প্রবীর সুমন
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:১৪ পিএম
এলাকার একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম নৌপথ
আধুনিক সভ্যতা ছেড়ে আদিমতা খুঁজে পাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম লেকেরপাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা দুর্গম পাহাড়ি জনপদ জুরাছড়ি। ১০টি উপজেলা নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ লেক-পাহাড়ঘেরা সীমান্তবেষ্টিত এই জেলা।
জুরাছড়ি উপজেলা রাঙামাটি সদর থেকে ৫৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। স্থানীয় চাকমা ভাষায় যার ‘জুর’ অর্থ ঠান্ডা আর ‘ছড়ি’ অর্থ চড়া। উপজেলা সদরের দক্ষিণে সব নদীর উজানে জুরাছড়ি নামক একটি ছড়া রয়েছে। এ ছড়ার পানি খুবই ঠান্ডা। এ জুরাছড়ি ছড়ার নামেই এ উপজেলার নামকরণ হয়েছে জুরাছড়ি। এই উপজেলার উত্তরে বরকল, দক্ষিণে বিলাইছড়ি, পূর্বে ভারতের মিজোরাম সীমান্ত এবং পশ্চিমে জেলা সদর উপজেলা। এই এলাকার একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম নৌপথ। তবে উপজেলা পৌঁছার আগেই রাস্তার মাথা নামক স্থান থেকে উপজেলা সদরের সড়ক সংযোগ রয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ভোর হতেই হেমন্তের দ্বিতীয় সকালে শীতের আগমনী বার্তার হালকা কুয়াশা ভেদ করে আসা মিষ্টি রোদের উষ্ণতায় দুই ভ্রমণ বন্ধু প্রলয় বাপ্পী আর সাংবাদিক সমীর মল্লিককে সঙ্গে নিয়ে দুই মোটরবাইকে রওনা দিলাম দীঘিনালা থেকে। দীঘিনালা থেকে খাগড়াছড়ি হয়ে মহালছড়ি পৌঁছে চা-বিরতি শেষে আবার ছুটে চলা। প্রায় তিন ঘণ্টার মোটরবাইক জার্নিতে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা সবুজেঘেরা ৯০ কিলোমিটার সড়কপথ পেরিয়ে রাঙামাটি সদরে পৌঁছয় সময় দুপুর ১২টায়।

সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকা সাংবাদিক দুই বন্ধু আরমান খান ও প্রান্ত রনির সঙ্গে দেখা করে সবাই মিলে রাঙামাটি শহরের ঐতিহ্যবাহী এবং সুস্বাদু খাবারের দোকান গ্রিনভ্যালিতে লেকের কাতলা মাছ আর নানা রকমের ভর্তা দিয়ে দুপুরের চমৎকার আহার সেরে রওনা দিলাম রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট। কারণ দেড়টায় জুরাছড়ির শেষ লঞ্চ।
ঠিক দেড়টায় লঞ্চে রওনা দিলাম সুবলং হয়ে জুরাছড়ির পথে। প্রথমে কড়া দেখে লঞ্চের ভেতরে বসলেও নীলাভ জলরাশির সঙ্গে হেলে থাকা সবুজ পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য দেখার লোভে লঞ্চের ছাদেই নিজেদের জন্য জায়গা করে নিলাম। দোতলা লঞ্চের ছাদে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে এগিয়ে চলেছি। জেলা রাঙামাটির সঙ্গে উপজেলাগুলোর যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই দোতলা লঞ্চ। তা ছাড়া কেউ রিজার্ভ নিয়ে যেতে চাইলে স্পিডবোট ও বার্মিজ বোট নামের স্থানীয় কিছু ডিঙি নৌকা পাওয়া যায়।

সাধারণত বর্ষার শেষে শরৎ এবং হেমন্তের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেকের পানি চারদিকে টইটম্বুর থাকে। লেকের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে আমাদের লঞ্চ। পানকৌড়ি, সারস, বালিহাঁসসহ অসংখ্য পাখির ঝাঁক ঠেলে লঞ্চ চলছে সুবলং বাজারের দিকে। লঞ্চ চলার আশপাশে বালুখালী, নির্বান নগরের বৌদ্ধমূর্তি, মাস্টারপাড়া, স্বাগতম বরকল, হাজাছড়া পাহাড়ি গ্রাম আর দ্বীপ পেরিয়ে সুবলং বাজারে কিছুক্ষণের যাত্রাবিরতি। ছোট পাহাড় আর দ্বীপে মোড়ানো কিছুটা পথ যেতেই আলাদা হয়ে যায় বরকল আর জুরাছড়ির পথ। বাঁক নিতেই সবুজ পাহাড় যেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। জুরাছড়ির দিকে লঞ্চ ঢুকতেই চোখে পড়ল বাচ্চাসহ বিচরণ করছে একঝাঁক রাজহাঁসের দল।

মাছ ধরার মৌসুমে লেকজুড়ে ছোট ছোট নৌকায় চড়ে জাল ফেলছেন নিবন্ধনকৃত জেলেরা। বিশাল জলরাশির বুকে ছোট ডিঙি নৌকা ভেসে চলেছে। গ্রামের বাসিন্দারাও নৌকায় যাতায়াত করে। জলবেষ্টিত হওয়ায় প্রায় প্রতিটি পরিবারই নিজস্ব নৌকা ব্যবহার করে থাকে।
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে হেমন্তের কুয়াশা, বিকালের মিষ্টি হাওয়ায় গা ভাসিয়ে আনন্দের পথচলা। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য লঞ্চ থামছে বিভিন্ন ঘাটে। পুরো আকাশ যেন নেমে এসেছে লেকের পানিতে। জলের বাগান দেখলাম এই প্রথম। লেকের স্বচ্ছ পানির নিচে সবুজের এক ভিন্ন জগৎ। বড় বড় শ্যাওলার বন পানির নিচে।
সন্ধ্যার আগেই পৌঁছাই জুরাছড়ির ঘাটে। পথের দুপাশে আদিবাসীদের ঘর, প্রাচীন বৃক্ষ আর সবুজের সমারোহ। দূরে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পর্বতমালা। রাতে থাকা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। নৌঘাটে নেমে লেকেরপাড়ে জেলা পরিষদের নান্দনিক বাংলোয় রাতে থাকার বন্দোবস্ত হলো। ঘাটে রয়েছে পাহাড়ের আসল স্বাদের খাবার। হোটেল মেজাং-এ রাতের চমৎকার ডিনার সেরে নিলাম। সুস্বাদু পাহাড়ি রান্নার প্রকৃত স্বাদ নিতে চাইলে এই হোটেলের বিকল্প নেই।
শহুরে কোলাহলমুক্ত রাতের জুরাছড়িতে নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। পূর্ণিমার চাঁদের আলো জুরাছড়ির রাতের সৌন্দর্য ছিল রূপকথার গল্পের মতো।পুরো রাজ্যজুড়ে নেমে এসেছে জ্যোৎস্নার দল। পাহাড়ঘেরা দূরের এক জনপদকে যেন জাপটে ধরেছে একদল নক্ষত্র। ভর পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় লেকের পানিতে বিকিরণে সৃষ্টি হয় অন্যরকম অনুভূতি।
ভোরেই ঘুম ভেঙে দেখলাম চাষি আর জেলেরা নিজেদের নৌকায় করে রওনা হচ্ছেন গন্তব্যে। এখানে মেয়েরাও নৌকা চালাতে পারদর্শী। সকাল সকাল ভ্রমণ বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলাম দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সিংহশয্যা বৌদ্ধমূর্তিটি দেখার উদ্দেশ্যে। উপজেলা সদরের স্বল্প দূরত্বে হওয়ায় খুবই দ্রুত পৌঁছে গেলাম। ১২ একর পাহাড়ি ভূমির ওপর সুবলং শাখা বৌদ্ধ বিহারের সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। বিহারে ঢুকতেই চোখে পড়বে অসাধারণ কারুকার্যের নান্দনিক গেট, উঁচু ওয়াচ টাওয়ার, সাজানো ফুলের বাগানে প্রজাপতির খেলা আর সামনের দিকে তাকাতে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সিংহশয্যা বৌদ্ধমূর্তি।
৪নং দুমদুম্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শান্তিরাজ চাকমা জানান, ধ্যানরত এত বড় বৌদ্ধমূর্তি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম। তা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও এর চেয়ে বড় শুয়ে থাকা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি নেই। ৯ এপ্রিল ২০১৩ সালে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালে এলাকাবাসীর উদ্যোগে কায়িক শ্রমে বৌদ্ধমূর্তিটির পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়। এ ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আগত সহস্রাধিক পুণ্যার্থী অংশগ্রহণ করেন নির্মাণকাজে।
এবার ফেরার পালা। উদ্দেশ্য দুপুর দেড়টার লঞ্চে রাঙামাটি ফেরা। আগে থেকেই দুপুরে লাঞ্চের জন্য বলে রাখা মেজাং হোটেলে গিয়ে দেখি অবাক করা কাণ্ড, হরেক রকমের পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী খাবারের টেবিল ভর্তি সঙ্গে লেকের মাছ প্রকৃত স্বাদে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে নিমিষেই হারিয়ে গেছে ভ্রমণের সব ক্লান্তি। এ যেন ষোলোকলা পরিপূর্ণ।

হ্রদ আর পাহাড়বেষ্টিত জুরাছড়ির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবে যে কেউ। এমন দুর্গম প্রান্তিক পাহাড়ে সবসময় খুঁজে পাওয়া যায় বুনোগন্ধ আর নীরবতা। দুর্গমতায় আধুনিক কৃত্রিমতা ছেড়ে আদিমতা খুঁজে পাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম লেকের কুল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই পাহাড়ি জনপদ।
কোথায় রাত্রিযাপন করবেন
জুরাছড়ি রাতযাপনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে জেলা পরিষদের নান্দনিক সৌন্দর্যের একটি বাংলো রয়েছে। সেখানে আগে থেকেই যোগাযোগ করে নিতে পারেন। তবে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। থাকার বিড়ম্বনা নিতে না চাইলে সকালে গিয়ে বিকালের লঞ্চে ফিরতে হবে রাঙামাটির পথে। ফেরার পথে মনে হবে, দুর্গমতা কীভাবে ঢেকে রাখে তার প্রকৃতির গোপন সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যের নিবিড় ডাকে সাড়া দিলে জীবনটা হয়ে উঠবে উপভোগ্য।
যেভাবে যাবেন
রাঙামাটি শহর হয়েই যেতে হয় জুরাছড়িতে। জেলার রিজার্ভ বাজার থেকে লঞ্চে করেই জুরাছড়ি যেতে হয়। প্রতিদিন দুটো লঞ্চ আসা-যাওয়া করে জুরাছড়ি। সকাল সাড়ে ৭টায় ও দুপুর দেড়টায় আরেকটি লঞ্চ জুরাছড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফেরার লঞ্চের সময় জুরাছড়ি থেকে একই সময়ে লঞ্চ ছেড়ে আসে।