মহসিন মোল্যা, শ্রীপুর (মাগুরা)
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:০৭ পিএম
মা রহিমা বেগমের সঙ্গে মুত্তাকিন বিল্লাহ। প্রবা ফটো
মৃত্যুর দুই দিন আগে গত ১৮ জুলাই বিকালে মা রহিমা বেগমের সঙ্গে মোবাইলে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল মুত্তাকিন বিল্লাহর। রহিমা বেগম ফোনে ছেলের খোঁজখবর নেন। মুত্তাকিন জানায়, ‘ঢাকায় গোলাগুলি হচ্ছে মা। আমার বুকে ও পায়ে রাবার বুলেট লেগেছে। বুকের পাশে একটু লালচে দাগ হয়েছে। তুমি চিন্তা কোরো না, আমার কিছু হবে না।’ ‘পর দিন বুলেটের ক্ষত নিয়ে ছেলে আবার ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেয়। ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় পুলিশের ছোড়া গুলি মুত্তাকিনের মাথায় লাগে। আমার বুক খালি করে আমার সন্তান পরপারে চলে গেছে। আমার ছেলে কুরআনে হাফেজ ছিল। এই বাবা ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব?’ কথাগুলো বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত মুক্তাকিন বিল্লাহর মা রহিমা বেগম।
দীর্ঘদিন রহিমা খাতুন হার্টের রোগে ভুগছে। ছেলে মুতাকিন তার হার্টের চিকিৎসা করাতেন। বাবা আক্কাস আলীর বড় ছেলের বয়স যখন একমাস তখন তার প্রথম স্ত্রী মারা যায়। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর রহিমা খাতুনকে আক্কাস আলী দ্বিতীয় বিয়ে করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমি বড় সন্তানের সঙ্গে থাকি। মুত্তাকিনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ৩ বছরের সন্তান নিয়ে সে আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তার সঙ্গে বর্তমানে আমাদের পরিবারের কোন সম্পর্ক নেই।
সরকারি সহায়তার কথা জানেতে চাইলে তিনি বলেন, জাতায়াতে ইসলামী মাগুরা শাখার পক্ষ থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা, ‘আমরা বিএনপির পরিবার’ নামের সংগঠনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা, এম আর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছি। এর মধ্যে গত নভেম্বর মাসে মুত্তাকিনের স্ত্রীকে ১ লাখ টাকা দিয়েছি।
খোঁজ নিয়ে যানা গেছে, মিরপুর-১ টোলারবাগ এলাকায় বাসা ভাড়া করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতো মুত্তাকিন বিল্লাহ। কিন্তু মুত্তাকিন বিল্লাহর মৃত্যুর পর নানা পারিবাকি বিষয় নিয়ে স্ত্রী নাইমার সাথে পরিবারের সদস্যদের মতবিরোধ চলছে।
মুত্তাকিনের স্ত্রী নাইমা বলেন, অফিস শেষে আন্দোলনে যাবে এটি আমাকে বলে নাই মুত্তাকিন। বেলা ২টার দিকে আমাকে ফোন দিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরে যাই। সেখানে সন্ধ্যা ৭টার দিকে মুত্তাকিনের মাথায় দুইটি গুলি লাগে। এরপর মুত্তাকিনের ফোন দিয়ে অন্য একটি লোক আমাকে ফোন দেয় এবং আমাকে বলে মুত্তাকিনের একটু সমস্যা হয়েছে। আপনি হসপাতালে চলে আসেন।
পরে আমি ইবনে সিনা হাসপতালে যাই। হাসপাতলে যেতে ছাত্রলীগের লোকজন বাঁধা দেয়। পরে মাজার রোডের একটি হাসপতালে আইসিইউতে গভীর রাতে আমার স্বামী মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু গ্রামের বাড়ি বরইচারাই মুত্তাকিনের লাশ দাফনের পর থেকে মুত্তাকিনের মা ও সৎ ভাই (বড় ভাই) আমার সঙ্গে দুর্ব্যাবহার শুরু করে। বাধ্য হয়ে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। গত তিন মাসে একবারের জন্যও তারা কোন খোঁজ নেয়নি তারা। আমাকে ও আমার ছেলেকে আড়ালে রেখে বিভিন্ন সংগঠন থেকে আর্থিক অনুদান ও সহায়তা গ্রহণ করছে।
কথা হয় মুত্তাকিনের বড় ভাই শিহাবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, মুত্তাকিন অন্যায় সহ্য করতে পারতো না। এ কারণে সে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়। মুত্তাকিন ঢাকার মিরপুর ১৪ নম্বর এলকায় ইনোভা ডায়াগস্টিক সেন্টারে চাকরি করতো। আন্দোলন চলাকালে গত ১৮ জুলাই তার বুকে ও পায়ে রাবার বুলেট লাগে। এ খবর পেয়ে আমি মুত্তাকিনকে ফোন দিয়ে বলি এখন আর আন্দোলনে না যেয়ে বাসায় বিশ্রাম নিতে। পর দিন ১৯ জুলাই মুত্তাকিন আন্দোলনে যোগ দিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়।
শিহাবুল আরও জানান, ভাই হত্যার বিচার চেয়ে গত ৩১ জুলাই ঢাকা দায়রা জজ আদালতে শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামী করে ২০০ জনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।তবে মামলার সব আসামীদের নাম বলা সম্ভব না বলে তিনি জানান।
৩ ভাই বোনের মধ্যে মুত্তাকিন সবার ছোট। মুত্তাকিনের স্ত্রীর নাম নাইমা এরিন নিতু তাদের ৩ বছর বয়সি আল নাফিয়ান নামে-একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।
মুত্তাকিনের বড়ভাই বলেন, মুত্তাকিনের লাশ দাফনের পর তার স্ত্রী আমার তিন বছর বয়সি ভাতিজা আল নাফিয়ানকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। সে এখন আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখে না। আমরা চায় মুত্তাকিনের স্ত্রী নাইমা আমার ভাতিজাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসুক। আমরা আমার ভাতিজাকে আমাদের সন্তান হিসেবে মানুষ করতে চাই।
গত ২০ জুলাই মাগুরা শ্রীপুর উপজেলার বরইচরা গ্রামে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে মুত্তাকিন বিল্লাহকে দাফন করা হয়।