বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে-১০
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:১৫ এএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৩৬ এএম
ছবি : লেখকের সৌজন্যে
পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তের মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশাল এ নির্জনতম মহাদেশ ভ্রমণে রয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি। সফরে থাকা মহসিনুল হক অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকের জন্য নিয়মিত তুলে ধরছেন। আজ থাকছে দশম পর্ব।
অ্যান্টার্কটিকার দ্বারপ্রান্তে একটি বিস্ময়কর দ্বীপ এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড। এ দ্বীপে অবতরণের সময় আবহাওয়া বিরূপ থাকায় আমরা সেই দ্বীপে নামতে পারিনি। তবে দ্বীপের চারপাশ দিয়ে আমাদের জাহাজ ঘুরেছে।

আজ অ্যান্টার্কটিকায় আমরা জডিয়াকে (ছোট নৌকা) চড়ে ঠিক এমনই এক দ্বীপ ট্রিনিটি দ্বীপের চারপাশের হিমশীতল সৌন্দর্য অনুভব করার চেষ্টা করেছি। ট্রিনিটি দ্বীপ মূলত অ্যান্টার্কটিকার একটি ক্ষুদ্র অংশ। যেখানে প্রকৃতির নিখুঁত সৌন্দর্য এবং কঠিন পরিবেশ একসঙ্গে বিরাজ করছে। এ দ্বীপটি তার অসাধারণ বরফের ভূদৃশ্য, বিচিত্র প্রাণিজগৎ এবং গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

ট্রিনিটি দ্বীপ সম্পূর্ণরূপে বরফে আচ্ছাদিত। সারা বছর তুষারপাত এবং হিমবাহের গতিবিধি এ দ্বীপটিকে একটি চলমান ভূদৃশ্যে পরিণত করে। এ দ্বীপে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পাখি, সিল এবং পেঙ্গুইন বাস করে। বিশেষ করে এমপেরর পেঙ্গুইনরা এ দ্বীপে বড় সংখ্যায় বাস করে।

অ্যান্টার্কটিকার অন্যান্য অংশের মতো ট্রিনিটি দ্বীপও বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। তারা এখানে জলবায়ু পরিবর্তন, মহাসাগরের পরিবেশ এবং প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত গবেষণা করেন।
অতি নিম্ন তাপমাত্রা, প্রবল বাতাস এবং সীমিত খাদ্য সরবরাহ এ দ্বীপটিকে মানুষের বসবাসের জন্য অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। ট্রিনিটি দ্বীপে ভ্রমণ করা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এ দ্বীপে যাওয়ার জন্য বিশেষ অনুমতি এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। তবে পুরো অ্যান্টার্কটিকা একটি সংরক্ষিত এলাকা। এখানে ভ্রমণের সময় বিশেষ কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ভ্রমণের সময় পরিবেশের যত্ন নেওয়া এবং স্থানীয় প্রাণীদের বিরক্ত না করার একটি নির্দেশনা কর্তৃপক্ষ সব সময় স্মরণ করিয়ে দেন।

অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণকারী ক্রুজ জাহাজগুলো প্রায়ই বিভিন্ন দ্বীপে যাত্রীদের নিয়ে আসে। যাত্রীরা এসব দ্বীপে নেমে পেঙ্গুইন, সিল এবং অন্য প্রাণীদের কাছ থেকে কয়েক মিটার দূরত্ব থেকে দেখতে পারেন।

অ্যান্টার্কটিকা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা মহাদেশ। তাই এখানে যাওয়ার জন্য বিশেষ ধরনের পোশাক এবং জুতা প্রয়োজন। এ পোশাক ঠান্ডা, বাতাস এবং তুষার থেকে রক্ষা করে।

অ্যান্টার্কটিকায় তাপমাত্রা -৮৯ (মাইনাস ঊননব্বই) ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। সাধারণ পোশাকে এ ঠান্ডায় কেউ রক্ষা পায় না।
এ ছাড়া অ্যান্টার্কটিকায় বাতাসের গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এ বাতাস যেকোনো মানুষের শরীরের তাপমাত্রা খুব দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। অ্যান্টার্কটিকা সম্পূর্ণরূপে বরফে ঢাকা। তুষার মানুষের পোশাক ভিজিয়ে দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলতে পারে। সেজন্য বিশেষ পোশাক পরিধান ছাড়া অ্যান্টার্কটিকায় নামা যায় না।
এখানে ওয়াটারপ্রুফ এবং ইনসুলেটেড বুট ছাড়া হাঁটাচলা অসম্ভব। অ্যান্টার্কটিকার প্রায় সর্বত্রই বরফ এবং পানি রয়েছে। তাই আমাদের ওয়াটারপ্রুফ এবং ইনসুলেটেড জুতা ভাড়া নিতে হয়েছে। বরফে না ফসকে যাওয়ার জন্য এসব জুতায় ভালো গ্রিপ রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকার বরফে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে মানুষের চোখে ক্ষতি করতে পারে। এজন্য সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষা করতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হয়। অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হলো অ্যান্টার্কটিক গ্রীষ্মকাল; যা সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে হয়। এ সময় আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ থাকে, বরফ গলে যায় এবং দিনগুলো লম্বা হয়।

এ সময়ই অ্যান্টার্কটিকায় বিভিন্ন প্রজাতির পেঙ্গুইন, সিল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক পাখির বাসা বাঁধার এবং বাচ্চা দেওয়ার মৌসুম। তাই এ সময়ে প্রাণীদের খুব কাছ থেকে দেখতে পাওয়া যায়।
জাহাজে মজার মজার ঘটনার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আমাদের ভ্রমণকারী দলের একজনের নাম আমরা দিয়েছি জেন্টু পেঙ্গুইন। আরেকজনের নাম দিয়েছি হানি বা মধু। এ ছাড়া জাহাজের বিভিন্ন স্টাফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন যাত্রীকে আমরা বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য নানা ধরনের হাস্যাত্মক কর্মসূচি পালন করি প্রতিনিয়ত। কারও সঙ্গে দেখা হলে বলি আজ তুমি কেমন আছো! উত্তরটা আমরা নিজেরাই শিখিয়ে দিই। তাকে বলি বলো, আমি ভালো আছি। এটা শুনে বিদেশিরা হাসতে হাসতে বলে, আমি ভালৈ আছি! এ রকম প্রচুর আনন্দের মধ্য দিয়ে জাহাজে চতুর্দশ দিন আমরা অতিবাহিত করলাম।
আগামী পর্ব
অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলার অপার সৌন্দর্য, পৃথিবীর সর্বদক্ষিণের অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের বিচিত্র জীববৈচিত্র্য
লেখক : জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর