। ট্যুরিস্টদের থাকার জন্য কিছু হোটেলও আছে। জায়গাটা যেন একটা জীবন্ত ওপেন এয়ার মিউজিয়াম। এ সিটি গড়ে উঠেছিল কাস্পিয়ান সাগরের তীরে। দুর্গের প্রাচীরটিতে ২৫টি টাওয়ার এবং পাঁচটি গেট রয়েছে।
এ সিটির প্রাচীন ভবনগুলোর একটিতে গড়ে উঠেছে বাকু মিউজিয়াম অব মিনিয়েচার বুকস। শুরু করলাম সেটা দিয়ে। কোনো টিকিট লাগেনি। এটা ওপেন সবার জন্য। আংটির সমানও বইয়ের দেখা পেলাম। কী অদ্ভুত, বিস্ময়জাগানিয়া! এত ক্ষুদ্র বইও হতে পারে! লেখা আছে ২০১৫ সালে জাদুঘরটি ক্ষুদ্রাকৃতির বইয়ের বৃহত্তম ব্যক্তিগত জাদুঘর হিসেবে গিনেস বুক অব রেকর্ডসে জায়গা করে নেয়। উদ্যোক্তা সেই মহিলার সঙ্গে দেখা হলো। ষাটোর্ধ্ব বয়স।
কিছুটা গল্পের ছলে বললেন বাকু মিউজিয়াম অব মিনিয়েচার বুকস জাদুঘরটি ২ এপ্রিল, ২০০২-এ তার কার্যক্রম শুরু করে। ১৩ শতক থেকে বর্তমান দশক পর্যন্ত বিরল বই আছে। আমাকে দেখালেন বিপ্লবোত্তর রাশিয়া এবং সোভিয়েত আমলে প্রকাশিত ক্ষুদ্রাকৃতির বই।
মোলদাভিয়া, জর্জিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ এবং মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের প্রজাতন্ত্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের বইয়ের দেখা পেলাম। চুকভস্কি, বার্তো, গোগোল, দস্তয়েভস্কি, পুশকিনের কাজসহ অনেক বিরল সংস্করণ সংরক্ষিত। বিখ্যাত আজারবাইজানীয় ক্লাসিকের ক্ষুদ্রাকৃতির বই, যেমন ভাগিফ, খুরশিদবানু নাতাভান, নিজামি গাঞ্জাভি, নাসিমি, ফিজুলি কবিদের। সবচেয়ে প্রাচীন বইটি দেখালেন কুরআন; যা ১৬৭২ সালে সৌদি আরবে প্রকাশিত হয়েছিল।
ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে বিদায় নিয়ে বের হলাম। এখন টিকিট কাটতে হবে। সংরক্ষিত সাইটে ঢুকব। প্রাচীন ভবনের একাংশকে আবার মিউজিয়াম বানিয়েছে। ১৫ মানাটে টিকিট সংগ্রহ করলাম।
ভেতরে আজারবাইজানি ও ইংরেজি ভাষায় সবকিছু লেখা আছে। তার পরেও একজন স্টাফের সহযোগিতা নিলাম।
১৮৮৬ সালে রাশিয়ান বিজয়ের পর সেগুলো সংস্কার করেছিল যার বেশিরভাগ দেয়ালই টিকে আছে। শিরভান-শাহদের প্রাসাদ, যেটাকে জাদুঘর বানিয়েছে, যার প্রাচীনতম অংশটি ১১ শতকের। এ ছাড়া ভেতরে সিনিক-কালা মিনার এবং মসজিদ। সেখানে লেখা ১০৭৮-১০৭৯। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ভবন আইন-আদালত (দিভান-খান), ঝুমা-মেচেট মিনার এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিদা বাকুভির সমাধি দেখে নিলাম। এত সব আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক, এনটিক জিনিস দিয়ে মিউজিয়াম সাজানো। আর লাইটিংটাও সেই মেজাজ অনুযায়ী। সবকিছু দেখে বেরিয়ে এলাম। এবার রওনা দিই মেডেন টাওয়ারের দিকে। একদম সাগরের নিকটবর্তী। ৯৭ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন ১২ শতকে নির্মিত এটি। এর আছে অনেক ইতিহাস। অনেক কিংবদন্তি। ২০০১ সালে এ স্তম্ভটিও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্ট অব হিস্টোরিক্যাল মনুমেন্টের সাংস্কৃতিক সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। এটি আজারবাইজানের সবচেয়ে স্বতন্ত্র জাতীয় প্রতীকগুলোর মধ্যে একটি ধরা হয়। সেখানেও মিউজিয়াম। টিকিট কেটে ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা যায়। পুরো সন্ধ্যা সেখানে কাটে। প্রতিটি পাথর রহস্যময় অতীতপূর্ণ মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য নিয়ে ফিরতে ফিরতে অ্যাপার্টমেন্টে রাত ৮টা বেজে গেল।
মডার্ন আর্ট, কার্পেট ও জাতীয় জাদুঘর
মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম শিল্পপ্রেমী পর্যটকদের অন্যতম শীর্ষ সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। টিকিট কেটে ঢুকেই মনে হলো কথাটা একবিন্দু মিথ্যে নয়। মূল আকর্ষণ সালভাদর ডালি, পাবলো পিকাসোর পেইন্টিং। সব জায়গায় ছবি তোলা গেলেও এখানে নিষেধ। আজারবাইজানীয় চিত্রশিল্পী এবং ভাস্করদের ৮০০টির বেশি কাজ রয়েছে, বিশেষ করে ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর আভান্ট গার্ডে শিল্প। ঘণ্টা দুইয়ে যা দেখলাম এতে এটা নিশ্চিত, এ দেশে আধুনিক শিল্প একটি নবজাগরণ উপভোগ করছে।
এখান থেকে বেরিয়ে উবারে ৩০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম কার্পেট মিউজিয়ামে। এটি ক্যাস্পিয়ান সাগরের ধারে অবস্থিত। একদম কার্পেট ভাঁজের আদলে স্বতন্ত্র স্থাপনা।
মিউজিয়াম দেখে বের হলাম। তখন ঘড়ির কাঁটায় বেলা ২টা। লাঞ্চ করেই ছুটলাম জাতীয় জাদুঘরের উদ্দেশে। সেটা আবার নিজামি স্ট্রিটের কাছেই।
জাতীয় জাদুঘর যে ভবনে অবস্থিত সেটি একজন তেল কোটিপতি এবং সমাজসেবী হাজি জেনালাবদিন তাঘিয়েভ এবং তার পরিবারের। ইতিহাসের সেই তাঘিয়েভের বাড়িটিই জাদুঘর। বিল্ডিংয়ের নয়টি কক্ষে অবস্থিত। এ কক্ষগুলোতে হাজি জেনালাবদিন এবং তার পরিবারের আসবাবপত্র ও বিভিন্ন জিনিসপত্র রয়েছে। সেইসঙ্গে পরিচয় মেলে তাঘিয়েভ পরিবারের জীবনধারার সঙ্গে।
জাদুঘরের অন্যান্য অংশে দেখলাম প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত আজারবাইজানের ইতিহাস প্রতিফলিত করে প্রায় এমন সব জিনিস প্রদর্শিত আছে। প্রস্তরযুগ, মধ্যযুগ এবং প্রাচীনত্বের মূল্যবান জিনিস। ঘুরে ঘুরে দেখলাম পতাকা, শহর এবং দুর্গগুলোর প্রতীকী চাবি, নথি, পোশাক, মুদ্রা এবং ব্যাংকনোট। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ভ্রমণ করে আজ ফিরে এলাম। তার আগে যখন ঢুকছিলাম ১০ মানাটের টিকিট কাটতে হয়েছিল।
বিবি-হেবাত মসজিদ ও আতিশগহ অগ্নিমন্দির
আজকের দিনও বাকুতে দুটি ধর্মীয় স্থাপনা দেখব। কিন্তু শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে। সপ্তম শিয়া ইমাম মুসা আল-কাদিমের কন্যার সমাধির ওপর নির্মিত বিবি-হেবাত মসজিদে পৌঁছতে ৩০ মিনিট লাগল। একরকমের স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে গেল। অসাধারণ কারুকাজময়। আধুনিক স্থাপনা হলেও পুরোনো ইতিহাস ও ছবি দেখে স্থাপত্যবিদরা সেই আদল রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কেননা ১৯৩৬ সালে বলশেভিকদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে এটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে, যা পুরোনো মসজিদের ঐতিহ্যবাহী। ঢেউ তোলা গ্যালভানাইজড লোহার আকৃতি এবং দুটি মিনার রয়েছে। গম্বুজগুলো সবুজ এবং ফিরোজা আয়না দিয়ে সজ্জিত। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরের সমাধি থাকায় এটি এ অঞ্চলের মুসলমানদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। আজারবাইজানের ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান স্থাপনা।
শিয়া অধ্যুষিত দেশে ৯৭ ভাগ মুসলিম। সুন্নিও আছে। সে দেশ প্রমাণ রেখেছে তারা এক অসাম্প্রদায়িক জাতি। মসজিদ দেখে চলে এলাম আরও ২৫ কিলোমিটার দূরে।
বাকুর ‘আতিশগহ অগ্নিমন্দির’। ১০ মানাটে টিকিট কেটে প্রবেশ করি। এটা এখন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও মিউজিয়াম। বাকু থেকে পশ্চিমে সুরাখানি শহরে এ মন্দিরের অবস্থান। পার্সিয়ান শিলালিপির ওপর ভিত্তি করে জানা যায়, এ মন্দিরে একসময় হিন্দু, শিখ আর অগ্নিপূজকরা উপাসনা করতেন। বাকুর ভারতীয় বাসিন্দারা এটি নির্মাণ করেন। প্রাচীনকাল থেকেই তারা ভাবতেন, জায়গাটিতে তাদের ভগবান থাকেন। দশম শতক বা তারও আগে থেকে আগুনের পূজা হয়ে আসছিল। আতিশগহ নামটি এসেছে পার্সি থেকে, যার অর্থ ‘আগুনের ঘর’। বর্তমানে সেই আগুন জ্বলছে কমপ্লেক্সের একটি বেদিতে প্রাকৃতিক গ্যাসযুক্ত একটি গম্বুজের ওপর। আর এটি শুধু দর্শনার্থীদের সেই ইতিহাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
দেয়ালঘেরা জায়গায় মোট ২৪টি কক্ষ আছে। সরাইখানার মতো। প্রতিটি কক্ষে ভাস্কর্য বানিয়ে সে সময়ের জীবনযাপনের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। একদম জীবন্ত দেখতে। ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কোর বৈশ্বিক ঐতিহ্যবাহী তালিকায় এ কমপ্লেক্স অন্তর্ভুক্ত হয়।
জাদুর রঙের দেশ
বাকুতে থাকলে সবচেয়ে আইকনিক ঠিকানা খুঁজতে হয় না। শহরের সব দিক দিয়েই ফ্লেম টাওয়ারের দেখা মেলে। তিনটি শিখা আকৃতির টাওয়ার। আজার অর্থ আগুন। বাইজান হচ্ছে রক্ষাকারী। এ পবিত্রজ্ঞান তাদের হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী। এটির ডাকনাম ‘দ্য ল্যান্ড অব ফায়ার’। এ টাওয়ারগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানি এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অফিস ও বিলাসবহুল হোটেল রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে দুর্দান্ত লাইট শো। টাওয়ারগুলোতে আগুনের শিখা জ্বলে মিনিট পর জাতীয় পতাকা উড়ছে। এমন দৃশ্য দূর থেকে মুগ্ধ করে।
ছবি : লেখক