× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাধনা ঔষধালয়ের ১১০ বছর

ম্রিয়মাণ তবে হারিয়ে যায়নি

কামরুল হাসান মিথুন

প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৫৮ পিএম

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:২৬ পিএম

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা। (ইনসেটে) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ	  ছবি : লেখক

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা। (ইনসেটে) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ ছবি : লেখক

গ্র্যান্ড এরিয়ার অপভ্রংশ থেকেই কি গেন্ডারিয়া নাকি আখ ক্ষেত থেকে সে তর্ক আপাতত থাক। চোখের দেখায় এর কোনওটাই এখান আর চোখে পড়ে না। নেই গ্রান্ড বলার মতো আভিজাত্য বা ইক্ষুর ক্ষেত। তবু এ এলাকার বাতাসে ছড়িয়ে আছে মিষ্টি একটা সুবাস। সে ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে আসে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার ৭১ দীননাথ সেন রোডর সাধনা ঔষধালয় কারখানা থেকে।

লোকমুখে পরিচিত সাধনার গলি হিসেবে। ‘চেনা বামনের পৈতা লাগে না।’ এ প্রতিষ্ঠানটির বেলায় তো আরও লাগে না। কেননা কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটির। এর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আয়ুর্বেদ জগতের পথিকৃৎ ডা. যোগেশ চন্দ্র ঘোষ।

সাধনার গলির শেষ মাথায় দীননাথ সেনের বাড়ি। দীননাথ সেনের সেই বাড়ি যদিও এখন আর নেই, কিন্তু সে সময়ের পরিবেশের আঁচ পাওয়া যায় প্রাচীনগন্ধি সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা অফিসের প্রধান ফটকের সামনেই। চোখে পড়ল বনের বানর ভিড় করে আছে সাধনার গেটের মুখে। পুরো ঢাকা শহর বা শহরের আশপাশে কোথাও এত বানর নেই। সত্যি আর কোথাও এমন নির্ভর স্থান নেই বানরের জন্য। যেখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করা যায়। এ বানরদলের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি কামরা এবং সময়মতো খাবারের ব্যবস্থা। সাধনা ঔষধালয়ের আয়ের নির্দিষ্ট একটা অর্থ ব্যয় হয় বনের এ পশুদের জন্য। ডা. যোগেশ চন্দ্র ঘোষ যেমন ছিলেন স্বদেশি, তাই দেশের মানুষের জন্য গড়ে তুলেছেন ঔষধালয়। সাধনা ঔষধালয়ের কর্ণধার ও জগন্নাথ কলেজের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক এবং আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মেধাবী ছাত্র যোগেশ চন্দ্র ঘোষ ১৯১৪ সালে ঢাকায় একটি আয়ুর্বেদীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে প্রাচীন শাস্ত্রের নির্দেশনা মোতাবেক আয়ুর্বেদীয় ঔষধপত্র তৈরির কাজ শুরু করেন। সেই কর্মপ্রচেষ্টার বীজ থেকে আজ এক প্রাচীন মহিরুহ।

গেন্ডারিয়া বাদে পশ্চিমবঙ্গের শহর কলকাতার দমদমের বিধান সরণিতে সাধনার আরেকটি বড় ফ্যাক্টরি রয়েছে। গেন্ডারিয়ার এ কারখানা থেকেই সাধনার ঔষধ ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে। চীন, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, পাকিস্তানসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় সাধনা ঔষধালয়ের শাখা ও এজেন্সি খোলা হয়।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন চিত্র

পুরাতন পত্রিকার পাতা ঘাঁটলে পাওয়া যায় জগৎখ্যাত সাধনার বিজ্ঞাপন। শুরুর কিছুদিন পর সারা দেশে সাধনার প্রায় ১০৭টি শাখা এজেন্সি খোলা হয়। বর্তমানে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে ৬৯টি শাখা রয়েছে। ভারতে রয়েছে এদের ১৩০টির মতো দোকান। ক্রমে কমে আসছে সাধনার ব্যবসা। তবে, জরাগ্রস্ত হয়েও টিকে রয়েছে ‘সাধনা’। 

সাধনা ঔষধালয় প্রথম বিক্রয় কেন্দ্র বা প্রথম শাখা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের পাশে রয়েছে। এ শাখায় বসতেন যোগেশ চন্দ্র ঘোষ। তিনি ১৯১৩ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এর আগে বিহারের ভাগলপুর কলেজে ১৯০৮-১৯১২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। আয়ুর্বেদ চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে রোগ নিরাময়ের পথপ্রদর্শনে সমগ্র ভারতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও মেধার মূল্যায়নস্বরূপ তাকে লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটির আজীবন ফেলো নির্বাচিত করা হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেমিক্যাল সোসাইটির সদস্য হওয়ার গৌরবও অর্জন করেন এ কৃতীপুরুষ।

পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলি শাখা

বর্তমানে পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলি শাখায় বসেন কবিরাজ প্রণব কান্তি সেন। একসময় ঢাকার সব জনপ্রিয় আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শাখাগুলো ছিল এ লয়্যাল স্ট্রিটে। সাধনা বাদেও শক্তি, এপি, নীহারিকা এবং কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রধান শাখার অবস্থান ছিল এ পটুয়াটুলীর গলিতে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন আমাদের দোরগোড়ায় আসেনি তখন ভরসা ছিল প্রাচীন আয়ুর্বেদ এবং ঘরের কাছের কবিরাজ। যারা কাজ করেছেন চিকিৎসাশাস্ত্রে পৃথিবীর শুরু থেকেই। আজও সব রোগের শেফা খুঁজতে হয় প্রকৃতিতেই। কেননা প্রকৃতিতেই মানুষের মুক্তি। এখান থেকেই রসদ জোগাড় হয় অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করার জন্য। শুরুতে প্রায় ১ হাজার ২০০-এর মতো ওষুধ তৈরি হতো সাধনা ঔষধালয়ে। সেসব ঔষধের ফর্মুলা যোগেশ চন্দ্র ঘোষের নিজস্ব। তার ফর্মুলায় বিগত ১১০ বছর ধরে ওষুধ তৈরি হচ্ছে এবং মানুষ সেবা নিচ্ছে, সুস্থ হচ্ছে।

বিশাল এক কর্মযজ্ঞের কান্ডারি ডা. যোগেশ চন্দ্র ঘোষ কেমন করে এ সাধানা ঔষধালয় পরিচালনা করতেন তার সে সময়ের স্মৃতিচিত্র পাওয়া যায় মীজানুর রহমানের ‘ঢাকা পুরাণ’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘চল্লিশ পাওয়ারের আলো-আঁধারের ছলনায় মনে হল যেন-বা বৃত্তাবদ্ধ যিশু। গায়ের নিমেটা অবিকল শ্লামিস। আস্তে আস্তে বিজ্ঞাপনের সুপরিচিত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন যোগেশ বাবু। কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারিনে ভাগলপুর কলেজের ভূতপূর্ব অধ্যাপকের সঙ্গে। ওঁর সবটাই আটপৌরে। এ না হলে জলে জল বাধে!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘সারা ভারত ও বিশ্বজুড়ে যাঁর প্রতিষ্ঠানের শাখা-প্রশাখা, নাম-যশ- খ্যাতি, সেকালের নিরিখে যিনি কোটিপতি, ঢলকো মলিন হেঁটো ধুতি ও নিমে গায়ে পা দোলাতে দোলাতে ৪০ পাওয়ারের আলোয় বিনে চশমায় কুল্লে ১০-১২ জন প্রশাসনিক কর্মী বাহিনী নিয়ে রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন-এ ভাবতেও অবাক হতে হয়।’

গেন্ডারিয়ার সাধনা ঔষধালয়ের ভবন

১৮৮৭ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার গোসাইরহাটের জলছত্র গ্রামে জন্ম যোগেশ চন্দ্র ঘোষের। তার বাবার নাম পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। যোগেশ চন্দ্র ঢাকার জুবিলি স্কুল থেকে ১৯০২ সালে এন্ট্রান্স পাস করে জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯০৪-এ এফএ এবং ১৯০৬-এ বিএ পাস করেন। ১৯০৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে রসায়নশাস্ত্রে এমএ পাস করেন। এরপর লন্ডন থেকে এফসিএস এবং আমেরিকা থেকে এমসিএস ডিগ্রি লাভ করেন। অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন এ মানুষটি। অথচ তার মৃত্যু হয় মর্মান্তিকভাবে। ১৯৭১-এর ৪ এপ্রিল পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে যোগেশ চন্দ্র ঘোষের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল।

যোগেশ চন্দ্র লুটিয়ে পড়েননি। তার গড়া প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে আছে ১১০ বছর ধরে। তিনি আছেন চিকিৎসাশাস্ত্রে মানবতার পথপ্রদর্শক হিসেবে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. যোগেশ চন্দ্র ঘোষের মৃত্যুর অনেক আগেই মারা যান তার স্ত্রী কিরণবালা ঘোষ। যোগেশ চন্দ্র ঘোষ ছিলেন এক ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা। ছেলের নাম নরেশচন্দ্র ঘোষ। দুই মেয়ে অমিয়বালা ও রানীবালা। বাবার মৃত্যুর পর নরেশচন্দ্র ঘোষ দমদম থেকে ফিরে গেন্ডারিয়ার এ ফ্যাক্টরির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নরেশচন্দ্র ঘোষের দুই ছেলে প্রদীপচন্দ্র ঘোষ ও প্রবীরচন্দ্র ঘোষ। নরেশচন্দ্র ঘোষের মৃত্যুর পর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন তার মেয়ে শীলারাণী ঘোষ।

আয়ুর্বেদ ওষুধের ব্যবহার পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে যোগেশচন্দ্র ঘোষের রয়েছে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি-আরোগ্যের পথ, গৃহ-চিকিৎসা, চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি, চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা ও মুখরোগ চিকিৎসা, আমরা কোন পথে? অগ্নিমান্দ্য ও কোষ্ঠবদ্ধতা, আয়ুর্বেদ ইতিহাস, উইদার বাউন্ড আর উই এবং হোম ট্রিটমেন্ট। এসব গ্রন্থ পাঠ এবং কঠোর সাধনা থেকে আগামী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে পারবে রোগমুক্তির ওষুধ। পৃথিবীর মুক্তি প্রকৃতিতে। সেই মুক্তির সূত্র রয়েছে ডা. যোগেশ চন্দ্র ঘোষের গ্রন্থের পাতার ভেতরে। আর যোগেশ চন্দ্র ঘোষের জীবন থেকে পাঠ করতে পারি সেবাই আমাদের ধর্ম।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন চিত্র

চিকিৎসাসেবার এ অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠানটির পাটুয়াটুলি শাখার কবিরাজ প্রণব কান্তি সেন। তিনি ৪০ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি জানালেন, বর্তমানে ১০০টির মতো ফর্মুলার ওষুধ প্রস্তুত হয়। তবে সব ওষুধ তার কাছে নেই। চাহিদাও কম। এদেশে আয়ুর্বেদিক ওষুধের অধুনিকায়ন করার মতো উদ্ভাবনী লোকেরও অভার রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাই শুধু সাধানা ঔষধালয়ই নয়, উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী এবং পরীক্ষিত পুরো আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থাটাই আজ ম্রিয়মাণ। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা