ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৫১ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৫২ এএম
গ্রাফিক্স : প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১০ শতক জায়গা বিক্রি করে যৌতুক দিয়ে মেয়েকে পাত্রস্থ করেন লালমনিরহাটের বাসিন্দা রোকেয়ার বাবা। কিন্তু সংসারটা টিকল না। বড় ছেলের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন রোকেয়ার স্বামী তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। বাকি আরও ছোট দুই মেয়েসহ তিন সন্তানের ভরণপোষণের ভার এস পড়ে রোকেয়ার কাঁধে। জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া বাবার কাছে আর ফিরে যেতে পারেননি। তারপর শুরু করেন বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ। স্বামীর নামে মামলা করলে দুই মেয়ের ভালো জায়গায় বিয়ে হবে না মনে করে মামলা করতে চাননি।
রোকেয়া বলেন, ‘বারবার মামলা করার কথা ভাবলেও দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে করিনি। পাড়াপড়শি বলছিল মামলা করলে মেয়েদের বিয়ে দিতে সমস্যা হবে তাই মামলা করি নাই। মনে হলো মামলায় অনেক ঝামেলাও আছে কেমনে কী করমু। বিয়ের সময় আমার বাপ ১০ শতক জায়গা বিক্রি করে যৌতুক দিছিল। পরে তো আর বাপের কাছেও হাত পাততে পারি না। পরে বাসাবাড়িতে কাজ করে ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছি। এখন ঢাকায় একা একা থাকি। ছেলেমেয়েরা বাড়িতে থাকে একা। এমনকি কাবিননামার টাকাও আমারে দেয় নাই।’
নানা অজুহাতে মামলা করে নিজের অধিকার আদায়ের পথ থেকে সরে যান নির্যাতিতরা। লোকে কী বলবে এই ভেবে বেশিরভাগ নারীই মামলা করতে নিরুৎসাহ হন। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর প্রায়ই স্বামীর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে আত্মীয়স্বজন মামলা করতে চাইলেও রাজি নন তাসমিমা (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘থানা-মামলা এসব করে কী হবে? আমার ছোট একটা বাচ্চা আছে তাকে দেখতে হয়। এসবের মধ্যে না গিয়ে পারিবারিকভাবে মিটমাট করে নিলেই হয়। এ ছাড়া আমার দ্বিতীয় বিয়েতেও সংসার ভাঙলে লোকে বলবে আমারই দোষ।’
দেশে নারী নির্যাতনের চিত্রটা ভয়াবহ হচ্ছে প্রতিদিনই। নাতনিকে বিয়ে দেওয়ার ১৯ দিনের মাথায় দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর লাশ পান দাদা নুর ইসলাম। নাতনি জোছনা আকতারের হাতে তখনও ছিল মেহেদির রঙ, লেখা ছিল ‘আই লাভ ইউ’। স্বামীকে উদ্দেশ করেই এ কথা লিখেছিলন তিনি। কিন্তু কথা কাটাকাটির জেরে স্বামীর হাতেই প্রাণ দিতে হয় ১৯ বছরের জোছনাকে।
শুধু জোছনাই নন, গত মাসে সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আসার ১৫ দিন পর কথা কাটাকাটির জেরে স্বামী শরিফুল ইসলাম ঘরে থাকা চাকু দিয়ে সানোয়ারা বেগমের গলায়, পেটে ও বুকের একাধিক স্থানে ছুরিকাঘাত করেন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় স্ত্রীর।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ১০ বছরে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ২ হাজার ১৪৯ নারী। শ্বশুরবাড়ির লোকদের মাধ্যমে খুন হয়েছেন ৫৬৯ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৩৯টি; যা ঘটনার প্রায় অর্ধেক।
শুধুমাত্র স্বামীর হাতে খুন নন, ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতনের চিত্রটাও ভয়াবহ। তবে মামলা করার পথটা তত সহজ নয়। একদিকে রয়েছে সামাজিক বাধা, অন্যদিকে আইনি জটিলতা। কেউ কেউ মামলা করলেও বিচার পান না। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অনেকেই পিছিয়ে পড়েন। আবার যারা করছেন তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কখনও প্রভাবশালী হওয়ার কারণে জামিনও পেয়ে যাচ্ছেন নির্যাতনকারীরা।
স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন রয়া তাসনিম। ভেবেছিলেন বেঁচে ফিরবেন না। তিনি জানান, মাথা ও মুখে এখনও আঘাতের দাগ আছে। মুখের বাঁ পাশে কপাল থেকে ঠোঁটের নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে। গলা চেপে ধরে। এক মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হয়ে মামলা করেন। পরে তাদের তালাক হয়ে যায়। গত ২২ মে উত্তরা পশ্চিম থানায় রনিসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। তিনি বলেন, ‘মামলা করলেও জামিন পেয়ে গেছে। আমি এখনও বিচারের আশায় আছি। মামলা করার পরপর হুমকি দিত। এখন সেটা কমেছে। সন্তানের খবরও সে রাখে না। ভরণপোষণের কোনো টাকাও দেয় না। কতদিন এভাবে চলবে জানি না।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে ২ হাজার ৯৪৮ নারী। যাদের মধ্যে ২২২ জন কন্যাশিশু। নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মধ্যে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৩৩৪টি। মাত্র ৪৫ শতাংশ, বাকিরা মামলা করেনি।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ২৩ বছরে সেখান থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় ৬২ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। যেখানে মামলা হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৪৪১টি। ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে রায় হয়েছে এবং সাজা কার্যকর হয়েছে ১ শতাংশের কম।
বিচারহীনতাই সহিংসতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন উই ক্যানের নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক। তিনি বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার নারীর মাত্র ৩ শতাংশ বিচারের জন্য আসে। সেখানেও আবার বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াটা সহজ নয়। এত প্রক্রিয়া পার হয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার চায় না আর মামলা এগিয়ে নিতে। আবার এগিয়ে নিলেও প্রভাবশালীদের কাছে হার মানতে হয়। অনেক মামলাই সফলতার মুখ দেখে না। যে পরিবার বা যারা নির্যাতনের শিকার হয় তারাও নানানরকম সমস্যায় পড়ে। মামলা হলে নিরাপত্তাহীনতা তো আছেই, সামাজিকভাবেও তাদের হেয় করা হয়।’
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, নানামুখী নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে নারীরা অনেক সময় বুঝতে পারে না নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হলেও মাত্র ১৬ শতাংশ মামলা করে। নারীরা নির্যাতনের ঘটনায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম (চতুর্থ পর্যায়)’। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের আওতায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম, হেলপলাইন, ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬৯টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেলসহ (ওসিসি সেল) ১০টি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৪টি ওসিসিতে ৬২ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় ৬১ শতাংশ। মামলার হার মাত্র ৩১ শতাংশ।
৬৮ শতাংশ আসামি গ্রেপ্তার হয় না পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশের থানা ও আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর যৌতুক, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ ও অপহরণ ধারায় মোট ১২ হাজার ৭৬৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু নারী নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৬টি। বাকিগুলো শিশু নির্যাতনের অভিযোগে। নারী নির্যাতনের মামলায় মোট আসামি ২৪ হাজার ৩৩৯ জনকে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৮৩৫ জন। ওই নয় মাসে প্রায় ৬৮ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।