শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১৯:৫০ পিএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:০৩ পিএম
নতুন ধান কবেই গেছে ঘরে। এবার পালা পিষ্টক পরমান্নের। হিম হিম শীতে ঝরছে খেজুরের রস, তৈরি হচ্ছে নলেন গুড়। বাড়ির পুরোনো ঢেঁকিতে লেপ্টে আছে নয়া চালের পিঠালি। ধাড়ুমধুড়ুম শব্দে পাড়াগাঁ মুখর হয়ে আছে। পৌষ তো আদতে পিঠারই মাস। বছরজুড়ে ঘরে ঘরে নানানরকম পিঠার আয়োজন চললেও আসল সময় শুরু হয় শীতকালে। আর পৌষপার্বণ তাতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। সারা দেশের মতো সিলেট অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও এ উৎসব পালন করে সাড়ম্বরে। বাড়ির পুরোনো ঢেঁকিশালটি লেপে মুছে সাফ করা হয়ে গেছে। টুকরি ভরা চাল নিয়ে হাজির পাড়াপড়শি। সঙ্গে কুলাডালাও। ধাপুরধুপুর শব্দে চলছে গুঁড়ি কোটা। তবে কাজটি একেবারে সহজ নয়। নির্দিষ্ট তাল বজায় রেখেই পাড় দিতে হয়। সেই তালের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই ঢেঁকির নিচে হাত দিয়ে গুঁড়ি নেড়েচেড়ে দিতে হয়। গুঁড়ি ভালোমতো মিহি করতে হলে অন্তত তিন ধাপে পাড় দিতে হয়। বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। পাড় দিতে দিতেই মাধবী দেবী জানাচ্ছিলেন ঢেঁকির নানা কথা। পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন ঢেঁকির নানা অংশের সঙ্গে। চুরকুটি, মনোহর, কেতরা, ঘাইলÑ ঢেঁকির বিভিন্ন অংশের আঞ্চলিক নামগুলোও বেশ চমৎকার। বললেন, ‘এখন দশগ্রামে খুঁজেও একটি ঢেঁকি পাওয়া যায় না, আগে তো ঘরে ঘরেই ছিল। আহারে! কত বারা কোটছি, কত চিড়া পাড় দিছি তা এখনও চোখে ভাসে।’
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় ‘পথের পাঁচালি’র ইন্দির ঠাকরুণের কথাÑ ‘পৌষ-পার্বণের দিন ঐ ঢেঁকিশালে একমণ চাল কোটা হইত-পৌষ-পিঠার জন্যÑ চোখ বুজিয়া ভাবিলেই ইন্দির ঠাকরুণ সেসব এখনও দেখিতে পায় যে!’ কালের আবর্তে ঢেঁকি বিলুপ্তপ্রায়। মেশিনে কোটা গুঁড়ি কিংবা আটা-ময়দাতেই চলে পিঠা তৈরি। তবে এখনও কোথাও স্মৃতি হয়ে টিকে থাকা ঢেঁকিঘর পৌষসংক্রান্তি এলে জেগে ওঠে।
গুঁড়ি কোটা হয়ে গেলে শুরু হয় পিঠা তৈরির পালা। ডাক পড়ে পিঠা খাওয়ার। নিভা রানী মাটির চুলা পেতে রেখেছেন বাড়ির উঠানে। সেখানেই তৈরি হচ্ছিল গরম গরম পিঠা। চালের গুঁড়ির রুটি আর বিরইন (বিরুই) চালের মালপা। প্রথম পিঠাটি তুলে আলাদা করে রাখছেন। ভৈরব দেবতার থালির উদ্দেশ্যেই তুলে রাখা। পূর্বপুরুষরা এ নিয়ম মেনে আসছেন বলে জানান নিভা রানী। নতুন ধান ঘরে আসার পরও ভৈরবের থালি দেওয়ার পর নিজেরা খেয়ে থাকেন। তবে কেবল রুটি আর মালপা নয়, পিঠা রয়েছে আরও কত পদের। সিলেটের কিছু ঐতিহ্যিক পিঠারও দেখা মেলে এ আয়োজনে। চোঙা পিঠা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এ সময় পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা এক ধরনের ছোট ছোট বাঁশের নল পাওয়া যায় হাটে বাজারে। এটি ডলু বাঁশ নামে পরিচিত। বিন্নি চাল ভিজিয়ে রেখে বাঁশের নলে পোরা হয়। তারপর বাঁশের চোঙা বা নল ভালোমতো পুড়িয়ে নিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। পোড়া হয়ে গেলে চোঙাটি ফেড়ে নিলেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ধোঁয়াওঠা আঠালো পিঠা। এ পিঠাকে চোঙাপোড়াও বলা হয়। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির বর্ণনায়, ‘করিমগঞ্জ ও লংলা প্রভৃতি স্থানে কচি ডলু বাঁশের চোঙ্গা কাটিয়া তন্মধ্যে বিরণীর চাল ও জল ভরিয়া চোঙ্গার মুখ বন্ধক্রমে পোড়ানো হয়। পোড়ানো হইলে চালগুলি পক্ব হইয়া একরূপে পিষ্টক (পিঠা) প্রস্তুত হয়। সাধারণত পৌষ ও মাঘ মাসে এই পিষ্টক লোকে আগ্রহের সহিত ব্যবহার করে।’ এ ছাড়া চালের খুদ আর কলাপাতায় এক ধরনের বিশেষ পিঠা তৈরি হয়। চালের খুদ পানিতে ভিজিয়ে রেখে টসটসে করে নিতে হয়। তারপর কলাপাতায় মুড়িয়ে আগুনের ভাপে সেদ্ধ করে পিঠা প্রস্তুত করা হয়। খুদের ব্যবহার কমে যাওয়ায় এ পিঠার প্রচলন কমে গেছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পিঠা হিসেবে আলুর পিঠা, আলুর জাম, ধুনি পিঠা, জামাই পিঠাসহ নানানরকম পিঠা প্রসিদ্ধ।
পৌষপার্বণ মূলত পৌষের শেষ দিন পালিত হয়। পৌষসংক্রান্তিতে সূর্য ধনু রাশি থেকে মকরে সঞ্চারিত হয়। তাই এ দিনটি পঞ্জিকায় ‘মকরসংক্রান্তি’ বা ‘উত্তরায়ণ-সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এ দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশে তিল ও খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধান থেকে উৎপন্ন চাল থেকে তৈরি পিঠার অর্ঘ্য প্রদান করে। লোকবিশ্বাস, এদিন তিল না খেলে দিন বাড়ে না অর্থাৎ সূর্যের মকরযাত্রা সংঘটিত হয় না। এ কারণে পৌষসংক্রান্তির অন্য নাম তিলুয়াসংক্রান্তি বা পিঠাসংক্রান্তি। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ফসলি উৎসব হিসেবে পরিচিত। কোথাও তিন থেকে চার দিন চলে এ উৎসব। মহাকাব্য মহাভারতেও এ দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন উৎসবের একটি রূপ অদ্যাবধি পিঠাপার্বণের আকারে বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রচলিত। ভোজনবিলাসী বাঙালির চিরায়ত উৎসব এ পিঠাপার্বণ।
পৌষসংক্রান্তির আগের রাতেই শুরু হয় পিঠা তৈরির তোড়জোড়। দাদি-নানিদের সঙ্গে পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন মা, কাকি, মাসিরা। বাড়ির মেয়েরাও দারুণ সঙ্গ দেয় তাতে। একান্তবর্তী বাড়ির হেঁশেলে আনন্দের হাট শুরু হয়। কেউ বড় কোরানি নিয়ে বারকোশ ভর্তি করে নারকেল কুরতে বসে। তারপর সেই নারকেল, পাটালি দিয়ে জ্বাল দেওয়া এক মস্ত কাজ। কেউ উনুনের সামনে বসে ক্ষীর জ্বাল দিচ্ছে, কেউ নারকেলের পুর ভরে পুলি গড়ছে। কাব্যকথায়Ñ ‘সারি সারি হাঁড়ি হাঁড়ি কাঁড়ি করে তোলে/কেহ বা পিটুলি মাখে কেহ কাঁই গোলে।’
মা-দিদিমার হাতে তৈরি হয় একের পর এক সুস্বাদু, কঠিন সব পদ। স্তরে স্তরে সাজানো হয় বাহারি পিঠা। এ যেন ‘উড়ি চেলে গুঁড়ি কুটি সাজাইল পিঠা’। এভাবে রাত জেগে চলে পিঠা তৈরি ও পিঠা খাওয়া। পাড়াপড়শি ও কুটুমের জন্য তুলে রাখতেও ভুল করেন না গৃহকর্ত্রী। সংক্রান্তির শীতভোরে স্নান সেরে শুরু হয় ভেড়ার ঘর পোড়ানো ও আগুন পোহানোর পালা। তারপর পাড়ার ঘরে ঘরে পিঠার স্বাদ নেওয়া। কে কতরকম পিঠা বানাল, কার পিঠার স্বাদ কেমন হলো তা পরখ না করলে চলে? তাই এদিন ঘরে ঘরে হাজির হয় পাড়াবেড়ানো বুড়ি। ভেদ ভুলে এক হয় শিশু-কিশোরের দল।
প্রাচীনকালে পিঠাকে মিষ্টান্নের মধ্যেই ধরা হতো। ‘পিঠা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ থেকে। আবার ‘পিষ্টক’ এসেছে ‘পিষ্ট’ শব্দ থেকে। পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘পিঠা হলো চালের গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ।’ পিঠা তৈরির সাধারণ উপাদান হচ্ছে চালের গুঁড়া, ময়দা, গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেল। অনেক সময় কিছু কিছু পিঠায় মাংস ও সবজি ব্যবহৃত হয়, যেমন সবজি পুলি, সবজি ভাপা, ঝাল কিংবা মাংস পাটিসাপটা। কোনো কোনো সময় কাঁঠাল, তাল, নারকেল, কলা ইত্যাদি ফল দিয়েও পিঠা বানানো হয়। ওইসব পিঠায় ব্যবহৃত ফলের নামেই এ নামকরণ। পাতায় মুড়িয়ে এক ধরনের বিশেষ পিঠা তৈরি হয়, যাকে পাতাপিঠা বলা হয়। আবার অঞ্চলভেদে পিঠার নামের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। বাংলা ভাষায় লেখা রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং মৈমনসিংহ গীতিকার কাজলরেখা প্রভৃতি কাব্যে পিঠার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিজয়গুপ্ত রচিত মনসামঙ্গলকাব্যে বণিকসুন্দরী যে বিশাল রন্ধনকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন, তার মধ্যেও নানা প্রকারের পিঠার উল্লেখ ছিল। ‘মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস/দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স/দুগ্ধে পিঠা ভালো মতো রান্ধে ততক্ষণ/রন্ধন করিয়া হৈল হরষিত মন।’ মনসামঙ্গলকাব্যে দ্বিজ বংশীদাসের লেখায় সনকার রান্না করা স্বাদু সব পদের মধ্যেও পিঠা বাদ যায়নি। ‘কত যত ব্যঞ্জন যে নাহি লেখা জোখা/পরমান্ন পিষ্টক যে রান্ধিছে সনকা/ঘৃত পোয়া চন্দ্রকাইট আর দুগ্ধপুলি/আইল বড়া ভাজিলেক ঘৃতের মিশালি/। জাতি পুলি ক্ষীর পুলি চিতলোটি আর/মনোহরা রান্ধিলেক অনেক প্রকার।’
কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তার গ্রন্থে খুল্লনা চণ্ডীদেবীর আশীর্বাদ লাভ করে স্বামীর তৃপ্তির উদ্দেশ্যে সর্বমঙ্গলা স্মরণ করে যা যা রেঁধেছিলেন তার মধ্যেও পিঠার উল্লেখ আছে। ‘কলা বড়া মুগ সাউলি ক্ষীরমোন্না ক্ষীরপুলি/নানা পিঠা রান্ধে অবশেষে।’ মৈমনসিংহ গীতিকায় যুক্ত রূপকথা কাজলরেখাতেও চন্দ্রপুলি আর রসালো চই চপরি পোয়া দিয়ে সুবর্ণের থালা সাজানোর উল্লেখ মেলে। যেমন ‘নানা জাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত/চন্দ্রপুলি করে কন্যা চন্দ্রে আকিরত/চই চপরি পোয়া সুরস রসাল/তা দিয়া সাজাইল কন্যা সুবর্ণের থাল/ক্ষীর পুলি করে কন্যা ক্ষীরেতে ভরিয়া/রসাল করিল তায় চিনির ভাজ দিয়া।’
পৌষপার্বণে তৈরি করা হয় এমন উল্লেখযোগ্য আরও পিঠা হলো ভাপা, চিতই, দুধচিতই, কুলি, তেলের পিঠা, মালপোয়া, সমুচা, ফুলপিঠা বা নকশিপিঠা, ঝুরিপিঠা, চুইপিঠা, তালের বড়া, পাটিসাপটা, ছানার মালপোয়া, ম্যারা পিঠা, বিস্কুট পিঠা, সাবুর পিঠা, সুজির পিঠা, চন্দ্রপুলি, নারকেল পিঠা, ক্ষীরসা ভাপা ইত্যাদি। এসব পিঠার নকশাগুলো খুব আকর্ষণীয়। নকশিপিঠা বাঙালি নারীমানসের ফসল। পিঠার গায়ে বিভিন্ন ধরনের নকশা আঁকা হয়। পিঠাকে যখন এমনি নানা নকশায় রূপ দেওয়া হয় তখন তাকে বলে নকশিপিঠা। নারীদের শিল্পনৈপুণ্যের স্মারকরূপেও পৌষপার্বণের এসব পিঠা বিবেচিত হয়। গ্রামীণ মেয়েদের সহজ হাতে ফুটে ওঠে লোককলার এক অনবদ্য ও পরিপাটি রূপ।