বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে-১৩
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৫৯ পিএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৪৪ পিএম
অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলায় অভিযাত্রী দল
অ্যান্টার্কটিকা আবিষ্কার হয় ১৮২০ সালে। মানুষ যখন প্রথম এখানে পা রাখে, তখন এই মহাদেশের মালিকানা কোনো দেশেরই ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ অ্যান্টার্কটিকার মালিকানা দাবি করলে শুরু হয় বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বিবাদ। এই বিবাদ নিরসনে ১৯৫৯ সালে ১২ টি দেশ মিলে অ্যান্টার্কটিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই ১২ টি দেশ হলো আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, চিলি, ফ্রান্স, জাপান, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।
এই চুক্তির মাধ্যমে অ্যান্টার্কটিকাকে শান্তি ও বিজ্ঞানের জন উৎসর্গ করা হয়। এ বিষয়ে আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, এখানে একক কোনও দেশের সার্বভৌমত্ব থাকবে না। পরে আরো ৪১ টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং এখানে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে যে কেউ গবেষণা করতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তির মাধ্যমেই বাণিজ্যিক মাছ ধরা, সিল শিকার করা এবং খনিজ সম্পদ খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
সাধারণত বিস্তৃর্ণ বালু অঞ্চলকে বলা হয় মরুভূমি। কিন্তু এই অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে রয়েছে বিস্তীর্ণ বরফ আচ্ছাদিত মরুভূমি। পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল অঞ্চল এই অ্যান্টার্কটিকা।
এই অঞ্চলের সময়ের ধারণাটা বেশ জটিল। ৬ মাস দিনের আলো এবং ৬ মাস রাতের অন্ধকার থাকে। এখানে দিন রাতের স্বাভাবিক চক্র না থাকায় গবেষকরা তাদের নিজ নিজ দেশের সময় অনুসরণ করেন।
বিগত ৫০ বছরে অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাঁচ গুণেরও বেশি। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চলের সমুদ্রে বরফের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রাণিকূল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছে; যা খুবই উদ্বেগের একটা বিষয়।
লেখক
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের একাধিক পেনিনসুলায় আমরা অবতরণ করেছি। সবগুলোই ছিল সাদা দুধের মত এক একটি চাদরে ঢাকা। এই সাদা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আবাসস্থলের জন্য অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করেছে। পেঙ্গুইন, সিল এবং বিভিন্ন ধরনের পাখি এই শীতল জায়গায় বাস করে। তবে, সারা বছর মানুষের বাস করার জন্য খুব একটা অনুকূল পরিবেশ নেই বললেই চলে। তবুও অবিশ্বাস্যভাবে এখানে এক শিশু জন্মগ্রহণ করেছিল। তার নাম এমিলিও মার্কোস পালমা। ১৯৭৮ সালের ৭ জানুয়ারি অ্যান্টার্কটিকার এসপেরেঞ্জা ঘাঁটিতে পালমার জন্ম। তার মা ছিলেন আর্জেন্টাইন এক স্কুলের শিক্ষক এবং বাবা ছিলেন আর্জেন্টাইন সৈনিক। তখন এসপেরেঞ্জা ঘাঁটিতে একটি ছোট্ট হাসপাতাল ছিল। সেই হাসপাতালে পালমার মা কাজ করতেন। পালমার জন্মের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, মানুষ কতটা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে জন্ম গ্রহণ করে এবং বেঁচে থাকতে পারে। এমিলিও মার্কোস পালমা এখনও একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে সুস্থ ভাবে বেঁচে আছেন।
অ্যান্টার্কটিকা পেনিনসুলায় অবতরণের পর আমাদের ভ্রমণসঙ্গী অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তারা তাদের প্রত্যেকের অনুভূতি জানিয়েছেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশের স্কলাস্টিকা স্কুলের শিক্ষক তুলান জানান- এত সৌন্দর্যের বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নিয়াজ অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে পৃথিবীর সাতটি মহাদেশ দেখা শেষ করলেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি। তবে এই মহাদেশে এসে আমার ভ্রমণ-জীবন যেন পূর্ণতা পেয়েছে। অনন্য এক অনুভূতি নিয়ে তিনি ফিরে যাবেন বলে তিনি জানান।
অভিযাত্রী তারেক অণু
আমাদের ভ্রমণ দলের অন্যতম নেতা তারেক অণু। তিনিও এর মধ্যে দিয়ে সাত মহাদেশ ভ্রমণ করে ফেললেন। তার আপন ভাই তানভীর অপুও এই ভ্রমণ দলে রয়েছেন। তারও অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের মধ্য দিয়ে সাত মহাদেশ ভ্রমণ শেষ হলো। এছাড়া প্রথম অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণকারী বাংলাদেশে অ্যাডভেঞ্চারে আগ্রহী প্রজন্ম গড়ে তোলার পথিকৃত ইনাম আল হক এবং অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মাহবুব চৌধুরীর সাত মহাদেশ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তারেক অণু এত অল্প বয়সে ৬০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করে ভ্রমণ যুবরাজ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার কাছে অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, আমার কোন অনুভূতিই এখন কাজ করছে না! আমি একেবারে হতবাক! চারপাশে পাহাড় দেখছি, বরফ দেখছি এবং অদ্ভুত সবকিছু দেখছি! যা আগে কখনওই দেখিনি। এছাড়া এই স্থল এবং আকাশের যে রূপ দেখছি তা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এসব দেখে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটি লাইনে মনে পড়ছে। কবির ‘কোথাও দেখিনি’ কবিতা থেকে বলতে চাই - " কোথাও দেখিনি, আহা!" ভ্রমণ যুবরাজ তারেক অণুর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হয়েছে। ভ্রমণ পিপাসু পাঠকের জন্য তা দ্রুতই প্রকাশ পাবে।
আর্জেন্টিনার গবেষণা কেন্দ্র
অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ শুধু একটি ভ্রমণ নয়, জীবনের চিরস্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা। যারা প্রকৃতির নিবিড় স্পর্শ অনুভব করতে চান এবং ভ্রমণ জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করতে চান তাদের জন্য এটি হবে একটি সেরা পছন্দ। তবে পৃথিবীর সব দেশ দেখা সম্ভব না হলেও শুধুমাত্র অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ হলেই আপনার মনে হবে পৃথিবীর ভূস্বর্গ দেখা হলো এবার!
আগামী পর্বে ডিসেপশন আইল্যান্ড এবং সাউথ পয়েন্ট লিভিংস্টোন দ্বীপ নিয়ে অজানা তথ্য
লেখক: জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর