জুলিয়া পারভীন
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৩৩ পিএম
নামিবিয়ার স্যান্ডউইচ বে'তে লেখক ও ভ্রমণসঙ্গী
আফ্রিকা ঘুরে দেখার স্বপ্ন পূরণে জুলিয়া পারভীন ও সিমন আলম দম্পতি বেরিয়ে পড়ে দুঃসাহসিক অভিযানে। আজ থাকছে সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের নামিবিয়া দেখার গল্প। লিখেছেন জুলিয়া পারভীন
মহাকাশ থেকে টুপ করে পড়ে যাওয়া একটি দেশ নামিবিয়া। কেউ যদি এলিয়েন মুভি বানাতে চায়, তাহলে এই দেশটি হবে শুটিংয়ের জন্য উপযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে এই মন্ত্রমুগ্ধ দেশের কিছু এলাকা মনে হবে, আপনি মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করেছেন। এখানে দেখার মতো এত্তকিছু আছে যে, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সময় এখানে দিয়েছি এবং পুরো দেশটা ঘুরে ঘুরে দেখেছি। মাত্র ২৬ লাখ লোকের বসবাস এই দেশে কিন্তু মানুষের চেয়ে দর্শনীয় স্থান বেশি।
নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহোয়েক থেকে এর শেষ সীমানা স্কেলেটন বে পর্যন্ত, আবার সেখান থেকে ইটোসা ন্যাশনাল পার্ক, এখানকার আদিবাসী হিমবার সঙ্গে রাত্রিযাপন, জীবনে প্রথম চিতার সঙ্গে হাঁটার অভিজ্ঞতা আর ভিনগ্রহ থেকে আসা উল্কাপিণ্ড ছুঁয়ে দেখা, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিস্টাল, পিঙ্ক লেকÑ সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আমরা রাত্রে যখন ড্রাইভ করতাম তখন আকাশ তারায় তারায় আলোকিত থাকত। যেন মনে হতো আমরা আকাশের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলেছি। মেঘে ঢাকা আকাশ মাঝেমধ্যে এমনভাবে গর্জন করত, আর এমনভাবে বিদ্যুৎ চমকাত যেন মনে হতো বিদ্যুৎ আকাশ থেকে মাটি ছুঁতে চাচ্ছে।
-67568e4894e39.jpg)
৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন বছরের পুরোনো সোসুসভলেই বালুর টিলাগুলো অন্বেষণ এবং ৩২৫ মিটারের সর্বোচ্চ টিলা ‘বিগ ড্যাডি’ আরোহণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করলে নামিবিয়ার কোনো ভ্রমণ সম্পূর্ণ হবে না। এটি হলো নামিবিয়ার নামিব-নাউক্লুফ্ট জাতীয় উদ্যানে নামিব মরুভূমির দক্ষিণ অংশে অবস্থিত উচ্চ লাল টিলা দ্বারা বেষ্টিত একটি লবণ ও মাটির প্যান। ডেডভলেই হলো আরেকটি মাটির প্যান, সোসুসভলেই থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে। ডেডবলেই গাছগুলো আনুমানিক ৯০০ বছর পুরোনো বলে অনুমান করা হয়, তবে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সেগুলো পচেনি। পিচ কালো গাছ এবং ব্লিচড সাদা প্যানগুলোর মধ্যে বৈপরীত্য এবং মরিচা-লাল বালুর টিলা এবং গভীর নীল আকাশ অবিশ্বাস্য চিত্রগুলোর জন্য ডেডভলেই ফটোগ্রাফারদের জন্য একটি স্বর্গ। এমনকি এখানে অসংখ্য ছবি, গানের শুটিং হয়েছে।
-67568e0e5f961.jpg)
দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্তের ঠিক উত্তরে ফিস রিভার ক্যানিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যানিয়ন দেখতে হলে নামিবিয়ায় আসতেই হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘতম নদী অরেঞ্জেতে কায়াকিং এবং সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা অবিস্মরণীয়। যার এক পাশে সাউথ আফ্রিকা অন্য পাশে নামিবিয়া।
-67568e1a9f954.jpg)
কোলমানস্কপ দক্ষিণ নামিবিয়ার নামিব মরুভূমির একটি বিখ্যাত ভূতের শহর। বন্দর শহর লুডরিটজ থেকে কয়েক কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত এই ভূতের শহর। নামিবিয়ার রেলকর্মী জাকারিয়াস লেওয়ালা মরুভূমিতে একটি হীরা খুঁজে পান কোলমানস্কপে। বছরে প্রায় এক মিলিয়ন ক্যারেট বা বিশ্বের মোট হীরা উৎপাদনের প্রায় ১১.৭ শতাংশ উত্তোলন করত এই শহর থেকে। এটি ওই সময়ে জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার অংশ ছিল, যেটি সহিংসতা ও গণহত্যার ওপর নির্মিত একটি উপনিবেশ।
১৯০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঔপনিবেশিক শাসকরা একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করে; যার মধ্যে কোলমানস্কপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। বহু বছর পর যখন জার্মানরা রাতারাতি শহর থেকে পালিয়ে গেল সব হীরা উত্তোলন করে, তখন এটা ভূতের শহরে পরিণত হলো। আদিগন্ত বিস্তৃত সাদা বালিতে তিমিসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কাল বা দেহাবশেষ। পাহাড়ের মতো জমে আছে জাহাজের ধ্বংসাবেশষ। তার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়ায় ক্ষুধার্ত সিংহ আর হায়নার দল। নামিবিয়ার উপকূলের দীর্ঘ এই অংশের নাম ‘স্কেলিটন কোস্ট’। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের এই দেশের নামকরণ হয়েছে উপকূলীয় মরুভূমি ‘নামিব’ থেকে। অতলান্তিক মহাসাগরের উপকূলে এই কোস্টাল ডেজার্ট প্রায় ২০০০ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের এই দেশের নামকরণ হয়েছে উপকূলীয় মরুভূমি ‘নামিব’ থেকে।
অতলান্তিক মহাসাগরের উপকূলে এই কোস্টাল ডেজার্ট প্রায় ২০০০ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। নামিবিয়ার ১৫৭০ কিলোমিটার উপকূল অংশের মধ্যে পুরোনো শহর হলো সোয়াকোপমান্ড। অতীতের জার্মান এই উপনিবেশ থেকে শুরু করে অ্যাঙ্গোলার সীমান্ত পর্যন্ত অঞ্চলের সীমানা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার লম্বা। কার্যত পাণ্ডববর্জিত এই এলাকায় শাসন করে বন্য জীবজন্তুরা। একেই বলা হয় কঙ্কাল-উপকূল।
নামিবিয়ার অতলান্তিক উপকূলের উত্তর অংশ বা কঙ্কাল উপকূল প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের আতঙ্ক ও দুঃস্বপ্নের কারণ। অতীতের পর্তুগিজ নাবিকরা একে বলত ‘নরকের দ্বার’। স্থানীয় বুশম্যান উপজাতির মানুষ মনে করে, ঈশ্বর কুপিত হয়ে এই অংশ সৃষ্টি করেছিলেন। ভৌগোলিক কারণে প্রকৃতি এখানে নির্দয়। শীতল বেঙ্গুয়েলা স্রোতের জেরে সারা বছরই এই ভূখণ্ড ঘিরে থাকে ঘন সামুদ্রিক কুয়াশা।
বার্ষিক সর্বোচ্চ মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নিয়ে এই শুষ্ক অংশে মানুষের জীবনধারণ কার্যত অসম্ভব। ‘কঙ্কাল উপকূল’-এর কঙ্কাল শব্দটি এসেছে জাহাজ এবং প্রাণী দুটির দেহাবশেষ থেকেই। অতীতে এখানে সমুদ্রতটে স্তূপের মতো জমে থাকত তিমি ও সিলের কঙ্কাল। গভীর সমুদ্রে জাহাজে তিমি ও সিল শিকারের পর, চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়ার পর দেহাবশেষ ভাসিয়ে দেওয়া হতো সমুদ্রে। স্রোতে ভাসতে ভাসতে সেই সব কঙ্কাল এসে জমত উপকূলের এই অংশে। এখন শিকারে অনেক ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কালের সংখ্যা কমে গেছে আগের তুলনায়। তবে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে আগের মতোই। হাজারের বেশি বিভিন্ন আয়তনের জলযানের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে উপকূলের এই অংশে।
-67568e5a5bd99.jpg)
তার মধ্যে আছে ‘এডওয়ার্ড বোহলেন’, ‘বেঙ্গুয়েলা ঈগল’, ‘ওটাভি’, ‘ডুনেডিন স্টার’-এর মতো বিখ্যাত জাহাজও। কঙ্কাল উপকূলের অংশে সমুদ্র উত্তাল। সব সময় ঢেউ আছড়ে পড়ে তটে। অতীতে সমুদ্রের এই অংশে ঘন ঘন জাহাজ দুর্ঘটনা হতো। তার চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে স্কেলিটন কোস্টজুড়ে। এখন অবশ্য বালিয়াড়িতে ভরা পাথুরে এই উপকূল অংশে সার্ফিং খুব জনপ্রিয়। প্রাচীনকাল থেকে মৃত্যু লীলার সাক্ষী থাকলেও এই অংশের নাম ‘স্কেলিটন কোস্ট’ হয়েছে ১৯৪৪ সালে। সে বছর ডুনেডিন স্টার জাহাজডুবি নিয়ে বই লেখেন জন হেনরি মার্শ।
তিনি-ই এই অতলান্তিক উপকূলের নামকরণ করেন কঙ্কাল উপকূল। পরে এটাই হয়ে যায় এই অংশের সরকারি নাম। মানচিত্রেও ব্যবহার করা হয় এই নামটিই। স্থানীয় প্রতিকূল পরিবেশে যেসব বন্য প্রাণী টিকে থাকতে পেরেছে, তাদের নিয়ে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ তৈরি করেছে তথ্যচিত্রও। উগাব নদী থেকে কুনিনি নদী অবধি ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে স্কেলিটন কোস্ট ন্যাশনাল পার্ক। বেবুন, জিরাফ, সিংহ, গন্ডার, হরিণসহ অসংখ্য বন্য প্রাণীর বৈচিত্র্যে ভরা এই জাতীয় উদ্যান। নামিবিয়া অন্বেষণ শেষ করে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ বৃহত্তম ‘কারিবা বাঁধ’ দেখা।
জানা-অজানা তথ্য
বর্তমানে নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহোয়েক। ভৌগোলিক দিক দিয়ে নামিবিয়ার একেবারে মধ্যস্থলে অবস্থিত উইন্ডহোয়েক। এটি হলো দেশের সবচেয়ে বড় এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহর। এর গুরুত্ব জার্মান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই ছিল। এখন উইন্ডহোয়েক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক তথা দেশের শাসন কেন্দ্র।
নামিবিয়াতে প্রচলিত মুদ্রা নামিবিয়ান ডলার। তবে দেশের স্বাধীনতার আগে সাউথ আফ্রিকা রেন্ডের যেমন প্রভাব ছিল তেমনি স্বাধীনতার পরেও রয়ে গেছে। পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে যারা প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার্থে পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই অনুযায়ী এই দেশের সংবিধানের ধারা অনুসারে নামিবিয়াতে বনজ সম্পদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার্থে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বনজঙ্গলের নানা রকমের জন্তু-জানোয়ার যেমন আফ্রিকার বনের বড় বড় আয়তনের হাতি, নামিবিয়ার জেব্রা এই দেশের পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। নামিবিয়াকে চিতাদের দেশও বলা যেতে পারে। দেশটিতে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার পর্যন্ত চিতাবাঘের প্রমাণ পাওয়া গেছে।