বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে-১১
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:১৮ পিএম
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৪৮ পিএম
অ্যান্টার্কটিকায় অবতরণকারী প্রথম বাংলাদেশি ইনাম আল হকের সঙ্গে লেখক মহসিনুল হক ছবি : লেখকের সৌজন্যে
পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তের মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশাল এ নির্জনতম মহাদেশ ভ্রমণে রয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি। সফরে থাকা মহসিনুল হক অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকের জন্য নিয়মিত তুলে ধরছেন। আজ থাকছে একাদশ পর্ব।
আমাদের জাহাজের প্রত্যেক যাত্রীর জন্য এক অনন্য অনুভূতির দিন ২০ ডিসেম্বর। এই দিন সকাল সাড়ে ৮টায় আমরা সব যাত্রী পেনিনসুলায় নামার সুযোগ পাই। বাংলাদেশ থেকে এ অ্যান্টার্কটিকা পেনিনসুলায় আসা প্রথম অভিযাত্রী ছিলেন ইনাম আল হক। তার বর্তমান বয়স ৮০। তিনি এখনও মনেপ্রাণে একজন তরুণ।
-676678a815913.jpeg)
আজ সকালে আমরা যখন এ পেনিনসুলায় অবতরণ করলাম তখন এক অনন্য অনুভূতি আমাদের মাঝে কাজ করছে। যেন আমরা সত্যি সত্যিই কল্পনার জগতে হারিয়ে গিয়েছি। দুধের মতো দেশের খোঁজে কিংবা উঠান লেপার মতো করে সাদা বরফ দিয়ে পাহাড়গুলো যেন লেপা হয়েছে। এ দৃশ্য দেখে যেকোনো মানুষ নির্বাক না হয়ে থাকতে পারবে না। সত্যিই এক অপরূপ বিস্ময় যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিল আমাদের সামনে। আমরা হারিয়ে গেলাম এর অপার সৌন্দর্যে। পথের পাঁচালির অপু-দুর্গার ট্রেন দেখা যেমন শেষ হয় না, তেমন সারা দিনেও এ বরফ মহাদেশ আমাদের দেখা শেষ হয় না। সত্যিই আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম রূপকথার অঞ্চলে।
-676678bc4b374.jpeg)
মূলত অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলা পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম এবং রহস্যময় স্থান। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাংশের কাছে অবস্থিত পেনিনসুলা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। এ অঞ্চলটি তার বিশাল বরফের চাদর, বিচিত্র প্রাণিজগৎ এবং দ্রুত পরিবর্তিত হওয়া পরিবেশের জন্য বিখ্যাত। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এর অবস্থা। প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বিভিন্ন প্রস্থে বিস্তৃত এর আকার।
-676678ca5cbec.jpeg)
পাহাড়, উপত্যকা, বরফের চাদর, উপদ্বীপ এবং বহুসংখ্যক দ্বীপ দ্বারা এটি গঠিত। এখানকার জলবায়ু অত্যন্ত শীতল এবং শুষ্ক। বাতাসের গতি প্রায়ই খুব বেশি থাকে। অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলা বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আবাসস্থল। এখানে এমপেরর, অ্যাডেলি এবং চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন সর্বাধিক দেখা যায়। এলিফ্যান্ট সিল, লিয়োপার্ড সিল এবং ওয়েডেল সিল দেখলে সবার মন সত্যিই ভালো হয়ে যাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির তিমি এখানকার সমুদ্রে বাস করে। পাখিদের মধ্যে অ্যালবাট্রস, পেট্রোল এবং স্কুয়া এখানকার আকাশে উড়ে বেড়ায়।
-676678d7cc4ea.jpeg)
পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুতগতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে বরফ গলছে। সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রাণীদের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলা বিজ্ঞানীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র। এখানে জলবায়ু পরিবর্তন, মহাসাগরবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণা করা হয়। এখানে আমরা পেঙ্গুইন দেখে এবং বরফের ওপর হাঁটতে হাঁটতে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছি আজ সারা দিন।
-676678eb715cd.jpeg)
মূলত অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন বিজ্ঞানীরা।পেনিনসুলার অত্যন্ত কঠিন পরিবেশ সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র এখানে রয়েছে। এ অঞ্চলটি তার প্রতিকূল পরিবেশের কারণে পৃথিবীর জলবায়ু এবং পরিবেশ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।
পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলা দ্রুতগতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এ অঞ্চলটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়; যা পুরো পৃথিবীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। অ্যান্টার্কটিকার বরফের কোরগুলিতে পৃথিবীর অতীতের জলবায়ু সম্পর্কিত মূল্যবান তথ্য সংরক্ষিত আছে। এ তথ্য বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর!
-67667919df983.jpeg)
অ্যান্টার্কটিকা মহাসাগর পৃথিবীর জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এ অঞ্চলে মহাসাগরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং স্রোতের ওপর গবেষণা করা হয়। গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ হচ্ছে বরফের গলন, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি, মহাসাগরের অম্লতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এ ছাড়া পেঙ্গুইন, সিল এবং অন্যান্য সমুদ্রিক জীবের আচরণ, জনসংখ্যা এবং জীবনচক্র সম্পর্কিত গবেষণাও বিজ্ঞানীরা করে থাকেন। মহাসাগরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, স্রোত এবং সমুদ্রের বরফের পরিমাণ সম্পর্কিত গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র এ অঞ্চল। অ্যান্টার্কটিকায় ভূতাত্ত্বিক গঠন, প্লেট টেকটনিক্স, খনিজ সম্পদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা রাতদিন কাজ করে থাকেন।
বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি এবং পদ্ধতি ব্যবহার করে অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলায় গবেষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে বরফের কোর নমুনা সংগ্রহ। অতীতের জলবায়ু সম্পর্কে তথ্য পেতে এ পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়। সমুদ্রের জলের নমুনা সংগ্রহ করা হয় মহাসাগরের রাসায়নিক গঠন এবং জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে তথ্য পেতে। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে বরফের পরিমাণ, মহাসাগরের বরফের পরিমাণ এবং ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার জন্য গবেষণা করা হচ্ছে নিয়মিত।
অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলায় করা গবেষণা পুরো পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ গবেষণার মাধ্যমে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মহাসাগরের পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। এ তথ্য আমাদের ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।
-6766793f3e7cc.jpeg)
পেনিনসুলা ভ্রমণ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে এক বছর ধরে। হঠাৎ মনে চাইলেই এ পেনিনসুলা ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। এ মহাদেশে ভ্রমণ করা মানে হলো এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যা এক জীবনে একবার পাওয়া যায়। তবে এ অঞ্চল ভ্রমণের আগে সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চ। এ সময় আবহাওয়া অন্যান্য সময়ের তুলনায় উষ্ণ থাকে এবং দিনের দৈর্ঘ্যও বেশি হয়। আরও একটি বিষয় খুব জরুরি। তা এই যে, অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণের জন্য শারীরিকভাবে অবশ্যই পরিপূর্ণ সুস্থ ও সক্ষম হওয়া জরুরি। হাঁটা, দৌড়ানো বা জিম করার মতো নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস থাকতে হবে।
অ্যান্টার্কটিকার আবহাওয়া গ্রীষ্মকালেও অত্যন্ত শীতল। তাই ভ্রমণের সময় উষ্ণ পোশাক, ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট, গ্লাভস, টুপি এবং ভালো মানের বুট থাকা প্রয়োজন। অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণের জন্য একটি ভালো ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স নেওয়া জরুরি। এ বীমা যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা করে থাকে। এখানকার পরিবেশ খুবই সংবেদনশীল। সে কারণে এখানে ভ্রমণের সময় পরিবেশের যত্ন নেওয়া খুবই জরুরি। পরিবেশ দূষণ না করার বিষয়ে এখানে অনেক কঠিন কিছু নিয়ম সবাইকে মেনে চলতে হয়। এ অঞ্চল ভ্রমণ শেষে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আপনাআপনি সবাই উদ্বুদ্ধ হন বলে ভ্রমণ শেষে তাদের জীবনে কিছু না কিছু পরিবর্তন এসে থাকে।
আগামী পর্বে
অ্যান্টার্কটিকা পেনিনসুলায় তিমির রাজ্যে ঘোরাঘুরি এবং এ অঞ্চলের আট ধরনের পেঙ্গুইন দেখা
লেখক : জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর