উদ্ভাবন অলিম্পিয়াড
এস এম ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৫৮ এএম
আইস্পার্কের অরাগার্ড স্বর্ণপদক এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে রৌপ্য জয় করে হাইডোপ্লাজমাই এক্স
জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বাংলাদেশের দুই শিক্ষার্থী ত্ব-সীন ইলাহি ও জাবীর জারিফ পদক জয় করলেন। প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ৪৫টি দলকে পেছনে ফেলে আইস্পার্কের অরাগার্ড স্বর্ণপদক এবং হাইডোপ্লাজমাই এক্স রৌপ্য জয় করেন।
ওরা কিশোর। তবে ওদের খেলার মাঠ-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন। এ মাঠেই কেশর ফুলিয়ে চলছে কয়েক বছর ধরেই। সবশেষ জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবনায় মহান বিজয় দিবসেই বিশ্ব জয় করল ওরা। ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ইনোভেটিভ সায়েন্স সায়েন্স প্রজেক্ট অলিম্পিয়াড-২০২৪ (উইসপো)-এ ওড়াল লাল-সবুজের পতাকা। এদের একজন রাজশাহীর কামারুজ্জামান সরকারি ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ত্ব-সীন ইলাহি। অন্যজন ঢাকার আগারগাঁওয়ের অধিবাসী সেন্ট জোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাবীর জারিফ আখতার। সেখানেই ত্ব-সীনের মা মোসা. মাসুমা আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজক কমিটির বিচারক প্রফেসর এরি হারদিয়ানের হাত থেকে একটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্য পদক গ্রহণ করে এ কিশোর উদ্ভাবকরা। বিশ্বকে উপহার দিল নিরাপদ সড়ক এবং পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তি। দুটি প্রযুক্তিই তারা উদ্ভাবন করেছে নিজেদের খরচে। প্রতিযোগিতার খোঁজ পেয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

ইন্দোনেশিয়া সায়েন্টিফিক সোসাইটির (আইএসএস) উদ্যোগে দেশটির পশ্চিমের জাভা প্রদেশের বেনডং নগরীতে ১৩ থেকে ১৭ ডিসেম্বর বসেছিল বিজ্ঞান-উদ্ভাবনের বৈশ্বিক আসর উইসপো ২০২৪। এতে ৩০টি দেশ থেকে অংশ নেয় সহস্রাধিক প্রতিযোগী। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, রোমানিয়া, ইউক্রেন, ফিলিপাইন ছিল বাংলাদেশের সামনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পতাকা বহন করে আইস্পার্ক। এ দলের পক্ষ থেকে দুটি উদ্ভাবন অরাগার্ড ও হাইডোপ্লাজমাই এক্স প্রদর্শন করা হয়। প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ৪৫টি দলকে পেছনে ফেলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগে আইস্পার্কের অরাগার্ড স্বর্ণপদক এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে রৌপ্য জয় করে হাইডোপ্লাজমাই এক্স। স্বর্ণজয়ী অরাগার্ড প্রকল্পটির উদ্ভাবক মো. ত্ব-সীন ইলাহি। আর হাইডোপ্লাজমাই এক্স উদ্ভাবক জাবীর জারিফ আখতার। প্রতিযোগিতায় তারা সড়ক দুর্ঘটনা রোধী এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ডিভাইস বানিয়ে দেখায়। এতে বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা হয় আরও দুটি স্বর্ণ ও দুটি রৌপ্য। প্রতিযোগিতায় বায়োনিক হাত বানিয়ে রৌপ্য জয় করে ইন্দোনেশিয়ার একটি দল। আর চালের আটা ও নারকেল তেলের মিশ্রণে অর্গানিক সাবান বানিয়ে হাইডোপ্লাজমাই এক্সকে বেঁধে ফেলে স্বাগতিক দেশেরই একটি দল। তার পরও বাংলাদেশের কিশোরদের উদ্ভাবনায় বাংলাদেশের প্রশংসা ঝরেছে আইএসএসপ্রধান আইওয়ান বুদিমানের কণ্ঠে। পুরস্কার বিতরণীতে অনলাইনে অংশ নিয়ে কিশোর উদ্ভাবকদের প্রশংসা করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক ও পদার্থবিজ্ঞানে বিদায়ি বছরের নোবেলজয়ী জিওফ্রে হিন্টন।
সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত অরাগার্ড
ইংরেজি aura অর্থ দেহজ্যোতি। শরীরের এ অলৌকিক আভার মতোই গাড়ির চালককে সুরক্ষিত রাখার একটি প্রকৌশল অরাগার্ড। এর ৫ বাই ৭ ইঞ্চির আয়তাকার বাক্সটির মাদারবোর্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয় সাতটি সেন্সর। ডিভাইসটিতে একটি সিপিইউ, ট্যাবলেট, টেকোমিটার, ক্যামেরা, ভাইব্রেটর ও লিডার ব্যবহার করা হয়। সিম দিয়ে ইন্টারনেট সংযুক্ত করে জিপিএস ব্যবহার করে গাড়ির সুরক্ষা-দুর্ঘটনার সব তথ্যই পাঠিয়ে দেওয়া হয় মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। তাই ডিভাইসটি গাড়িতে লাগিয়ে রাখলে সেটি চালক ঝিমুনি দিতেই তাকে সতর্ক করার পাশাপাশি মালিকের কাছেও বার্তা চলে যাবে। একই সঙ্গে মাতাল হলে, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। লাইসেন্স স্ক্যান করে তবেই ইঞ্জিন চালু করার সুযোগ পাবেন চালক। আবার ফিটনেস টেস্ট রিনিউ না করলেও চলবে না চাকা। প্রতিযোগিতায় ডেমোনেস্ট্রেট করার সময় ‘আশপাশে গাড়ি থাকলে কিংবা কুয়াশা থাকলে’ কী হবে প্রশ্ন রাখেন বিচারকরা। জবাবে উদ্ভাবক ত্ব-সীনের উত্তরÑ ৩৬০ ভিউ লাইডার যুক্ত করে দিলেই সে বাধাও অতিক্রম করা যাবে।
ডিভাইসটির প্রকৌশল নিয়ে বলল, এ ডিভাইসটি মূলত অনেক সেন্সর একসঙ্গে ইন্টিগ্রেট করে এবং সিপিইউ সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ড্রাইভারকে রক্ষা করে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্টস অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ড্রাইভার দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন ভুলের সমাধান প্রদান করে এবং সড়কে সবাইকে নিরাপদ রাখে। ডিভাইসটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকার মতো। তবে বাণিজ্যিকভাবে ২৫ হাজারের মধ্যেই সম্ভব বলে জানাল সে। ত্ব-সীনের বাবা মো. ইসহাক আলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গবেষণা ও উদ্ভাবনায় অনুরক্ত হয়েছেন স্কুল জীবনেই। উদ্ভাবনায় এর আগেও মালয়েশিয়া থেকে স্বর্ণপদক জিতেছে সে।
হাইডোপ্লাজমাই এক্সের রুপালি ঝিলিক
ডিভাইসটি ছোট একটি কলমের সমান। এর মাধ্যমে মূলত পানিতে হাই ভোল্টেজ প্লাজমা প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ ভোল্টেজে বিবর্জিত শকওয়েভ তৈরি করে জীবাণু ধ্বংস করা হয়। ফিলিস্তিনে সুপেয় পানির অভাব মেটানো এবং বাংলাদেশের বন্যার সময় পানিবাহিত রোগে শিশুমৃত্যু কমানোর চিন্তা থেকেই ডিভাইসটি উদ্ভাবন করে সেন্ট জোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাবীর জারিফ আখতার। ডিভাইসটির মাধ্যমে মূলত ব্যাটারি বা ডিসি পাওয়ার সোর্স থেকে দিক পরিবর্তনশীল তরঙ্গ তৈরি তথা একটি সুইচিং সার্কিট ব্যবহার করে এসি কারেন্টে রূপান্তর করা হয়। এরপর রূপান্তরিত এসি কারেন্টকে উচ্চবিভবে বিবর্ধিত করার জন্য ট্রান্সফরমার ব্যবহার করা হয়। এর ফলে উৎপন্নকৃত উচ্চবিভব পানিতে শকওয়েভ জেনারেট করে যা পানিতে বিদ্যমান বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল কন্টামিনেন্ট যেমন ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস ইত্যাদির কোষ প্রাচীর ভেদ করে নিউক্লিয়াসে অবস্থিত ডিএনএ আরএনের বন্ড ভেঙে এগুলো ধ্বংস করে। এ ছাড়া বিভিন্ন জৈব পদার্থের ডাবল, ট্রিপল পাই বন্ধন ভেঙে পানি পরিশোধন করে। তবে এ কাজটি করতে লাগে মাত্র ৩ থেকে ৫ সেকেন্ড।
খরচ জানতে চাইলে চমকপ্রদ তথ্য দিল জারীফ। বলল, ডিভাইসটি যদি আমরা বাজার থেকে সরাসরি কেনা প্রোডাক্ট দিয়ে তৈরি করি তাহলে এর খরচ ৭ থেকে ৮ ডলার আর ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে তৈরি করলে দেশভেদে খরচ সাড়ে ৩ থেকে ৫ ডলার। অর্থাৎ তার উদ্ভাবিত পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রটি কেবল পানি শোধনই করে না, ই-বর্জ্য থেকেও পরিবেশ নিরাপদ রাখতে সহায়ক। ডিভাইসটি বানানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকর্তা বাবা বাবুল আখতারের কথা জানাল সে। অবশ্য সরকারি কর্মকর্তা মা ফারহানা শওকতের অনুপ্রেরণায় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে গবেষণা শুরু তার। আর কোভিডের অখণ্ড অবসর তাকে এনে দিয়েছে সফলতা। বলল, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়তে নিকোলা টেসলার সঙ্গে পরিচয়। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র নিয়ে খেলা শুরু। তখন থেকেই বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিই। এর আগে সুইডেনের স্টকহোম জুনিয়র ওয়াটার প্রাইজে ফাইনালিস্ট ডিপ্লোমা অর্জন করেছি। এখন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের স্যাটেলাইট প্রকল্প নাসা গ্লি মিশনের ট্রেইনি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিযুক্ত।