জারাদ ত্রিস্তান
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১২:২৪ পিএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:০৭ পিএম
এই সুন্দর ছবিটি এঁকেছে মিথিলা ভৌমিক। সে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী
মার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। চারদিকে অন্ধকার। তখনও ঠিকমতো আলো ফোটেনি। আমি অবাক। কাকভোরে মা ঘুম ভাঙালেন কেন? কিন্তু তখনই মনে পড়ে গেল আজ তো আমাদের ভারতে যাওয়ার দিন। এই প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে পা দেব। এ কথা মনে হতে আনন্দে মন ভরে উঠল। দেরি না করে প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। সকাল সাতটার মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। আমার ব্যাগে টুংটাং শব্দ শুনে আটকাল। কাছে থাকা মাউথ অর্গানটা বের করে দেখালাম। তারপর ছেড়ে দিল।
বিমানে ওঠার জন্য লাইনে দাঁড়াতে বলা হলো। কখন যে প্লেনটির পেটে ঢুকে পড়লাম টেরই পেলাম না। বিমানবালারা সিট খুঁজে দিলেন। ঠিক নয়টায় প্লেন ছাড়ল। আমি বাইরে তাকিয়ে তো অবাক। আমরা যেন মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করেছি। ডানে বাঁয়ে শুধু মেঘ আর মেঘ। কখনও মেঘকে মনে হচ্ছে হাওয়াই মিঠাই বা আইসক্রিম। বিস্মিত হয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। কখন যে নামার সময় হয়ে গেল খেয়াল নেই। এমন সময় জানালেন আমরা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এয়ারপোর্টে অবতরণ করব।
দেখি মেঘ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে এবং আবছা আবছা করে শহর ভেসে উঠছে। তাতে নদ-নদীগুলো রুপালি ফিতার মতো দেখাচ্ছে। বাড়িঘরগুলো যেন সবুজের মধ্যে ফুটে থাকা রঙিন সব ফুল।
আমরা প্লেন থেকে নামলাম ৯টা ৫৫ মিনিটে।
বিমানবন্দরটি বেশ সুন্দর। ঝামেলা হলো না। সহজেই বেরিয়ে গেলাম। এই প্রথম দেশের বাইরের বাতাসে নিঃশ্বাস নিলাম। দেশটা আমাদের দেশের মতো। শুধু গাছপালার পরিমাণটা একটু বেশি। বাবা একটি ট্যাক্সি ঠিক করলেন। আমি চালকের কাছে জানতে চাইলাম, কাকু, বইয়ে পড়েছি ট্যাক্সি হয় হলুদ। কিন্তু এগুলো সাদা কেন? তিনি বললেন, ‘সেগুলো এখন প্রায় উঠে গেছে। ১৫ বছর হলো হলুদ ট্যাক্সি আর চালানোর অনুমোদন পায় না। তাই নেই। তা ছাড়া ট্রাম আর হাতে টানা রিকশাও উঠে গেছে।’
চারদিকে গাছপালা, বাড়িঘর, ভাস্কর্য এবং ছোট ছোট মন্দির দেখতে দেখতে মারকুইস স্ট্রিটে পৌঁছে গেলাম। একটি হোটেলে উঠলাম।
রুমটিও বেশ সুন্দর। একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পার্কে যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতেই দুটি শ্বেতপাথরের সিংহী যেন অভ্যর্থনা জানাতে বসে আছে। দুই পাশে ভিক্টোরিয়া উদ্যান। মাঝ দিয়ে নুড়ি ফেলা পথ। সে পথ ধরে কিছুক্ষণ হাঁটার পরই রাজদণ্ড হাতে সিংহাসনে বসা ভিক্টোরিয়ার একটি ভাস্কর্য। সিংহাসনটি বেশ সুন্দর। সেখানে কিছু ছবি তোলার পর গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে। বেশ কিছু সিঁড়ি ভেঙে প্রবেশ করতে হয় কারুকার্যময় ভবনটিতে। প্রবেশ করেই আমার চোখ ছানাবড়া! কী দুর্দান্ত স্থাপত্যশৈলী! কী সুন্দর কারুকার্য! তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপূর্ব সব শ্বেতপাথরের মূর্তি, বিভিন্ন তেলচিত্র ও আগেরকার যুগের সব অস্ত্রশস্ত্র ও নিদর্শন। মূর্তিগুলোর মধ্যে রাজকুমারী মেরি অর্থাৎ রানী ভিক্টোরিয়া ও লর্ড ক্লাইভের মূর্তি উল্লেখযোগ্য। তেলচিত্রগুলোও বেশ সুন্দর। বেশিরভাগই সেকালের বিখ্যাতদের জীবনচিত্র নিয়ে। কাচঘেরা বক্সে রয়েছে বিভিন্ন অস্ত্র। রানী ভিক্টোরিয়ার ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখলাম। যেমন তার ব্যবহার করা পিয়ানো। এসব দেখে আমরা সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম অনেকেই ওপরে যাচ্ছে। আমরাও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম।
এ গ্যালারির নাম ‘বিপ্লবী ভারত’। সেখানে স্বাধনীতাসংগ্রামীদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। তা ছাড়া ভারতের বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তি সম্পর্কেও জানা যায়। আমার সবচেয়ে ভালো লাগল একটি স্ক্রিন। সামনে দাঁড়ালে একজন স্বাধীনতাসংগ্রামীর চেহারা ভেসে ওঠে। প্রথমে বুঝিনি। পরে বুঝলাম পর্দার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির চেহারার সঙ্গে যে সাদৃশ্য বিপ্লবী রয়েছেন তার চেহারা ভেসে ওঠে স্ক্রিনে।
আমি যে দেখতে বাঘা যতীনের মতো তা জানতাম না, যদি স্কিনের সামনে না দাঁড়াতাম। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে দেখি আকাশের মুখ গোমড়া। যেকোনো সময় কান্না জুড়ে দেবে। তাই আর ভিক্টোরিয়া উদ্যান দেখা হলো না।
আমরা এবার অন্য একটি পথ দিয়ে বের হয়েছি। এখানেও বেশ কিছু শ্বেতপাথরের মূর্তি। খেয়াল করলাম সারি সারি অনেক আবক্ষ মূর্তি। মাকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম তারা রোমান সম্রাট। আকাশ সম্ভবত কান্না বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারবে না তাই দ্রুত হোটেলে চলে এলাম।
হোটেলে একটু ফ্রেশ হয়ে আবার বের হলাম। এবারের লক্ষ্য বিখ্যাত নিউমার্কেট। সেখানে পৌঁছে আমি অবাক। কত রকম দোকান। তার ওপর সময়টা দুর্গাপূজার। তাই দেয়ালে রয়ে গেছে দুর্গাপূজার রেশ। চারদিক আলোয় আলোকিত। বোঝাই যাচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ গল্পতে কেন জটায়ু বলেছিল ‘নিউমার্কেটের মতো বাজার আর ভূ-ভারতে নাই।’
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ‘যাহাই পাইবো তাহাই খাইবো; তার ফল যে ভালো হয়নি তা বলাই বাহুল্য। আমরা সেখানে কলকাতার ‘পানিপুরি’ আমার প্রিয় ‘ওরিও আইসক্রিম’, বিখ্যাত ‘পাপরি চাটনি’ খেলাম। হোটেলে ফিরে মনে হলো আরে! আগামীকাল যে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার জন্য যে ট্রেনের টিকিট কেনা লাগবে, তা কেনা হয়নি। আমার ছোট বোন ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাই তাকে বাবার জিম্মায় রেখে আমি ও মা টিকিট কিনতে গেলাম। কিছুটা খুঁজতেই একটা ট্রাভেল এজেন্সি পেয়ে গেলাম। ট্রাভেল এজেন্সির লোকটি একজন ‘কাবুলিওয়ালা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়লা যেমন টাকার নড়চড় করেছিল তেমনটি যে এই আঙ্কেল করবে তা বুঝতে পারিনি। তবে বুঝতে পেরেছিলাম। সেই গল্প আরেকদিন বলব। আমরা টিকিট কেটে হোটেলে ফিরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ কাল আমাদের ট্রেন সকাল দশটায়। শান্তিনিকেতন যাওয়ার জন্য আমার মন উৎফুল্ল হয়ে রয়েছে।
পঞ্চম শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা