বিদায় ২০২৪
সুবর্ণা মেহ্জাবীন
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:৪০ পিএম
আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:৪৮ পিএম
মডেল: সিগ্ধা ও সিয়াম: পোশাক: তাভাস; ছবি: ফারহান ফয়সাল
ফ্যাশন ট্রেন্ড সব সময়ই দেশের সংস্কৃতি, বাজারের চাহিদা এবং বৈশ্বিক প্রভাব দ্বারা গঠিত হয়। ২০২৪ সালে এসে বিশ্বব্যাপী ফ্যাশনে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, যার মধ্যে দেখা মিলছে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন।

বিশ্বজুড়ে ফ্যাশন ডিজাইনাররা এখন টেকসই উপকরণ এবং পরিবেশবান্ধব নকশার দিকে ঝুঁকছেন। রিসাইকেলড ফেব্রিক, প্রাকৃতিক রঙ এবং বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুধু স্টাইলিশ হওয়াই নয়, বরং পরিবেশ রক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশও এখন ফ্যাশনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে।
এ ট্রেন্ডের প্রভাব
কেবল পশ্চিমা বিশ্বের ডিজাইন হাউসগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতেও
এর ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয় কারুশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিগুলোকে আধুনিক ফ্যাশনে মিশিয়ে
পরিবেশবান্ধব ডিজাইন তৈরি করা হচ্ছে। ২০২৪-এর এ পরিবর্তনশীল ফ্যাশন ট্রেন্ড আমাদের
ভবিষ্যৎ পোশাকশিল্পের দিকনির্দেশনা নিয়ে আশাবাদী করে তোলে।
এ বছর ফ্যাশন হাউসগুলো নিয়ে এসেছে উদ্ভাবনী ডিজাইন। ডিজাইনাররা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ডও বাংলাদেশের ফ্যাশনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পুনর্জাগরণ, আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের প্রভাব এবং দেশি ডিজাইনারদের সৃজনশীলতাÑ সব মিলিয়ে এ বছরটি হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

জেন-জির ফ্যাশন
তরুণদের ফ্যাশনে
এ বছর দৃষ্টিগ্রাহ্য ছিল স্ট্রিট ফ্যাশনের উত্থান। ওভারসাইজড টি-শার্ট, বাগি প্যান্ট
এবং কনভার্স টাইপ জুতা তরুণদের প্রতিদিনের ফ্যাশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল
মিডিয়ার প্রভাব এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের স্টাইলিং তরুণদের ফ্যাশনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তরুণরা এ বছর
নিজেদের স্টাইল নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করেছে। ইউনিসেক্স পোশাকের চল বেড়েছে,
যেখানে জেন্ডারনিরপেক্ষ টি-শার্ট, হুডি এবং টপ বেশ জনপ্রিয় ছিল। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্ম
মিনিমালিজম ধারণা গ্রহণ করেছে। মসৃণ ডিজাইন, বর্ণিল রঙের পোশাক এবং হালকা প্রিন্ট পোশাকের
চল বেশি দেখা গেছে।
পার্টি এবং উৎসবের
ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে ঝলমলে প্যালেট এবং সিকুইন কাজের পোশাকের চাহিদা ছিল তুঙ্গে।
এ ছাড়া আড্ডায় এবং ক্যাজুয়াল পরিবেশে তাঁত ও খাদির তৈরি হালকা ব্লেজার এবং কুর্তার
চাহিদা বেড়েছে।
তরুণীদের মধ্যে এ বছর ক্রপ টপ, ডেনিম জ্যাকেট এবং স্কার্টের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাকের আধুনিক ভার্সন যেমন জামদানির টপ এবং মসলিনের কেপ পরার প্রবণতা লক্ষণীয় ছিল। পুরুষদের ক্ষেত্রে ন্যাচারাল টোনের পাঞ্জাবি, স্ট্রেট-কাট প্যান্ট এবং লোফারের মতো আনুষঙ্গিক উপকরণ ফ্যাশনের নতুন সংযোজন হিসেবে দেখা গেছে।

ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পুনর্জাগরণ
২০২৪ সালে দেশি
ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বিভিন্ন উৎসব এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে
বেনারসি শাড়ি, জামদানি, মসলিন, তাঁত এবং খাদির পোশাক ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।
এ বছর বেনারসি শাড়িতে জ্যামিতিক নকশা এবং মখমলি সুতার কাজ বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল। বিয়ের আয়োজনে ভারী কাজের বেনারসি ছাড়াও হালকা বেনারসি শাড়ি অফিস পার্টি বা ছোট অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়েছে। জামদানির প্যাটার্নে কনট্রাস্ট রঙের ব্যবহার এবং সূক্ষ্ম নকশার আধিক্য লক্ষ করা গেছে। শাড়ির পাশাপাশি জামদানি কাপড় দিয়ে তৈরি সালোয়ার-কামিজ এবং ওড়নার চাহিদাও বেড়েছে। ঐতিহ্যবাহী মসলিন তার অতুলনীয় নরম আর স্বচ্ছতার জন্য আবারও ফ্যাশনে ফিরে এসেছে। ফিউশন ঘরানার পোশাকে মসলিন ব্যবহৃত হয়েছে গাউন, লং টপ ও স্কার্ট তৈরিতে। এ ছাড়া মসলিন কাপড়ে হ্যান্ড পেইন্টের নকশা করা শাড়ি বেশ জনপ্রিয় ছিল। তাঁত কাপড়ে এ বছর দেখা গেছে উদ্ভাবনী ডিজাইন, যা শাড়ি, কুর্তা এবং ড্রেসের মতো বিভিন্ন পোশাকে ব্যবহৃত হয়েছে। ফিউশন পোশাক তৈরিতে তাঁত কাপড়ের আধুনিক কাটিং এবং অ্যাকসেসরাইজড ডিজাইন ফ্যাশনে নতুন মাত্রা এনেছে। খাদি কাপড়ে হাতে আঁকা বা ব্লক প্রিন্টের কাজ এ বছর বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। শীতকালীন জ্যাকেট এবং ওভারকোট তৈরিতেও খাদি কাপড় ব্যবহৃত হয়েছে।

ফিউশন ঘরানার পোশাক
ফিউশন ফ্যাশন
দেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। শাড়ির সঙ্গে বেল্টের
ব্যবহার, কুর্তার সঙ্গে প্লাজো প্যান্ট এবং ঐতিহ্যবাহী শাড়ির প্যালেটে ওয়েস্টার্ন
ব্লাউজের সংযোজন; এ ছাড়া দেখা মিলছে নানা কিছু। ফিউশন শাড়িতে এ বছর আধুনিকতার ছোঁয়া
ছিল লক্ষণীয়। ট্রেন্ডে ছিল ধাতব রঙের বর্ডার, অফ-শোল্ডার ব্লাউজ এবং শাড়ির সঙ্গে লেগিংস
বা প্যান্টের ব্যবহার। এটি তরুণদের পার্টি লুকের জন্য বেশ আর্কষণীয় লুক দেয়। কুর্তার
সঙ্গে ডেনিম জিন্স, স্কার্ট বা পালাজোর সংমিশ্রণ ফিউশন ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী
নানা নকশার কুর্তা আরামদায়ক ফেব্রিকের সঙ্গে মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের পছন্দের শীর্ষে
ছিল এ বছর।
খাদি এবং মসলিন কাপড় দিয়ে তৈরি ফিউশন জাম্পসুট এবং গাউন এ বছর বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এগুলো কেবল আরামদায়ক নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া তাঁত এবং ব্লক প্রিন্টের টপস বা টি-শার্টের সঙ্গে ডেনিম প্যান্ট এবং হ্যান্ডলুম স্কার্ফ তরুণদের দৈনন্দিন পোশাকে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সব বয়সি নারী এসব ফিউশন পোশাক বেছে নিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক
ফ্যাশনের প্রভাব
বাংলাদেশি ফ্যাশন
প্রভাবিত হয়েছে বিশ্ব ফ্যাশনের নানা ট্রেন্ড দ্বারা। বিশেষ করে ওয়েস্টার্ন এবং মিনিমালিস্ট ডিজাইনগুলো দেশি ডিজাইনে জায়গা করে
নিয়েছে। লো-ওয়েস্ট জিন্স, কার্গো প্যান্ট এবং ক্রপ টপের জনপ্রিয়তা তরুণ প্রজন্মের
মধ্যে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের প্রভাব তুলে ধরে।
গ্লোবাল ফ্যাশন ইভেন্ট যেমন প্যারিস এবং মিলান ফ্যাশন উইক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশি ডিজাইনাররা নতুন নতুন ধারার পোশাক এনেছেন। ন্যূনতম ডিজাইন, হাই-ওয়েস্ট স্কার্ট এবং গ্লিটার অ্যাকসেসরিজের সংযোজন এ প্রভাব তুলে ধরেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর মতো দেশের কিছু উদ্যোক্তা থ্রিডি প্রিন্টিং এবং স্মার্ট টেক্সটাইল ব্যবহারও শুরু করেছেন।

দেশি ফ্যাশন হাউসের ভূমিকা
দেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো
সব সময়ই চেষ্টা করে নতুনত্ব এবং বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে। এ বছর নতুন নতুন ডিজাইন এবং ধারণা
নিয়ে এসেছে বেশিরভাগ ব্র্যান্ড, যা ফ্যাশনপ্রেমীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তিসহ ছেলেদের পাঞ্জাবি, শার্ট সবকিছুতেই মিনিমালিজমের ছাপ
স্পষ্ট। রঙের ক্ষেত্রেও চোখে আরাম দেয় এমন প্যালেট বেছে নিয়েছেন ফ্যাশন ডিজাইনাররা।
এ ছাড়া ফেব্রিক হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে সব ঋতুতে পরার উপযোগী আরামদায়ক কাপড়। বিভিন্ন
উৎসব কেন্দ্র করে মোটিফভিত্তিক নকশার ব্যবহারও ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন সব বয়সি মানুষ
এমন মোটিভনির্ভর পোশাক বেছে নিচ্ছেন উৎসব-পার্বণে। কিছু মোটিফ আবার সারা বছরই পরতে
দেখা গেছে ফ্যাশন সচেতনদের। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব ফেব্রিক দিয়ে পোশাকে নতুনত্ব এনেছে
অনেক ফ্যাশন হাউস। ব্লকপ্রিন্টের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ এবং টপসের আবেদন এ বছরও ছিল।
সঙ্গে এমব্রয়ডারি এবং হাতে করা নানা কারুকাজও চোখে পড়ার মতো। ঐতিহ্যবাহী এসব কাজের
সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনের দেখা মিলেছে পোশাকে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে ব্র্যান্ডগুলো তাদের বৈচিত্র্যময় নানা পোশাক নিয়ে হাজির হয়েছে, যেখানে সমন্বয় ঘটানো হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডের। এখন সারা বছরই উৎসব কেন্দ্র করে তিন-চার দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অংশ নেন তাদের বৈচিত্র্যময় কালেকশন নিয়ে; যা দেশি ফ্যাশনের অগ্রগতির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি আরও নতুন এবং সৃজনশীল ধারায় এগিয়ে যাবেÑ এটাই প্রত্যাশা।



