রাফিয়া তাহসিন ইথিকা
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৪৩ পিএম
এ সুন্দর ছবিটি এঁকেছে আফরীন জামান নেহা। সে রাজশাহী সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী
ডিসেম্বর এলেই মনের ভেতর যেন আনন্দের ঘণ্টা বেজে ওঠে। পরীক্ষা শেষ। কী আনন্দ! অনেক দিন পর নানির বাড়ি যেতে পারব। বড় মামা-মামি, ছোট খালামণি-খালু, মামাতো ভাই-বোন, খালাতো ভাই সবাই আসবে। সবাই একসঙ্গে নানির বাড়ি যাওয়া মানেই শীতের পিকনিক, আড্ডা, মজা, হইহুল্লোড় এবং প্রচুর পিঠাপুলি খাওয়া। অবশেষে যাওয়ার দিন এসে গেল। আমি, মা, বাবা, ছোট ভাই সবাই বাসে চেপে রওনা দিলাম চাঁপাইয়ের উদ্দেশে। বাস থেকে নেমে খানিকটা পথ যেতে হয় ভ্যানে।
ভ্যানওয়ালা মামা পরিচিত। ব্যাগপত্তর দেখে তিনিও বুঝে গেছেন এই পুরো মাস আমরা নানিবাড়ি ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না। নানিবাড়ি পৌঁছানোর পর দেখলাম, বড় মামা-মামি, ছোট খালামণি-খালু, মামাতো-খালাতো ভাই-বোন সবাই এসেছে। আমি আর আমার ছোট ভাই আগেই দৌড়ে গিয়ে নানিকে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর খোঁজ করতে লাগলাম ছোট মামার। পড়াশোনা শেষ করেছে চার বছর হলো। গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করছে। ছোট মামা আমাদের ও গ্রামের মানুষের কাজে লাগে এ রকম বেশ কিছু যন্ত্র বানিয়েছে। সেগুলো দেখতে একটু উদ্ভট হলেও বেশ দরকারি। দেয়ালে দেখলাম একটা যন্ত্র ঝোলানো আছে, দেখতে অনেকটা ইঁদুরের মাথার মতো। নানিকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওটার মাধ্যমে ঘরে তাপমাত্রা মাপা যাবে, আবার বেশি গরম বা ঠান্ডা লাগলে এমনিতে তাপমাত্রা সহনীয় হয়ে উঠবে। দেখেই বুঝতে পারলাম ছোট মামার কাজ। আরও বুঝতে পারলাম, মামা এখন নিশ্চয়ই কোনো কিছু আবিষ্কারের কাজে ব্যস্ত আছে।
নানি বললেন, ‘তোদের জন্য অনেক পিঠা বানিয়ে রেখেছি। হাতমুখ ধুয়ে তোরা খেতে আয়। মনে যেন আজ খুশির বন্যা বইছে। খাবার টেবিলে দেখলাম রাখা আছে পায়েস, তেলের পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি, দুধচিতই আর মন্টু চাচার দোকানের চমচম। চমচম দেখে আমি বললাম, ‘সে কি! ছোট মামা তো আজ ঘর থেকে বেরই হলো না। চমচম এলো কোথা থেকে?’ নানি বললেন, ‘তোরা আসবি দেখে গতকালই তোদের মামা এনে রেখেছিল। আর বলিস না কী নিয়ে যে এত ব্যস্ত, আমি নিজেই গতকাল রাত থেকে তার দেখা পাইনি। টেবিলে মজার খাবার দেখে মামাতো ভাই পিকলু বলে উঠল, ‘আজকে সব খাবার আমি একাই শেষ করব।’ শুনে সবাই হেসে উঠলাম। একটু পর ছোট মামা এলো। তাকে চিনতে পারছি না। বড় বড় দাড়ি আর লম্বা লম্বা চুল। আমাদের দেখে মামা এক ঝলক হাসি দিল।
বড় মামা জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর এ অবস্থা কেন?’ ছোট মামা বলল, ‘আর বোলো না বড়দা। একটা আবিষ্কার নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। মা জিজ্ঞাসা করল, ‘তা কাজ শেষ হলো তো, নাকি?’ ছোট মামা বলল, ‘হ্যাঁ, কাজ শেষ। এখন যন্ত্রের কাজ কেমন হবে সেটা জানি না।’ আমার ছোট ভাই বলল, ‘আরে আমার ছোট মামুর আবিষ্কার বলে কথা। তার কাজ ভালো হবে না তো কার হবে!’ এটা শুনে ছোট মামার আত্মবিশ্বাসটা যেন আরেকটু বেড়ে গেল। কিন্তু মামার আবিষ্কারটা এখনও আমরা দেখতে পেলাম না। নানি বড় বড় হাঁড়িপাতিল সব ধুয়ে রেখেছিলেন। বড় মামা আর ছোট মামা বাজার থেকে মসলা, সবজি কিনে আনলেন। আমি আর মামাতো বোন ইতু আপু মিলে সবজিগুলো কেটে দিলাম। মা, বড় মামি আর ছোট খালামণি রান্না শুরু করলেন। বাবা আর ছোট খালু মিলে বাগান থেকে বড় বড় কলাপাতা কেটে এনেছিলেন। রান্না শেষ করে বড় মামি কলাপাতায় খাবার পরিবেশন করলেন। এই প্রথম আমি কলাপাতায় খাবার খাচ্ছি। শীতের মিষ্টি রোদ। সেই সঙ্গে খোলা পরিবেশে বসে আছি। এদিকে ছোট মামা হঠাৎ ছাদে এসে একটা ড্রোন ওঠাতে লাগল এবং বলল, ‘এই হলো আমার আবিষ্কার। এ ড্রোন এখন থেকে আমাদের সব আনন্দের স্মৃতিগুলো ধরে রাখবে।’ সত্যি পরিবারের সঙ্গে পিকনিক করার মজাই আলাদা, আর যদি সেটা শীতকালে হয় তাহলে তো আর কথাই নেই।
অষ্টম শ্রেণি, সরকারি প্রমথনাথ বালিকা, উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী