নুজহাত জান্নাত ইরা
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:২৪ পিএম
এই সুন্দর ছবিটি এঁকেছে মিথিলা ভৌমিক। সে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী
প্রজ্ঞা ছোট্ট এক শহরে থাকত। ওর মা-বাবা দুজনই চাকরিজীবী। বাবা-মা তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে চলে যেত কাজে। স্কুলেও ওর তেমন কোন ভালো বন্ধু ছিল না। ক্লাসে কারও সঙ্গে তেমন একটা মিশতও না। দুপুরে প্রজ্ঞাকে স্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে দাদু। বাড়ি ফিরে তাকে আবার একাকীই থাকতে হতো। একা আনমনে নিজের সঙ্গেই কথা বলত আর বুকশেলফ থেকে বই নিয়ে বই পড়ত।
সেবার জন্মদিনে ফুপা-ফুপি এক জোড়া ঘুঘু উপহার দেন। ঘুঘু পেয়ে খুব খুশি হয় প্রজ্ঞা। অবসরে সে ঘুঘুদের যত্ন নিত। ঘুঘু দুটিও ওকে চিনত। পাখি দুটি চুপ করে তার কথা শুনত। আদর করে ঘুঘু দুটির নাম দিল শিলু আর মিলু। এভাবে বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। হঠাৎ একদিন প্রজ্ঞা খেয়াল করল শিলু আর মিলুর কী যেন হয়েছে। খাবার দিলেও তারা খাচ্ছে না। প্রজ্ঞা বুঝতে পারল, শিলু আর মিলু খাঁচায় আর থাকতে চাচ্ছে না। শিলু আর মিলুকে তাই সে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মায়ায় পড়ে তাদের ছাড়তে প্রজ্ঞার খুব কষ্ট হচ্ছিল। ঘুঘু দুটিই ছিল ওর একমাত্র বন্ধু। কিন্তু কী আর উপায়? ছেড়ে তো দিতেই হবে। না হলে যে শিলু আর মিলু কষ্ট পাবে। আর যদি ঘুঘুরা কষ্ট পায় তার থেকে দ্বিগুণ কষ্ট পাবে প্রজ্ঞা। তাই সে ঠিক করল খোলা আকাশে ঘুঘু অবমুক্ত করবে।
এক সকালে শিলু ও মিলুকে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেয় প্রজ্ঞা। কিন্তু একি! শিলু উড়ে গেলেও কী যেন টানে উড়ে গেল না মিলু। উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও কিছুতেই ওড়ানো গেল না মিলুকে। মিলু যেন প্রজ্ঞাকে ছেড়ে যেতে চায় না। কোনো উপায় না পেয়ে প্রজ্ঞা মিলুকে নিজের কাছেই রাখল। তবে খাঁচায় আর বন্দি করল না। মিলু আর প্রজ্ঞার মধ্যে বাড়তে থাকল বন্ধুত্ব। দিনদিন তা আরও গাঢ় হতে লাগল।
একদিন প্রজ্ঞা স্কুলে গেছে। ফিরে এসে দেখে আঙিনায় মিলুর কিছু পালক পড়ে আছে। প্রজ্ঞার ভীষণ ভয় হলো। সে আতিপাতি করে পুরো বাড়ি মিলুকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও পেল না। সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। মিলুকে কোথাও পাওয়া গেল না।
প্রজ্ঞা দিনদিন মিলুর চিন্তায় ছটফট করতে থাকে। কেমন যেন একটা একাকিত্ব পেয়ে বসে তাকে। মিলু কোথায় আছে? কী করছে? যে ওকে নিয়ে গেল সে কি ওকে তার মতো যত্ন করছে? ঠিকমতো খাওয়াচ্ছে? নাকি তাকে অন্য কোথাও বিক্রি করে দিল! অথবা কেউ কি ওকে ফাঁদে আটকে ফেলল? ফাঁদে পড়লে তো পায়ে আঘাত পাবে মিলু। এ রকম আরও কত যে দুশ্চিন্তা মাথায় ভর করতে থাকে তার। অমনি ছোট্ট মনটা ব্যথায় ভরে যায়। সে প্রত্যাশা করে মুক্ত মিলুর। কল্পনায় দেখতে পায় মিলুর পায়ে বাঁধা সুতো ছুটিয়ে মুক্ত আকাশে উড়ছে। মিলু যেন ঠিক পাখিঘুড়ি হয়ে আকাশে উড়ছে।
একদিন প্রজ্ঞা মিলুকে ভেবে মিলুর ছবি আঁকছিল। সে সময় হঠাৎ সে বারান্দায় ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পায়। হুড়মুড় করে বাইরে গিয়ে দেখে এ যে তার মিলু। কিন্তু একি! কী হয়েছে ওর? পা থেকে রক্ত ঝরছে। মিলুর মুখটা মলিন। লেজে নেই কোনো পালক। প্রজ্ঞা বুঝতে পারে মিলুকে ধরতে কেউ জোরাজুরি করেছে। আর তাতেই পড়ে গেছে তার পালক। পেয়েছে আঘাত। আহা মিলু! এত কষ্ট পেয়েও ভুলে যায়নি প্রজ্ঞাকে। শেষবারের মতো সুযোগ পেয়ে সে প্রজ্ঞার কাছেই আসতে চেয়েছে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রজ্ঞা। ঝুম বৃষ্টির সেদিনে যেন প্রকৃতিও কাঁদছিল মিলুর জন্য। প্রকৃতিও যেন জানান দিচ্ছিল মিলুর প্রতি ভালোবাসার। মিলুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার চিৎকারে ছুটে এলেন প্রজ্ঞার বাব-মা। তাঁরা প্রজ্ঞাকে সান্ত্বনা দিয়ে মিলুকে নিয়ে গেলেন পশু চিকিৎসকের কাছে। তারপর ধীরে ধীরে মিলু একটা সময় পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। উন্মুক্ত হয়েও বিচরণ করতে লাগল সারা বাড়িতে।
নবম শ্রেণি, সোনাতলা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাতলা, বগুড়া