বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে-১৪
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:১০ পিএম
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৮:০৫ পিএম
সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোনে তোলা ছবি
আমাদের যাত্রাপথের সপ্তদশ দিন ছিল ২২ ডিসেম্বর ২০২৪। আগেই জাহাজের ক্যাপ্টেন বলেছিলেন এদিন আমরা সর্বশেষ বারের মতো দুইটি পেনিনসুলায় (উপদ্বীপে) নামতে পারবো। একথা জেনে আমাদের সবার মাঝে বিদায়ের বেদনা জেগে ওঠে।
অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের সময় জাহাজে ভ্রমণ সঙ্গীদের সাথে আমাদের আন্তরিকতার ফলে এই বিদায়ের অনুভূতি আরও বেশি প্রকট হয়।এটি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে সুখের মুহূর্তগুলি চিরস্থায়ী নয়। এসব ভাবতে ভাবতে আমরা পৌঁছে যাই ডিসেপশন আইল্যান্ডে। আসলে এটি ছিল অ্যান্টার্কটিকার একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দ্বীপ। অ্যান্টার্কটিকার অদ্ভুত ও রহস্যময় দ্বীপগুলোর মধ্যে অন্যতম হল এই ডিসেপশন আইল্যান্ড। এই দ্বীপটি তার অস্বাভাবিক আকৃতি ও প্রকৃতির জন্য বিখ্যাত। এর কালো বালির উপকূল, গরম জলের উৎস এবং সক্রিয় আগ্নেয়গিরির কারণে এটি বিজ্ঞানী ও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোন
এই দ্বীপের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় যে - ডিসেপশন আইল্যান্ড আসলে একটি বিশাল আগ্নেয়গিরির শীর্ষ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট হয়েছে। আগতদের কাছে এটি একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে মনে হলেও আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার কারণে এটি যে কোনো সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অতীতের বিভিন্ন সময়ে এই দ্বীপটিতে আলাস্কান এবং শিকারীরা আসত। তারা এই দ্বীপের সম্পদকে কাজে লাগাত।

সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোন
তবে এই আগ্নেয়গিরি মাঝে মধ্যেই অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়ে থাকে এবং এর ফলে যে কোনো সময় এখানে পর্যটকদের আসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ১৯৬৭ সালে এই দ্বীপে একটি বড় অগ্ন্যুৎপাত ঘটে । যার ফলে বন্দরটি সম্পূর্ণ ভরে গিয়েছিল। এতো কিছুর পরও ডিসেপশন আইল্যান্ডের ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ভর করবে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার উপর। বিজ্ঞানীরা এই দ্বীপটিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাত হবে কিনা তা নির্ণয় করার চেষ্টা করছেন।

সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোনে লেখক
ডিসেপশন আইল্যান্ড একটি অত্যন্ত সুন্দর দ্বীপ হলেও এটি সত্যিকার অর্থেই বিপজ্জনক স্থান।বিকেলে আমরা পৌঁছে যাই সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোন দ্বীপে। এটিই আমাদের অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের সর্বশেষ অবতরণ। আসলে অ্যান্টার্কটিকার আরেকটি অবিশ্বাস্য দ্বীপ হলো সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোন দ্বীপ।
ডিসেপশন আইল্যান্ড
অত্যন্ত আকর্ষণীয় এই দ্বীপটি ডিসেপশন আইল্যান্ডের মতোই তার নিজস্ব সৌন্দর্য এবং বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত।
লিভিংস্টোন দ্বীপটি অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। এই দ্বীপটিও মূলত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে গঠিত হয়েছে এবং এখানে বেশ কিছু সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। সাউথ পয়েন্ট হল এই দ্বীপের দক্ষিণতম প্রান্ত এবং এটি একটি উঁচু প্রস্তরখণ্ড। এই দ্বীপটিতে বিভিন্ন ধরনের পাখি, সিল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী দেখেছি আমরা। বিশেষ করে এখানে জেন্টু পেঙ্গুইনদের বড় বড় কলোনি দেখেছি আমরা।
ডিসেপশন আইল্যান্ড
বিজ্ঞানীদের কাছে এই দ্বীপ গবেষণা করার একটি উত্তম স্থান। এটি আগ্নেয়গিরি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামুদ্রিক জীবন সম্পর্কিত গবেষণার আকর্ষণীয় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আমরা এখানে এসে পেঙ্গুইন কলোনি দেখেছি এবং হিমবাহের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অ্যান্টার্কটিকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছি।
ডিসেপশন আইল্যান্ড
তবে উদ্বেগের বিষয় এই যে- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দ্বীপের বরফ গলে যাচ্ছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দ্বীপের মনোরম পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
সময় হয় জাহাজে ওঠার। জাহাজে বসার পর এটি যাত্রা শুরু করে আর্জেন্টিনার উশুইয়ার পথে ভয়ংকর ড্রেক প্যাসেজের মধ্যে দিয়ে।
আগামী পর্ব শেষ পর্ব
লেখক : জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর