ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৫ এএম
প্রমিতা দেব
গৃহশিক্ষক রাখা, প্রাইভেট পড়া বা কোচিং করা দূরের কথা, শিক্ষাজীবনে নতুন সহায়ক বই কিনে পড়ালেখা করতে পারেননি। এক বেলা খাবার জুটলেও আরেক বেলা জোটানো ছিল কষ্টকর। অনেক বছর দুর্গাপূজায় নতুন জামা কেনা হয়নি নিম্নবিত্ত পরিবারটির সদস্যদের। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারটির আয়ের একমাত্র উৎস সবজির চারা বিক্রি। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩ নম্বর কামালপুর ইউনিয়নের প্রান্তিক কৃষকের গ্রাম আবদালপুরের বাসিন্দা মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী প্রমিতা দেবের (১৯) দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল পুলিশ বিভাগে কনস্টেবল পদে চাকরি করে পরিবারের দুর্দশা লাঘবের।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লিখিত, শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। পরে মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করেও অজ্ঞাত কারণে বাদ পড়েন। অদম্য ও কঠোর পরিশ্রমী প্রমিতা দেব আবারও চাকরির প্রস্তুতি নেন। চলতি বছরে মৌলভীবাজার জেলা থেকে প্রমিতা দেবসহ অনলাইনে ১ হাজার ৫০২ জন আবেদন করেন। ৪ নভেম্বর প্রাথমিক বাছাই, ৫ নভেম্বর প্যাজিক্যাল ইনডোর্স টেস্ট, ২৭ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষা ও ৪ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন প্রমিতা। ওইদিন রাতে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি জেলা পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাঙ্গীর হোসেন কনস্টেবল পদের চাকরির জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৫৬ জনের নাম ঘোষণা করেন। এর মধ্যে মেধা তালিকায় ২১ নম্বরে স্থান লাভ করেন প্রমিতা।
এদিকে প্রমিতা পুলিশে চাকরির জন্য নির্বাচিত হওয়ায় শুধু তার পরিবার নয়, পুরো আবদালপুর গ্রামে বইছে আনন্দের বন্যা। প্রমিতাকে শুভেচ্ছা জানাতে তার ছোট কুটিরে লেগেই আছে গ্রামবাসীর ভিড়।
প্রমিতা দেবের পারিবারিক সূত্র জানান, বাবা লাল্টু দেব ও চার বোন নিয়ে তাদের সংসার। মা দীপালি রানী দেব অসুস্থ থাকায় ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিবারের রান্নাবান্নাসহ সব কাজ নিজের হাতে তুলে নেন প্রমিতা। অর্থনৈতিক টানাপড়েনে অনেকদিন ওই পরিবারের উপবাসে কেটেছে। তবু লেখাপড়া ছাড়েননি অদম্য প্রমিতা। ২০১৪ সালে অনেকটা বিনা চিকিৎসায় মারা যান দীপালি রানী দেব। ২০১৫ সালে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিয়ে হয় প্রমিতার বড় বোনের। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বাবার সবজির চারা বিক্রি। তিনিও অনেকদি ধরে অসুস্থ থাকায় এ আয়ের উৎসও অনেকটাই বন্ধ হওয়ার পথে। বিকল্প না থাকায় যখন পরিবারের সদস্যরা চোখে অন্ধকার দেখছিলেন তখনই আলো হয়ে দেখা দিয়েছে প্রমিতার পুলিশ কনস্টেবল পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়া।
সরেজমিনে আবদালপুর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, এ গ্রামে প্রায় সাড়ে তিনশ সনাতন পরিবারের বসবাস। অধিকাংশই নিম্নবিত্ত প্রান্তিক কৃষক।
প্রমিতা দেবের বাবা লাল্টু দেব বলেন, ‘অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে চলে আমাদের। অনেকদিন শুধু পানিই আমাদের একমাত্র খাবার হয়। আমার মেয়ে মানুষের সাহায্যে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। বাড়ির সব কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে গেছে সে। তার চাকরিটা হওয়ায় অনেক খুশি হইছি।’
আলাপকালে প্রমিতা দেব বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল পুলিশ বিভাগে চাকরি করে পরিবারের হাল ধরা ও দেশসেবা করার। আমার মা-ও চাইতেন আমি যেন পুলিশে চাকরি করি। আমার চাকরি হলো কিন্তু মা দেখে যেতে পারেননি। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিক থেকে কলেজ কোনো দিন কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়তে পারিনি। যা পড়ার সবই স্কুল বা কলেজের শ্রেণিকক্ষেই পড়তাম। শুধু পরীক্ষার সময় সকালে বাড়িতে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করে সহপাঠীদের সহায়ক বই থেকে নোট করে বা মূল বই থেকে পড়া শেষ করে পরীক্ষার হলে যেতাম। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা প্রচুর সাহায্য করেছেন। আর প্রায় প্রতি বছরই ভর্তির সময় টাকা দিয়ে সহায়তা করেছেন গ্রামের প্রতিবেশীরা। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। আগে শুনতাম টাকা ছাড়া পুলিশে চাকরি হয় না। কিন্তু অনলাইনে আবেদন ফি এবং গ্রাম থেকে শহরে যাতায়াত খরচ ছাড়া আর কোনো টাকা কোথাও ব্যয় করিনি। যাতায়াত খরচের টাকাও প্রতিবেশীরা দিয়েছেন।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার মাধ্যমে এবারের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আশা করব যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা সাধারণ মানুষকে সে রকম সততা, নিরপেক্ষতা এবং দুর্নীতিমুক্ত হয়ে পেশাদারির সঙ্গে সেবা দেবেন।’