বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার পথে : ৫
মহসিনুল হক
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৩১ পিএম
ভ্রমনের ষষ্ঠ দিনে লেখকের গন্তব্য ছিল সাউথ জর্জিয়া দ্বীপ ছবি: লেখক
পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তের মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বিশাল এ নির্জনতম মহাদেশ ভ্রমণে রয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি। সফরে থাকা মহসিনুল হক অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের বাংলাদেশের পাঠকের জন্য নিয়মিত তুলে ধরবেন। আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব।
ভ্রমনের ষষ্ঠ দিনে আমাদের গন্তব্য সাউথ জর্জিয়া দ্বীপ। এটি দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ। এই দ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হল গ্রাইটভিকেন (Grytviken)। আমরা সকল পর্যটক এখানে নামার সুযোগ পাই।
-675e9285e2d82.jpeg)
গ্রাইটভিকেন একসময় ছিল তিমি শিকারের ব্যস্ত কেন্দ্র। এখানে একটা পোস্ট অফিস এবং মিউজিয়াম আমরা পরিদর্শন করি। এছাড়া এই ছোট্ট গ্রামটিতেই বিখ্যাত নাবিক স্যাকেলটনের কবর রয়েছে। যা সাদা ক্রস দ্বারা চিহ্নিত। আমরা সেখানেও গিয়েছিলাম।

আজ আমি অ্যান্টার্কটিকার উত্তরে অবস্থিত সাউথ জর্জিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এই এলাকার বিশাল বন্যপ্রাণী সম্পদ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। বিশেষ করে, সিল, পেঙ্গুইন এবং অ্যালব্যাট্রস, পেট্রোল, স্কুয়াসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি এখানে প্রচুর পরিমাণে দেখতে পেলাম।
-675e91b40de33.jpg)
নাবিক শ্যাকলটনের কবর দেখার পর তার সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করি। তার সম্পর্কে যা জানা যায় তা খুব রোমাঞ্চকর এবং চ্যালেঞ্জিং ঘটনা। জানতে পারলাম আর্নেস্ট হেনরি শ্যাকলটন ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ নাবিক এবং অনুসন্ধানকারী। তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৪ সালে আয়ারল্যান্ডের কিলকেনি কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই স্যাকলটন সমুদ্রযাত্রার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তার এই আগ্রহের কারণে তিনি বৃটিশ নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯১৪ সালে তিনি প্রথম এন্ডুরেন্স নামে অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ মেরু অতিক্রম করা।
-675e9376a25f4.jpeg)
অভিযানের এক পর্যায়ে তার জাহাজ এন্ডুরেন্স অ্যান্টার্কটিকের বরফে আটকে পড়েছিল এবং পরে ভেসে গিয়েছিল। শ্যাকলটন এবং তার দলকে এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। এক সময় তিনি ও তার দল সাউথ জর্জিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তারা আসেন ছোট্ট একটি বোটে করে। শ্যাকলটনের সাউথ জর্জিয়ায় পৌঁছানো একটি অবিশ্বাস্য সাফল্য ছিল। কারণ তিনি এবং তার দল অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও এক মাস বোট চালিয়ে নিরাপদে সাউথ জর্জিয়া উপকূলের একটি হেলিং স্টেশনে পৌঁছাতে সক্ষম হোন। সবাই বেঁচেও ফিরে এসেছিলেন। তার এই অভিযানটি মানুষের সাহস এবং ধৈর্যের অনুপ্রেরণার উৎস।
এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দেয়- যতই কঠিন পরিস্থিতি হোক না কেন মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিটি মানুষের ভেতরেই যথেষ্ট পরিমাণে শক্তি থাকে। এই অভিযানের পরও তিনি অনেক অনেক অভিযান পরিচালনা করেন। তবে ১৯২২ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে শ্যাকলটনের মৃত্যু হলে তাকে সাউথ জর্জিয়ার গ্রাইকভিটেনে সমাহিত করা হয়।
-675e920e4223f.jpeg)
এরপর আমরা গ্রাইটভিকেন এলাকায় হিমবাহ, পাহাড় এবং সমুদ্রের মিলনের একটি অসাধারণ দৃশ্য দেখে ভীষণভাবে অভিভূত হলাম। এই অঞ্চলে বিশাল বিশাল হিমবাহগুলো সমুদ্রের দিকে ধীরে ধীরে সরে চলে। আর উঁচু পাহাড়গুলি যেন এই অঞ্চলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে হাজার গুণ।
-675e924acf340.jpeg)
এই অঞ্চলে পেঙ্গুইন, অ্যালবট্রস, পেট্রোল, স্কুয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি বাস করে। গ্রাইটভিকেনে মানুষের বাস খুবই সীমিত। এখানে মূলত গবেষক, পর্যটক, এবং সংরক্ষণকর্মীরা থাকেন। বিজ্ঞানীরা এখানে জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং অন্যান্য বিষয়ে গবেষণা করেন। পর্যটকরা গ্রাইটভিকেনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। সংরক্ষণকর্মীরা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজে নিযুক্ত থাকেন। প্রকৃতপক্ষে সাউথ জর্জিয়ার গ্রাইটভিকেন অত্যন্ত সুন্দর এবং জীববৈচিত্র্যে ভরপুর স্থান।
আগামী পর্ব
রাইট হোয়েল বে , স্যালিসবারি প্লেইন ও প্ল্যানসিয়াস জাহাজে অবস্থানরত কিছু পর্যটকদের সঙ্গে কথোপকথন।
লেখক : জেলা ও দায়রা জজ, চাঁদপুর