রিফাত আবির, বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪০ এএম
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইউনুছ আলী। প্রবা ফটো
জন্মের মাত্র পাঁচ বছর পর টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান ইউনুছ আলী। দৃষ্টিশক্তি হারালেও কখনও মনোবল হারাননি। সব বাধা জয় করে ছোট্ট একটি মুদি দোকান চালিয়ে আজ তিনি স্বাবলম্বী। হয়েছেন সমাজের কাছে দৃষ্টান্ত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী গ্রামের মৃত খালেক বেপারীর ছেলে ইউনুছ আলী সংসারের তৃতীয় সন্তান। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ব্যবসায়ী বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৮৬ সালে ১৭ বছর বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন ইউনুছ আলী। অন্যের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা ধার নিয়ে এ পুঁজি দিয়ে বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান চালু করেন। একদিকে বাবার চিকিৎসা, অন্যদিকে সংসারের খরচ জোগাতে হিমশিম খান ইউনুছ আলী। তবে কখনও ভেঙে পড়েননি। নিজ চেষ্টায় দোকানের ব্যাপক উন্নতি করেন। তিন বোনকে বিয়ে দেন। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার সংসারের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
দোকানের সব পণ্য মাপার কাজ তিনি নিজেই করেন। ইউনুছ আলীর দোকানে নারী ক্রেতার সংখ্যা বেশি। বেশিরভাগ ক্রেতা তার প্রবাসী ও মাসিক মালামাল নেওয়া ব্যক্তিরা। প্রথম দিকে বাকির হিসাব লিখে রাখতেন প্রতিবেশীদের মাধ্যমে। এখন তার সন্তান, নাতি ও ছেলের বউ লিখে রাখেন বাকির হিসাবের খাতা। দোকান থেকে কেউ বাকি নিলে তিনি নাম স্মরণ রেখে বাড়ি গিয়ে নাতি ও ছেলের বউকে বললে তারা লিখে রাখেন।
১৯৯৮ সালে উপজেলার ছলিমাবাদ গ্রামের ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন ইউনুছ। তাদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, বড় ছেলে বিয়ে করেছেন। ইউনুছ আলী দুঃখ করে বলেন, ‘বড় মেয়ে কিছমত আরা অনেক ভালো ছাত্রী ছিল; কিন্তু টাকার অভাবে পড়ালেখা করাতে পারিনি।’ তিনি ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন।
রূপসদী মধ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কবির হোসেন বলেন, ‘ইউনুছ আলী আমাদের সমাজের জন্য উদাহরণ। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি অন্ধ হয়েও অন্যের দ্বারস্থ না হয়ে নিজে স্বাবলম্বী হতে ছোট টং দোকান নিয়ে মুদি দোকানদারি করে জীবনযাপন করছেন। উনি সমাজের উদাহরণ, ভিক্ষাবৃত্তি না করে নিজেই স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করেছেন।’
স্থানীয় নেপাল দেবনাথ বলেন, প্রায় ৩৮ বছর ধরে ইউনুছ আলী দোকানে মালামাল বিক্রি করেন। আমাদের পাইকারি দোকান থেকেও মাল কিনে খুচরা বিক্রি করতেন তিনি। উনি খুবই ভালোমানুষ ব্যবসা করে বাঁচতেছে। উনি কারও কাছে হাত না পেতে দোকান দিয়ে বাঁচতেছে এতে আমরা অনেক খুশি।’
মুদি ব্যবসায়ী ইউনুছ আলী বলেন, ‘জন্মের পাঁচ বছরের সময় টাইফয়েড জ্বরের পর চোখ অন্ধ হয়ে যায়। ১৭ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের দায়িত্ব আমি নিই। বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান খুলি এভাবেই ধীরে ধীরে আমার সংসার চালিয়ে নিজে বিয়ে করেছি। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছি। আমি এখন মোটামুটি স্বাবলম্বী। অনেকেই নিজে কাজ না করে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে, আমি মনে করি চেষ্টায় মানুষের সবকিছু। মনোবল মানুষকে সবকিছু করতে শেখায়।’