সংগ্রহ এবং ভূমিকা : আলীনুর ইসলাম
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:১৫ পিএম
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:১৩ পিএম
১৯৭১ সালে রণাঙ্গন থেকে স্বজনদের কাছে লেখা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যেকোনো চিঠিই যেন যুদ্ধদিনের খণ্ডচিত্র; যা মহান মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিল। ছোট্ট একটি কাগজে লেখা সেই বার্তাটুকু প্রিয়জনদের কাছে স্মৃতির সম্বল। বেঁচে থাকার অবলম্বন। তেমনই এ চিঠিটি যুদ্ধের ময়দান থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রুস্তম আলী তার স্ত্রীর কাছে লিখেছিলেন
এ চিঠির প্রেরক ‘র’। র নামের গেরিলা বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত নাম মো. রুস্তম আলী। তার বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার যোগীপাড়া গ্রামে। দেশমাতৃকার টানে সদ্যকৈশোর পেরোনো স্ত্রী এবং নয় মাস বয়সি মেয়েকে রেখে তিনি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন করে ঘরে ফেরেন এ যোদ্ধা। যুদ্ধের সময় স্ত্রী এবং পরিবারের কাছে টুকরো টুকরো কাগজে অনেক চিঠিই লিখেছিলেন। সে চিঠিগুলোর মধ্যে তার স্ত্রী ফিরোজা বেগমের কাছে মাত্র একটি চিঠিই রয়েছে। এ চিঠিটি ফিরোজা বেগম খুব যত্ন করে নিজের কাছে রেখেছেন। যুদ্ধের সময় রুস্তম আলীর বাড়িতে পাকবাহিনী আগুন দিলে সবকিছুর সঙ্গে যোদ্ধার পাঠানো রণাঙ্গনের চিঠিগুলোও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। নিঃশেষ হয়ে যায় যুদ্ধদিনের অমূল্য দলিল। পুড়ে যাওয়া ওই চিঠিগুলোয় কী লেখা ছিল! জানতে চাইলে ফিরোজা বেগম বলেন, ‘এত আগের কথা কি আর এখন মনে আছে।’ স্বামীর লেখা এ চিঠিটি তার কাছে কে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা জানতে চাইলে বলেন, ‘ডায়রিতে লেখা ছিল। এখন কোথায় আছে তা বলতে পারছি না।’
রুস্তম আলী এ চিঠিটি পাঠিয়েছেন ‘সাগু’র কাছে। সাগু তার স্ত্রী ফিরোজা বেগমের ডাকনাম। যুদ্ধের সময় এ নারীও তার স্বামীর নির্দেশ মোতাবেক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। তার দায়িত্ব ছিল ভারত থেকে আনা অস্ত্র ও গোলাবারুদের গোপনীয়তা বজায় রাখা। শরণার্থীদের ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন। তার কাছে লেখা এ চিঠিটি পাঠ করলে তা আরও স্পষ্ট হয়। একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের কত যে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হয়েছে, তার প্রমাণ মেলে যুদ্ধদিনের এ চিঠিটিতে। এ লেখার মধ্যে একজন বীরযোদ্ধা অনির্দিষ্ট সময়ের যুদ্ধভাবনা থেকে নয় মাসের কন্যাশিশুকে সৈনিক হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছেন, যোদ্ধা বানাতে চেয়েছেন মুক্তিকামী পিতার উত্তরসূরি হিসেবে।
স্নেহের সাগু,
পত্রে আমার স্নেহ রইলো, পর লিখি যে, তোমার সংগে আমার আর দেখা নাও হতে পারে, তাই তোমার কাছে আমার অনুরোধ রইলো লিপিকে তুমি দেখে শুনে রাখবে কারণ জীবনে কোন দিন দেখা নাও হতে পারে। আর তুমি লিপিকে ঠিকমত লেখাপড়া শেখাবে এবং তাকে সামরিক শিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষা দিতে হবে। জীবনে কোন দিন যদি বাঁচে থাকি তবে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। আর ঐ সকল কাগজপত্রের মধ্যে যদি কোন প্রকার আওমী লীগের কাগজপত্র থাকে তবে তুমি পুড়িয়ে ফেলবে।
বি: দ্র:- রইচদের ঘরে যদি কোন প্রকার মজিবর রহমানের ফটো থাকে তাহলে পুড়ায়ে ফেলবে।
আর তোমাকে বলতে বাধ্য হইতেছি যে, তুমি আমার কথা ছাড়া বা পত্র ছাড়া শ্যামপুর আসিবে না। তুমি অন্য কোন জায়গায় যেতে পার। আর আমার নাম ঠিক করে লিখিবে না। কারণ চিঠি ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই আমার নাম লিখলাম শুধু ‘র’।
বি: দ্র:- আমার মা বাপকে বুঝায়ে রাখবা সে ঠিক আছে।
আমি ভালই আছি।
ইতি
‘র’