সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:২৩ পিএম
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:১৫ পিএম
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর মতিলাল চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গঠিত তুফানী ব্যাটালিয়ন। এই ব্যাটালিয়নেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম (প্রথম সারির ডান থেকে তৃতীয়) সংগৃহীত
বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। বলতে ভালো লাগে যে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমিও সেই মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশীদার। আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার গজারিয়া গ্রামে। ৭ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা হয়ে যুদ্ধ করেছি গাইবান্ধা এবং ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর মতিলাল চক্রবর্তীর অধীনে দিনাজপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত।
স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়ি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে, সেখানেই পরিচিত হই বাঙালির বাঁচার দাবিনামা ছয় দফার সঙ্গে। ১৯৬৮ সালে মেছড়া হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হই পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে। সেখানেও মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে শুরু করি স্কুলের ধারাবাহিকতায়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। তখন পাঁয়ে হেঁটে সিরাজগঞ্জ আসি, বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে চলে যাই কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেপ্টেম্বরে গাইবান্ধার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিই। পরে রৌমারী ফিরে গিয়ে যেতে হয় উচ্চতর প্রশিক্ষণে ভারতের শিলিগুড়ির নকশালবাড়ী ব্লকের পাথরঘাটা পানিঘাটা অঞ্চলে। ২৮ দিন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর মতিলাল চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গঠিত হয় তুফানী ব্যাটালিয়ন। সে ব্যাটালিয়নের সদস্য হিসেবে যেতে হয় বালুরঘাট সীমান্তে নভেম্বরের মাঝামাঝি। ৬ ডিসেম্বরের আগমুহূর্তে আমরা দিনাজপুরের বিরল সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ি বাংলাদেশে। একের পর এক যুদ্ধ এবং সেসব যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে আমাদের বাহিনী। ১৬ ডিসেম্বর বগুড়ায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এবার ঘরে ফেরার পালা।
১৮ ডিসেম্বর ব্যাটালিয়ন থেকে ছুটি পাই, কিন্তু রাস্তাঘাট ভাঙচোরা, কোনো যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়, অগত্যা বগুড়া থেকে হাঁটা দিই সিরাজগঞ্জের পথে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া গেল, তিনি যাবেন তাড়াশ, তার মানে সিরাজগঞ্জের চান্দাইকোনা পর্যন্ত একসঙ্গে যাওয়া যাবে। দুজন রওনা হলাম সকাল ৯টার দিকে। রাস্তার বিভিন্ন ব্রিজ ভাঙা। ফলে যান চলাচল বন্ধ। জানা গেল, কোনো কোনো ব্রিজ ভেঙে ফেলেছে মুক্তিযোদ্ধারা যাতে পাকসেনার চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। আবার কোনো কোনো ব্রিজ পাকসেনারাই ভেঙে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে। আর ভাঙাচোরা সে রাস্তা দিয়ে আমরা দুই মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ শেষে চলছি বাড়ির পথে। সংশয়, বাড়ির স্বজনরা বেঁচে আছে তো? আমাদের মতো অনেকেই হাঁটছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ যেন কীভাবে বুঝে যায় যে আমরা মুক্তিযোদ্ধা। ফলে লোকজন আমাদের কথা শুনতে চায়, বিশ্রাম নেওয়ার কথা বলে, প্রয়োজনে রাস্তা দেখিয়ে দেয়। জনগণের সহায়তায় অচেনা পথ চলতে কোনো অসুবিধাই হয় না। তবে জনগণের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পথ দীর্ঘ হয়। সন্ধ্যার আগে আগে পৌঁছে যাই পাবনার চান্দাইকোনা বাজারে, তখনও আমার বাড়ি প্রায় পনের মাইল আর সহযোদ্ধার বাড়ি ১২-১৩ মাইল দূরে। দুই মুক্তিযোদ্ধার পথ দুই দিকে, বিদায় নিই দুজন দুজনের থেকে।
একা একা হাঁটতে থাকি। ধানগড়া বাজার পার হতে সন্ধ্যা লেগে যায়। পথের সাথিও একজন জুটে যায়, তবে তিনি যাবেন ব্রহ্মগাছার ইছামতী নদীর ওপারের সুবর্ণগাতী গ্রাম পর্যন্ত। তিনি বাগবাটী গণহত্যার গল্প বলেন, সেখানে দেড় শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। বাগবাটী অঞ্চল এখন বিরানভূমি। ইছামতী নদী পার হই, কিন্তু এ অন্ধকার রাতে আর যেতে দেন না তিনি। ঠাঁই নিতে হয় তাদের বাড়িতে। খবর পেয়ে গ্রামের অনেকেই আসে মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে। জানতে চায় কীভাবে পাকসেনাকে আমরা পরাজিত করলাম। পরদিন ভোরেই আবার রওনা হই নিজ গ্রামের দিকে।
বাড়ির সামনে নদীর খেয়াঘাটেই জানা গেল, মা কিছুক্ষণ আগেও গ্রামের মাথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার পথ চেয়ে। খেয়ানৌকা থেকে আমি নামার আগেই চিলের মতো দৌড় দেয় এক বালক, তার কণ্ঠে চিৎকারÑ সাইফুল ভাই যুদ্ধ থাইকা ফিরা আইছে। গ্রামে নারী-পুরুষের মিছিল আমার দিকে দৌড়ে আসতে থাকে, সবার আগে আমার মা। মা এসে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো যেন হারিয়ে যাওয়া ধন ফিরে পেয়েছেন তিনি। বাবা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন মা ও ছেলের মিলন। মায়ের বুকে জড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাসন্তান বাড়ি ফিরি, গ্রামে ফিরতে গিয়ে দেখি, পাকসেনারা যেন গ্রামে আসতে না পারে, সেজন্য যে রাস্তা কাটা হয়েছিল তা আবার মেরামত করছে গ্রামবাসী।
এসব দেখতে দেখতে আমি ফিরে আসি বাড়ির আঙিনায়। বাড়িতে ঢুকতেই মা আর ছোট বোনেরা দুধ দিয়ে গোসল করায়, তারপর ঘরে তুলে নেয় মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে। বাড়ি ফিরেছি শুনে পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনরা দেখতে আসে। এর মধ্যেই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মান্নান ভাই, খাজা, ননীরা ফিরে আসে বিভিন্ন সেক্টর থেকে। সাধারণ মানুষ আসে যুদ্ধের গল্প শুনতে। আমরাও জিজ্ঞেস করি তাদের কথা, তাদের টিকে থাকার কথা। কথায় কথা বাড়ে। একসময় ওঠে গ্রামের গরুচোর আবদুস সামাদের কথা। সে দূরগ্রাম থেকে গরু চুরি করে আনে, তা জবাই করে গ্রামের লোকের কাছে মাংস বিক্রি করে। এতে গ্রামের দুর্নাম হয়, এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। ডেকে আনা হয় তাকে। গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়ে, আসে তার ছেলেমেয়েরাও। সবাই দেখতে আসে যে মুক্তিযোদ্ধারা কী বিচার করে গরুচোরের? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বসি তাকে নিয়ে, জিজ্ঞাসা করা হয় তার কৃতকর্ম সম্পর্কে। সে-ও স্বীকার করে সবকিছু অকপটে। বেরিয়ে আসে এ অঞ্চলের গরু চুরির চাঞ্চল্যকর তথ্য। কীভাবে গরু চুরি করে কোথায় কোথায় হাতবদল হয়, এ গরু চুরির ভাগ কীভাবে বণ্টন হয়, সবকিছু। বিস্তারিত বলার পরে সে করজোরে ক্ষমা প্রার্থনা করে। জানায় যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, নতুন দেশে সে আর কখনও এমন অপকর্ম করবে না। তার পরেও মুক্তিযোদ্ধারা যে শাস্তি দেবেন তা সে মাথা পেতে নেবে। একদিকে তার স্ত্রী-সন্তানের কান্না, আরেকদিকে অকপট স্বীকারোক্তি দিয়ে সে সবার ক্ষমা পেয়ে গেছে ইতোমধ্যে, তাই মুক্তিযোদ্ধারাও তাকে শপথ পড়িয়ে ক্ষমা করে দেন।
মনে পড়ে, গ্রামের ভেতরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা, যে বিদ্যালয়ে আমরা পড়েছি শিশু বেলায়। গ্রামের ভেতরে হওয়ায় স্কুলে খেলার সুযোগ নেই, প্রতিবেশীদের বাড়িতে বল চলে যায়, এ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিও হয় প্রতিনিয়ত। নাটকের মহড়া দিতে গেলেও চিৎকার-চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয় প্রতিবেশীরা। গ্রামের লোকদের নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, স্কুলঘরটি সরিয়ে নেওয়া হবে গ্রামের এক পাশে নদীর পারে। বর্তমান জমি ফিরিয়ে দেওয়া হবে জমিওয়ালাকে, বিনিময়ে তারই একটি জমিতে নির্মাণ করা হবে স্কুলঘর। যে কথা সেই কাজ, গ্রামের লোকেরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে উন্নয়নকাজের অংশীদার হয়ে ওঠে। তারা সহযোগিতা করে নতুন স্কুলঘরে মাটি তোলা, নির্মাণসহ সব কাজে। স্কুলের পাশেই নির্মাণ করা হয় ক্লাবঘর, পাঠাগারÑ নাম হয় মিলন সংঘ। এভাবেই গ্রামে শুরু হয় স্বাধীনতার বিজয়-পরবর্তী উন্নয়নের কাজ। অন্যদিকে গ্রাম ও তার পাশের এলাকার মানুষ আমাদের কাছে আসতে থাকে, তারা চায় তাদের পারিবারিক বিরোধ, জমি নিয়ে বিরোধ, সামাজিক বিরোধের মীমাংসা করে দিক মুক্তিযোদ্ধারা, কারণ পুরোনো মাতবরি ব্যবস্থায় তাদের আর আস্থা নেই, সেখানে জনগণ আস্থা রাখছে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। কারণ জনগণ ভাবছে, বিশাল পাকবাহিনীকে যারা পরাস্ত করেছে তারা নিশ্চয়ই পারবে তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতে। মিলেমিশে থাকার সমাজ গড়ে দেবে তারা, গড়ে উঠবে সোনার বাংলা। সুখী বাংলাদেশ।

বাহাত্তরের জানুয়ারি, কাজ করতে শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন। একদিন গ্রামে কৃষক আসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, তাদের কথাÑ গ্রামে যে সার ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে সে কালোবাজারিতে সার বিক্রি করছে। সদ্যস্বাধীন দেশে এটা চলতে পারে না। আমরা খোঁজ নিই। জানতে পারি ডিলারের ইউরিয়া সার বিক্রি করার কথা কুড়ি পয়সা কেজি। কিন্তু বাজার থেকে তা কৃষক কিনতে বাধ্য হচ্ছে আড়াই টাকায়। আরও জানা গেল, এ সার ডিলারের কাছ থেকেই ফড়িয়ারা কিনে বিক্রি করছে। গ্রামে কৃষক সভা ডাকা হলো। এর একটা বিহিত অবশ্যই করতে হবে, সদ্যস্বাধীন দেশে এটা চলতে পারে না। সভা থেকেই একটি কমিটি করে সিদ্ধান্ত হলো শহরের আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে বিষয়টি জানানোর জন্য। কমিটি গিয়ে দেখা করে আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা কমিটির সদস্যদের ধমকে বলেন, ‘দেশ তো একটি নিয়মের মধ্যে চালাতে হবে, ডিলার ছাড়া কৃষকের কাছে সার পৌঁছাব কীভাবে?’ তিনি আশ্বাস দিলেন বিষয়টি দেখবেন। কমিটির সদস্যরা আশা-হতাশায় দোলায়িত হতে হতে ফিরে আসেন, কিন্তু হয় না সমস্যার সমাধান। চোরাকারবারে সার বিক্রি চলতেই থাকে, কৃষকের মধ্যে বাড়তে থাকে ক্ষোভ-বিক্ষোভ। মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যর্থতা নিয়েও এলাকাবাসীর মধ্যে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
এ পরিস্থিতিতে একদিন বাবা ডেকে বললেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দিয়েছো, লড়াই করেছো, দেশের স্বাধীনতা এনেছো, এতে খুশি হয়েছি, এখন পড়াশোনাটা শেষ করো, চাকরিবাকরি করো, সংসারে কিছু সহযোগিতা হোক। মাত্র দুই দিন সময় দিয়ে বাড়ি ছেড়ে পাবনা চলে যাওয়ার জন্য বললেন তিনি। চলে এলাম। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা এভাবেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম কি না তা আজও বুঝতে পারি না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, আহ্বায়ক, সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি