বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে-শেষ পর্ব
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৪৭ পিএম
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের পেনিনসুলা
প্রিয় জায়গা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সত্যিই মন খারাপ হয়ে যায়। বিদায়ের বেদনা মানুষের অন্তরের গভীরে জন্ম নেওয়া একটি অনিবার্য অনুভূতি। ৬ ডিসেম্বর আমরা অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশে যাত্রা করে দেখতে দেখতে কখন যে ২৪ ডিসেম্বর এসে উপস্থিত হয়েছে বুঝতেই পারিনি। আজ জাহাজে থাকা অনেকের মনের ভেতর এক ধরনের তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছে।
অ্যান্টার্কটিকার এক মনোরম পেনিনসুলা
২৫ ডিসেম্বর বিদায় নিতে হবে ভেবে এ অনুভূতি আরও বেশি প্রকট হয়েছে। ২০ দিনের এ অভিযানে এখন মনে হচ্ছে সময় যেন একটু দ্রুতই চলে গেছে। মন বলছে আরও কয়েকদিন থাকতে পারলে কত ভালো হতো! এমন একটা অনুভূতি মনে জাগে। সেই সুন্দর পরিবেশ। নতুন নতুন দেশের মানুষ। নতুন অভিজ্ঞতা। সব মিলে মনে হয় যেন একটি স্বপ্নের ভেতর ছিলাম। আর সেই স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার সময় যে বেদনা হয় তা তো অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না! তেমনি মনে হয়েছে এবার।
অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ৮০ বছর বয়সি অভিযাত্রী ইনাম আল হক ও আবদুল জলিল
যদিও এরপর এ অ্যান্টার্কটিকা আসা হবে কি না তা আমরা কেউই জানি না, তবু বলি, এ সুন্দর স্থানে আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে অনন্য কিছু টুকরা স্মৃতি থাকবে বহুদিন। আর হ্যাঁ, আগামীতে কেউ অ্যান্টার্কটিকা যেতে চাইলে কোনো অভিযাত্রীর সঙ্গে কথা বলে এজেন্সি ঠিক না করলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ অসংখ্য ভুয়া কোম্পানি অ্যান্টার্কটিকা না নিয়ে সামান্য কিছু পথ ঘুরিয়ে ৫ হাজার ডলার হাতিয়ে নেবে। পরে এতটা পথ এসে আফসোস করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
ভ্রমণে আমাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ১১ বছর বয়সি জারিতা
অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণে আমাদের এ ২০ দিন ছিল অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের দিন। প্ল্যানসিয়াস জাহাজে আমাদের এ অভিযানে যাত্রীসংখ্যা ছিল ১০৮। এর মধ্যে এককভাবে বাংলাদেশের ২৭ জন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তিনজন, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, স্পেন, তাইওয়ান, চীন, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে ৭৮ জন ছিলেন। সবচেয়ে বয়স্ক যাত্রী বাংলাদেশের ইনাম আল হক (৮০) ও আবদুল জলিল (৮০) এবং কম বয়সিও বাংলাদেশেরই জারিতা (১১)। জাহাজে একজন ক্যাপ্টেন স্টাফ, ক্রু , ডাক্তার, গাইড মিলিয়ে ছিলেন আরও ৪৯ জন।
জাহাজের খাবার
জাহাজে আমরা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ হয়ে সাউথ জর্জিয়া পৌঁছে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব কিছু বিষয় উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ থেকে ২৭ জনসহ আমাদের সবার মধ্যে একটা উপলব্ধি এসেছে, পৃথিবী এখন বিপন্ন! এ অঞ্চল তো বটেই, পৃথিবীতে জীবের অস্তিত্ব রক্ষায় ধরিত্রীর সর্বত্র খুব জোরালোভাবে এর যত্ন নিতে হবে। তা না হলে পৃথিবী বাঁচবে না। আর পৃথিবী না বাঁচলে প্রাণের কোনো অবশিষ্ট থাকবে না।
সবশেষে সাউথ জর্জিয়া হয়ে অ্যান্টার্কটিকা পৌঁছে জেনেছি বিগত ৫০ বছরে এ মহাদেশের তাপমাত্রা পৃথিবীর অন্য যেকোনো মহাদেশের তাপমাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ৪০ বছরে ১০ গুণ সবুজ হয়ে উঠেছে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ। ১৯৮৬ সালে সেখানে মোট উদ্ভিদ ছিল ১ বর্গ কিলোমিটারের কম, সেটা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ বর্গ কিলোমিটারে। এগুলো খুব উদ্বেগজনক খবর। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশকে যদি আমরা রক্ষা করতে চাই তাহলে এসব পরিবর্তনের বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

জাহাজের প্রধান কুক কবীর। তিনি ভারতের গোয়ার নাগরিক
অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী ও নির্জন মহাদেশ হলেও এ মহাদেশের বরফ গলার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি, জলবায়ু ব্যাঘাত এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বাসস্থান হারানোর মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। দিনে দিনে তা প্রকট আকার ধারণ করছে।
আমরা উপলব্ধি করতে পারছি সবাই মিলে অ্যান্টার্কটিকা ও পৃথিবীর প্রাণিকুল রক্ষার জন্য নিচের কাজগুলো করা জরুরি : প্রথমত. জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই। দ্বিতীয়ত. জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে বায়ুদূষণ কমানো। তৃতীয়ত. নতুন ও পরিষ্কার শক্তির উৎস ব্যবহার বাড়ানো। চতুর্থত. বন ধ্বংস রোধ এবং বৃক্ষ রোপণ করা। পঞ্চমত. প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ রোধ এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বস্তু ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। ষষ্ঠত. সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলা চিরতরে বন্ধ করা। সপ্তমত. জৈববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোর যত্ন নেওয়া।অষ্টমত. সুরক্ষিত এলাকার আয়তন বাড়ানো। নবমত. আন্তর্জাতিক অ্যান্টার্কটিকা চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক চুক্তিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা এবং তা যথাযথভাবে মনিটরিং করা। দশমত. অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে একসঙ্গে পরিবেশ রক্ষার কাজে অংশগ্রহণ করা, পরিবেশ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করার জন্য অন্যদের অনুপ্রাণিত করা।
অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগজনকভাবে গলছে বরফের পাহাড়
শেষ কথা
অ্যান্টার্কটিকায় অনেক বিশেষ প্রজাতির প্রাণী বাস করে। এ প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। এটা অব্যাহত থাকলে পুরো পৃথিবীর জৈববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। আমাদের সবারই দায়িত্ব অ্যান্টার্কটিকা ও পৃথিবীর প্রাণিকুলকে রক্ষা করা। ছোট ছোট পদক্ষেপ নিয়ে আমরা এ গুরুত্বপূর্ণ কাজে অবদান রাখতে পারি।
লেখক : জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর