বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে : ১২
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৩৮ পিএম
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৫৯ পিএম
পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তের মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশাল এ নির্জনতম মহাদেশ ভ্রমণে রয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি। সফরে থাকা মহসিনুল হক অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকের জন্য নিয়মিত তুলে ধরছেন। আজ থাকছে দাদ্বশ পর্ব।
অ্যান্টার্কটিকা সফরে এসে আমরা এখন অবস্থান করছি পালাভার পয়েন্ট (Palaver Point) অঞ্চলে। এটি আন্টার্টিকার একটি বিখ্যাত স্থান। বিশেষত চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের জন্য এই স্থানটি বিখ্যাত। চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের বড় একটি কলোনি রয়েছে এখানে। এই স্থানের নামকরণ করা হয়েছে পেঙ্গুইনদের অবিরাম আওয়াজের কারণে। যা "palaver" অর্থাৎ গোলমাল বা আলোচনা শব্দের সাথে মিলে যায়।
এই অঞ্চলে এলে পেঙ্গুইনদের খুব কাছে থেকে দেখার অনন্য সুযোগ পাওয়া যায়। পালাভার পয়েন্টের যেন অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপেক্ষা করে আমাদের মতো পর্যটকদের আশায়। বরফের পাহাড়, সমুদ্র এবং পেঙ্গুইনদের জীবনযাত্রা- সব মিলিয়ে অবিস্মরণীয় সব দৃশ্য আমাদের উপহার দিয়েছে এই অঞ্চলটি। বিজ্ঞানীরা স্থানটিকে পেঙ্গুইনদের জীবনযাত্রা এবং আন্টার্টিকার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে বিবেচনায় রাখেন স্থানটিকে।
আমাদের অ্যান্টার্কটিকা যাত্রার শুরু থেকে হরেক রকম পেঙ্গুইন দেখছি। এ অঞ্চলে ঠিক কতো প্রজাতির পেঙ্গুইন রয়েছে সেটি বলা খুবই কঠিন। কারণ একেক উৎস এর সংখ্যার একেক রকম তথ্য দিচ্ছে। তবে, এবারের অ্যান্টার্কটিকা সফরে আমরা মোট আট প্রজাতির পেঙ্গুইনের দেখা পেয়েছি ।
জেন্টু পেঙ্গুইন: আমাদের এই যাত্রায় এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে স্মরণীয় হলো জেন্টু পেঙ্গুইন। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ এবং তার আশেপাশে এদের দেখা মেলে। মাঝারি আকারের এই পেঙ্গুইনগুলি তাদের লাল ঠোঁটে জন্য স্বতন্ত্র, আর বিখ্যাত এদের গতির জন্য। প্রয়োজনে এরা ঘণ্টায় ৩২ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে।
কিং পেঙ্গুইন: এরা দক্ষিণ মেরুর রাজকীয় বাসিন্দা। কিং পেঙ্গুইন হলো পেঙ্গুইন পরিবারের দ্বিতীয় বৃহত্তম সদস্য। এম্পেরর পেঙ্গুইনের পরেই কিং পেঙ্গুইনদের আকার সবচেয়ে বড়। এই রাজকীয় পেঙ্গুইন তাদের সুন্দর চেহারা এবং অনন্য আচরণের জন্য বিখ্যাত।
ম্যাকোর্নি পেঙ্গুইন: দক্ষিণ মেরুর অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে হলুদ চুলের সুন্দরী ম্যাকোর্নি পেঙ্গুইন (ইংরেজি: Macaroni Penguin) হল একধরনের পেঙ্গুইন যা তাদের চোখের উপরে একটি হলুদ চুলের ঝুঁটির জন্য সুপরিচিত। এই চুলের ঝুঁটিই এদেরকে অন্য পেঙ্গুইন থেকে আলাদা করেছে।
চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন: এরা তাদের ঠোঁটের নিচের কালো রেখার জন্য সুপরিচিত। একটি প্রাপ্তবয়স্ক চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন উচ্চতায় ৭০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে এবং ওজন হয় তিন থেকে ছয় কেজির মধ্যে। গবেষকদের কাছে এর ঘুমের জন্যও বিখ্যাত। গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন এরা চার সেকেন্ড বা তার কাছাকাছি সময় নিয়ে দিনে ১০ হাজার বারের বেশি ঘুমায় । সব মিলিয়ে এই পেঙ্গুইনগুলো দিনের প্রায় ১১ ঘণ্টাই ঘুমিয়ে কাটায়। কিন্তু এরা কখনোই টানা ঘুমায় না।
এম্পেরর পেঙ্গুইন: সবচেয়ে বড় প্রজাতির পেঙ্গুইন এরা। নারী এবং পুরুষ উভয়েরই সমান পালক আছে এবং দুজনেরই উচ্চতাও সমান হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এম্পেরর পেঙ্গুইনের বিলুপ্তির ঝুঁকি বাড়ছে। এই অঞ্চলে আমরা এই পেঙ্গুইনের দেখা পেয়েছি।
অ্যাডেলি পেঙ্গুইন: অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পেঙ্গুইন এই প্রজাতির।এর আকার মাঝারি, উচ্চতা হয়ে থাকে ৪৬ থেকে ৭৫ সেমি এবং ওজন হয় ৩.৬-৬ কেজি। অ্যাডেলি চোখের চারপাশের সাদা রিং এবং ঠোঁটের নিচে পালক অন্য প্রজাতি থেকে এদেরকে আলাদা করেছে। এই দীর্ঘ পালক তাদের ঠোঁটের প্রায় পুরোটা অংশই ঢেকে দেয়। এদের লেজও অন্যান্য পেঙ্গুইন তুলনায় লম্বা হয়। আডেলি পেঙ্গুইনের সাথে দেখা হয়েছে সবশেষে । এটা ছিল এই ভ্রমণে আমাদের দেখা বিশেষ এক পেঙ্গুইনের প্রজাতি। ফরাসি অভিযাত্রী ও বিজ্ঞানীর স্ত্রীর নামে এর নাম রাখা হয়েছিল।
ম্যাজেলানিক পেঙ্গুইন: ম্যাগেলানিক পেঙ্গুইনের নামকরণ করা হয়েছিল পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফার্দিনান্দ ম্যাগেলানের নামে, যিনি ১৫২০ সালে পাখিটিকে দেখেছিলেন।
ম্যাগেলানিক পেঙ্গুইন মাঝারি আকারের হয়ে থাকে। উচ্চতা হয় ৬১ থেকে ৭৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন হয়ে থাকে ২.৭ থেকে ৬.৫ কেজি। সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা এবার অ্যান্টার্কটিকার আশেপাশেও এই পেঙ্গুইন দেখেছি।
রকহপার পেঙ্গুইন: এই পেঙ্গুইনগুলি তাদের লম্বা লাল ঠোঁটের জন্য বিখ্যাত।
অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণে এসে তিমির সাথে সময় কাটানো ছিল আমাদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার বিষয়।এতো অল্প সময়ে আমরা এতো অধিক সংখ্যক তিমির দেখা পাবো তা কখনো স্বপ্নেও ভাবি নাই। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবং যে সময়ে আমরা তিমি দেখতে বেরিয়েছিলাম সেই সময়টি ছিল তিমির ভেসে ওঠার সময়। সে কারণে আমাদের ভ্রমণে থাকা সব পর্যটক যে পরিমাণ তিমি দেখেছেন তা দেখে সকলের মন ভরে গেছে!
তবে তিমি শিকার বিষয়ে আমাদের গাইড যে গল্প শুনিয়েছেন তা শুনে আমাদের মন বেদনাক্রান্ত হয়েছে।
তিমি শিকার ছিল আন্টার্কটিকার বরফের নিচে একটি রক্তাক্ত ইতিহাস। অ্যান্টার্কটিকা শান্তির এবং নির্মলতার প্রতীক। এই মহাদেশের সাদা বরফের নিচে লুকিয়ে রয়েছে এক অন্ধকার ইতিহাস। এই ইতিহাসের মূল কেন্দ্রে ছিল তিমি এবং তাদের শিকারীরা।
তিমি শিকার ছিল একটা অর্থনৈতিক যুদ্ধ। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে তিমি তেলের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বেড়ে যায়। তিমি তেল ব্যবহৃত হতো ল্যাম্প জ্বালানো, সাবান তৈরি এবং অন্যান্য শিল্পে। এই চাহিদা মেটাতে তিমি শিকারিরা আন্টার্কটিকার ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তিমি শিকারিদের কাছে তিমি ছিল মূলত তেলের একটি ভাণ্ডার। তারা বিশাল হার্পুন গান ব্যবহার করে তিমিকে আঘাত করতো। আহত তিমি সাগরে ভাসতে থাকতো এবং শিকারিরা নৌকা নিয়ে তার পেছনে দৌঁড়াত। যখন তিমি ক্লান্ত হয়ে যেত তখন তাকে হত্যা করে নৌকায় তুলে নেওয়া হতো। এভাবেই শিকার করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ তিমি।
তিমি শিকারের এই নির্মম গল্প শুনে আমরা জডিয়াক (ছোট নৌকা) থেকে ফিরে আসি আমাদের জাহাজে।
আগামী পর্বে : অ্যান্টার্কটিকা যেন সাদা দুধের মতো একটি অঞ্চল, জাহাজের কিছু যাত্রীদের অনন্য অনুভূতির কথা
লেখক: জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর