হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:০৮ পিএম
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:২৫ পিএম
দেশজুড়ে বইছে এখন উত্তরের হিমেল হাওয়া। প্রকৃতি গাইছে পাতা ঝরার গান। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনযাপনে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। দেশ ঘুরে তারই কিছু ফ্রেম যাদুকাটার পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন আরিফুল আমিন
হেমন্তের ধান কাটা উৎসব শেষে শীত আসে। অনেকটা ধীর পায়ে শীত জেঁকে বসে গাঁয়ে ও নগরে। কোথায় কোন দূর পাহাড়ে এর জন্ম! সহস্র মাইল উত্তরের দেশ থেকে আগমন। ঠিক অতিথি নয়, আমাদের প্রকৃতিতে রেখে যায় আলাদা একটা ছাপ।
তীব্র শীতের প্রকোপ নিয়ে একটি প্রবাদ আছে, ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’। অবশ্য রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, ‘বহে মাঘমাসে শীতের বাতাস-’ তবে এ বছর শীত মাঘের অপেক্ষা করেনি। একটু আগামই এসে পড়েছে। যেহেতু শীতের চাকা ঠেলে অন্যদিকে ধাবিত করানো সম্ভব নয়, তাই শীতবাস্তবতা উজিয়ে কুয়াশা ঢাকা আলপথ মাড়িয়ে কৃষককে যেতে হচ্ছে কাজে। থেমে নেই জীবন।
ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে কোদাল ও মই হাতে মাঠে যাচ্ছেন এক কৃষক
কাকভোর থেকে তারা নেমে পড়ছে মাঠে জীবিকার প্রয়োজনে। মাথায় মাফলার জড়িয়ে রাখাল মাঠে গরু চরাচ্ছে। জেলেরা মাছ ধরছে, নিকারিরা তা বিকিকিনি করছে এ হিমেল হাওয়া গায়ে লাগিয়েই। চালক খুব ভোরে শীতের সবজিভরা ভ্যান ঠেলে যাচ্ছে গঞ্জে, শহরে। বাঙালির শীতযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ঠিলা ভরা খেজুর রস ও ধোঁয়াওঠা পায়েস। তাই গাছি ভাইয়েরাও ব্যস্ত খেজুর গাছ থেকে রস জোগাড় করতে। তারপর সেই রস জ্বাল দিয়ে বানানো হচ্ছে গুড়। যতই ঠান্ডা নামুক, পিঠা-পায়েস তৈরির এ উপকরণ সংগ্রহ করতেই হবে। মানুষের পাশাপাশি শীতে কাবু প্রাণিকুল। কনকনে ঠান্ডা, তাই গাছের ডালে অলস বসে আছে পাখি।
কনকনে শীতে মাঠের মধ্যে বসে দুই কৃষক ধানের নাড়ার আগুন পোহাচ্ছেন
এ হিমশীতলতার মধ্যেও কীভাবে যেন হঠাৎ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে প্রকৃতি। রুপালি শিশিরের পরশ মেখে সতেজ হয়ে উঠেছে সবজির বাগান। লাউ মাচার লতাটা ছুঁতে চায় আকাশটা। শীতে ভেজা অরণ্যের ফুলগুলো নজর কাড়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের। ফসলি জমিন যেন হয়ে ওঠে পটে আঁকা কোনো শিল্পীর চিত্রকর্ম। সকালের কুয়াশা ঠেলে দিগন্ত রোদে ঝলমলে হয়ে ওঠার অপেক্ষায় কিশোর-কিশোরী। আলোর মুখ দেখলেই ছোটদের মধ্যে একটা উৎসব উৎসব ভাব ফুটে ওঠে। শুধু ছোটরাই নয়, সূর্যের মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকেন বয়সিরাও। জমির আলে জড়ো করা নাড়া জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছেন কৃষক ভাইয়েরা।
তীব্র শীতের সকালে একদল শিক্ষার্থীকে নিয়ে মাদ্রাসায় যাচ্ছেন ভ্যানচালক
ঋতু বৈচিত্র্যের এই দেশে শীত যেন পৃথক এক সৌন্দর্য। অনন্য এক রূপমাধুর্যে ভরা ঋতু। দিগন্ত এখন হলুদ রঙের দখলে। মাঠের পর মাঠ সরিষা ফুলের হলুদ প্রলেপে ছেয়ে যায়। মৌমাছি উড়ে বেড়ায় ফুলে ফুলে। শীতকালে বৃষ্টিবাদল তেমন একটা হয় না বলে মৃৎশিল্পীরাও ব্যস্ত থাকেন এ সময়। একদা উত্তরের বরেন্দ্র জনপদে মাটির বাড়ি খুব জনপ্রিয় ছিল। তখন ঘরামিরা শীতকালেই মাটির বাড়ি তৈরি করতে ব্যস্ত সময় কাটতেন। এখন মাটির বাড়ি তৈরির প্রচলন কমলেও ঘর নির্মাণের ইট তৈরিতে ব্যস্ত ভাটার শ্রমিকরা।
ঢেঁকিতে চালের গুঁড়ো তৈরি করছেন দুই নারী
আমাদের দেশে প্রতিটি ঋতুকেই বরণের জন্য উৎসব যাপন করা হয়। আহার-বিহারে ভোজনরসিক বাঙালির কাছে এ ঋতুটি একটি মাহেন্দ্রক্ষণ। সকালে ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে। চলে পিঠা উৎসব। শিরীষ পিঠা, পাকন পিঠা, ভাপা পিঠা, ম্যারা পিঠা আরও কত যে নামের পিঠা তৈরি করেন গ্রামীণ নারীরা।
আড়তে টমেটোর স্তূপ গড়ে তুলেছেন এক চাষী
এসব পিঠা খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমন নজরকাড়া এর গঠন। শীত অনেকটা বার্ষিক উৎসবের মতো। তাই শীত পাড়ি দিতে থাকে আগাম প্রস্তুতি। কি গ্রামে-নগরে শীত নিয়ে দেশের পেশাজীবীরা পসরা খুলে বসেন। দেশের উত্তরÑপূর্বাঞ্চলের হাওর-বিল দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে অতিথি পাখির আগমনে।
হিমেল বাতাসের মধ্যেও ঘোড়দৌড়ে ব্যস্ত দুই কিশোর
একটু কাব্য করে বলা যায়, হরেক রঙের পাখির পালকে ভর করে শীত নামে আমাদের এ জনপদে। এ সময় শিশু-কিশোরদের পড়াশোনার চাপও একটু কম থাকে। শীতের দিনগুলোয় অনুষ্ঠিত হচ্ছে নানান গ্রামীণ উৎসব, খেলাধুলা। বাচ্চারা মজে আছে গোল্লাছুট, ঘোড়দৌড়সহ নানান খেলায়।
কুয়াশার চাদরে ঘেরা ক্ষেতের আইল ধরে যাচ্ছেন এক চাষী
হাড় কাঁপানো এ শীতসংক্রান্তিতে কুয়াশার কুহকে জড়ানো থাকে কত যে গল্প। আনন্দ উৎসবের পাশাপাশি শীত অনেকটাই নীরব করাত। যে করাতে চিড়ে ক্ষত হয় ছিন্নমূলদের মানবশরীর! চোখের তারায় স্থায়ী ছাপ রেখে যায় একটু উষ্ণতার জন্য কাঁপতে থাকা অশীতিপর মানুষটির।