বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে-৮
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৬:০৪ পিএম
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৬:৪৯ পিএম
দক্ষিণ মহাসাগরে বিজয় দিবস উদ্যাপন
পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তের মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশাল এ নির্জনতম মহাদেশ ভ্রমণে রয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি। সফরে থাকা মহসিনুল হক অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকের জন্য নিয়মিত তুলে ধরবেন। আজ থাকছে অষ্টম পর্ব
আগে থেকেই জানা ছিল এবার ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ আমাদের বিজয় দিবস কাটবে অ্যান্টার্কটিকাগামী জাহাজে। নির্দিষ্ট দিনে আমাদের জাহাজের অবস্থান ছিল সাউথ জর্জিয়া পেরিয়ে অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি স্থানে। শিডিউল বলছে এ দিন জাহাজ কোথাও নোঙর করবে না। ফলে সারা দিন আমরা থাকব জাহাজবন্দি।
জাহাজের ক্যাপ্টেন অ্যাডাম বার্ক সেজেছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড মাথায় দিয়েএ সুযোগে সকালেই শুরু হয় আমাদের বিজয় দিবস পালনের প্রস্তুতি। জাহাজের ক্যাপ্টেন অ্যাডাম বার্কের সঙ্গে কথা বলে আমরা ঠিক করলাম মধ্যাহ্নভোজের পর শুরু হবে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান। প্রস্তুতি আগে থেকে নেওয়াই ছিল। বাংলাদেশ থেকে সবাই ঠিক করে রেখেছিলাম কীভাবে হবে এ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান।

শুরুতেই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা দিয়ে আমরা সাজিয়ে ফেললাম জাহাজের মিলনায়তন। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে সাগরমাঝে আমরা নতুন করে অনুভব করলাম, বিজয় দিবস আমাদের জন্য কতটা আনন্দের।
-67629d03a7391.jpeg)
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে তা দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করার মধ্য দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম।
-67629dac517b3.jpeg)
অনুষ্ঠান শেষে ২৭ জন বাংলাদেশির গ্রুপ ছবি তোলা হয়। বিজয় দিবসের এ আনন্দময় দিনে রাত অবধি আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বাংলাদেশের অকুতোভয় বীর যোদ্ধাদের। এ দিন জাহাজ যেন হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ।
দক্ষিণ মেরু আবিষ্কার পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম স্থানগুলোর একটি। কঠিন আবহাওয়া, অসহ্য ঠান্ডা আর বিশাল বরফের চাদর এ অঞ্চল অনেকের কাছে অপ্রাপ্য করে রেখেছিল। তবু মানুষের অভিযানের ইতিহাসে এ অঞ্চল এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। একসময় মানুষের কল্পনাতীত এ অঞ্চলে পৌঁছে যায় সাহসী মানুষের ক্যারাভান। তাদের মধ্যে প্রথম দক্ষিণ মেরু অতিক্রমকারীদের কথা আজও স্মরণ করা হয়।
রোনাল্ড আমুন্ডসেন ছিলেন এক অভিযানের নেতা। এ রোনাল্ড আমুন্ডসেন নামটি দক্ষিণ মেরু অভিযানে প্রথম অভিযাত্রী হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। নরওয়েজিয়ান এ অভিযাত্রী ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রথম মানুষ হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেন। তার এ অভিযান ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। অতি নিম্ন তাপমাত্রা, প্রচণ্ড ঝড় আর খাদ্য সংকটের মধ্যেও আমুন্ডসেনের দল ধৈর্য ধরে লক্ষ্যে পৌঁছায়।
দক্ষিণ মেরু অভিযান শুধু ভৌগোলিক ছিল না। এটি ছিল মানব সাহস, ধৈর্য এবং বিরুদ্ধ প্রকৃতি মানিয়ে নিয়ে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার এক মহান গল্প। আমুন্ডসেনের দলকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় প্রচণ্ড ঠান্ডার কথা। দক্ষিণ মেরুতে তাপমাত্রা অনেক সময় -৫০ (মাইনাস পঞ্চাশ) ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। দ্বিতীয়ত. অন্ধকারে বরফের ঝড়ে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে সব সময়।
তৃতীয়ত. দীর্ঘ যাত্রায় খাদ্যের অভাব এক বড় সমস্যা। চতুর্থত. কঠিন পরিশ্রমের কারণে শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়া ছিল স্বাভাবিক। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এক ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছিল আমুন্ডসেনের ঘরে। তবে এ অভিযানটিতে শুধু এক ব্যক্তির সাফল্য ছিল না; এটি ছিল মানবসভ্যতার বিশাল সাফল্য। এ অভিযান প্রমাণ করেছিল মানুষ অসম্ভব সম্ভব করে তুলতে পারে। আমুন্ডসেনের এ সাহসী পদক্ষেপ আজও অনুপ্রেরণার উৎস।
আমুন্ডসেনের এ অভিযানের ফলে আমরা দক্ষিণ মেরু সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেরেছি। এ ছাড়া এ অভিযান মানুষের মধ্যে অনুসন্ধানের চেতনা জাগিয়ে তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমুন্ডসেন পৃথিবীর সব মানুষের কাছে সাহসিকতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, আরেক অভিযাত্রী রবার্ট ফ্যালকন স্কট দক্ষিণ মেরুর অভিমুখে আমুন্ডসনের ঠিক কাছাকাছি সময়ে মহাকাব্যিক অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে স্কট সাহেব আমুন্ডসেনের থেকে প্রায় ৬০ মাইল পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু এমন হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল আমুন্ডসেন উত্তর মেরুতে যাবেন আর স্কট সন্ধান করবেন দক্ষিণ মেরুর। উত্তর মেরুতে ইতোমধ্যে পিয়েরি পৌঁছে গেছেন শুনে আমুন্ডসেন তার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেন আর বিশাল লটবহর নিয়ে অতি দ্রুততার সঙ্গে যাত্রা করেন দক্ষিণ মেরু অভিমুখে। লক্ষ্য একটাই, যে করেই হোক প্রথম মানুষ হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে তার পৌঁছনো দরকার। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক উপযুক্ত সরঞ্জাম আর অকুতোভয় মনোবলের বদৌলতে সত্যিই তিনি দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছে যান। সেখানে নরওয়ের পতাকা উত্তোলন করেন এবং স্কটের জন্য কিছু খাবার আর একটি চিঠি লিখে রাখেন। চিঠিতে বলেন, ‘প্রিয় স্কট, আমি জানি অতিসত্বর আপনি এখানে এসে পৌঁছবেন। আপনাকে আগাম অভিনন্দন জানাই। জানি না আমি নিরাপদে দেশে ফিরতে পারব কি না। যদি ফিরতে না পারি তাহলে দয়া করে আমাদের মহামান্য রাজাকে এ সংবাদ পৌঁছে দেবেন যে, আমরা সফলভাবে দক্ষিণের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি।’
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আমুন্ডসেন নিরাপদে দেশে পৌঁছতে পারলেও দেশে ফিরতে পারেননি রবার্ট স্কট। অবর্ণনীয় দুর্বিপাক ও দুর্ভোগের শিকার স্কট মারা যান ২৯ মার্চ, ১৯১২ সালে। এর মাস দেড়েক আগে ১৭ জানুয়ারি তিনিও দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেন।
প্রথম মানুষ হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছোনোই স্কটের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। রয়াল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটির সদস্য হিসেবে তিনি সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করতেও তৎপর ছিলেন। তার সংগৃহীত ফসিল থেকেই প্রথম জানা যায় অ্যান্টার্কটিকায় একসময় উদ্ভিদ জন্মাত এবং এ বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড অন্য মহাদেশের অংশ ছিল।
কিন্তু এ কৃতিত্বই রবার্ট ফ্যালকন স্কটের আসল কৃতিত্ব নয়। তার অবদান অন্য জায়গায় এবং অন্য কোথাও। তার আসল পরিচয় তিনি এক অনন্য মানুষ। প্রকৃত দলনেতা আর নিপাট প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন। অভিযানের এক পর্যায়ে তাদের খাবার ফুরিয়ে আসে। জুতা ও শীতবস্ত্র পচে-ছিঁড়ে যায়। স্লেজ টানার প্রতিটি কুকুর মারা যায়। কিন্তু সামনে বিস্তর দুর্গম পথ। এর মধ্যেই দেখা দেয় প্রচণ্ড তুষারঝড়। ঘোর অন্ধকার নেমে আসে চারদিকে। তবু তারা সামনে চলছিলেন খাবারহীন, শক্তিহীন ও আশ্রয়হীন অবস্থায়। শুধু অদম্য মনোবল বুকে নিয়ে তার দল এগিয়ে গেছে। পথে ইভান্স ও ওটস নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়েন মৃত্যুর কোলে। তখনও সর্বশক্তি দিয়ে সামনে হাঁটছেন স্কট ও তার সহযোগী উইলসন আর বাওয়ার্স। পথে ঘোরের মধ্যে যেনতেনভাবে তাঁবু ফেলেন স্কট ও তার সাথিরা। সংগ্রহে কোনো খাবার নেই। খাবার সংগ্রহের শক্তিও নেই। বাঁচার কোনো আশা নেই। তবু সঙ্গীদের জন্য স্কটের কি ভালোবাসা! কি শ্রদ্ধা!
জীবন্মৃত্যুর এ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্কট তার সঙ্গী উইলসনের স্ত্রীকে চিঠি লিখছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘শ্রদ্ধেয় মিসেস উইলসন, যতদিনে এ চিঠি আপনার হাতে পৌঁছবে ততদিনে আমি আর উইলসন না-ফেরার দেশে চলে যাব। আমরা মৃত্যুর খুব কাছে চলে এসেছি। কিন্তু আপনাকে না জানিয়ে পারছি না। শেষ দিন পর্যন্ত কি অসাধারণ মানুষ ছিলেন আপনার স্বামী উইলসন। মৃত্যুমুখেও অফুরান প্রাণের উৎস ছিলেন তিনি। অন্যের ন্যূনতম সুবিধার জন্য জীবন দিতেও ছিলেন তৎপর। এ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের জন্য তিনি একবারও আমাকে দোষারোপ করেননি বা কারও বিরুদ্ধে অনুযোগ জানাননি। কোনো সান্ত্বনা নয়, আপনাকে শুধু এটাই জানাতে চাই যে প্রিয় বন্ধু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবেন বীরের মতো। জীবনে যেমন ছিলেন অকুতোভয় মৃত্যুতেও তেমন থাকবেন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্মান। আমার হৃদয় নিংড়ানো সমবেদনা জানবেন।’
কাঁপা হাতে জীবন্মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্কট শুধু মিসেস উইলসনকেই চিঠি লিখে থেমে থাকেননি। তিনি চিঠি লিখেছেন তার মাকে, স্ত্রীকে, বাওয়ার্সের মাকে, রয়াল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটির সভাপতিকে এবং ইংল্যান্ডের সাধারণ জনতাকে উদ্দেশ করে। স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে তাদের সন্তান একদিন বড় প্রকৃতিবিদ হয়ে উঠবেন। জনতার উদ্দেশে তিনি বলেছেন মানুষকে ভালোবাসতে আর বীরের মতো বেঁচে থাকতে।
ক্যাপ্টেন রবার্ট স্কটের জীবন ও মরণেও আমরা দেখেছি এ ভালোবাসা আর বীরত্বের দ্যুতি! দীর্ঘ আট মাস পর জীর্ণশীর্ণ এক তাঁবুতে দেখা যায় তারা নিস্তেজ নিথর পড়ে আছেন। স্কটের স্লিপিংব্যাগে জড়োসড়ো শুয়ে আছেন বাওয়ার্স ও উইলসন। পাশে স্কট। স্লিপিংব্যাগ ছিল ছিন্নভিন্ন। তার পা ছিল জুতাশূন্য। তার একটি হাত উইলসনের বুকের ওপর। যেন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন অথবা গরম কাপড়টা আর একটু টেনে দিচ্ছেন প্রিয় বন্ধুর জন্য এবং প্রকৃত বীরের জন্য।
সেই জীর্ণ তাঁবুতে সেদিন আরও পাওয়া যায় ৩০ পাউন্ড ওজনের বিবিধ জীবাশ্ম ও পাথরের নমুনা। আর স্কটের বুক পকেটে আমুন্ডসেনের চিঠি ও টেনিসনের কাব্যগ্রন্থ। এসব ইতিহাস পড়ে আমাদের হৃদয়জুড়ে জায়গা করে নিয়েছেন দক্ষিণ মেরু আবিষ্কারের এসব মহান অকুতোভয় বীর!
আগামী পর্বে
ড্রেক প্যাসেজ সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্য এবং জাহাজে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কিছু কথোপকথন
লেখক : জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর