ওয়ার্ল্ড ম্যাথমেটিকস টিম চ্যাম্পিয়নশিপ কাতার ২০২৪
এস. এম ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৮ এএম
বাংলাদেশের ছয় স্বর্ণজয়ী শিক্ষার্থী।
ডিসেম্বরের শুরুতেই বিজয়ের কেতন ওড়াল আমাদের জেনজি প্রজন্ম। মেধা আর উদ্ভাবনের খেলায় কাতার জয় করল কিশোর গণিত অনুরাগীরা। এবারের ওয়ার্ল্ড ম্যাথমেটিকস টিম চ্যাম্পিয়নশিপে রীতিমতো ছক্কা হাঁকিয়ে ভূমিধস জয় ছিনিয়ে এনেছে তারা।
ভেনি-ভিডি-ভিসি
২৮ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত হয় গণিতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ম্যাথমেটিকস টিম চ্যাম্পিয়নশিপ। কাতার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এক যুগ ধরে চলছে গণিতের সমস্যার সমাধান, যৌক্তিক কারণ নির্ণয় এবং নেটওয়ার্কিং প্রতিযোগিতাটি। তবে গণিতভিত্তিক স্টার্টআপ বাংলার ম্যাথের প্রযোজনায় এবারই প্রথম এ আসরে যোগ দেয় বাংলাদেশ। বিশ্বের ২৭ দেশ থেকে ১২০টির বেশি দলের ৭ শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বাংলাদেশের পাঁচটি টিম ‘দ্য বেঙ্গল হেক্সাগন’, ‘দ্য রয়েল সিক্স অব বেঙ্গল’, ‘দ্য ডেল্টা সিক্স’, ‘দ্য বেঙ্গল হেক্সা’ ও ‘দ্য বেঙ্গল ট্রাইনোমিয়াল’। এ পাঁচটি দল থেকে একেকজন সদস্য বাজিমাত করেন এক ঘণ্টার তিন ধাপের পরীক্ষায়। প্রথমবারে অংশ নিয়েই রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের উচ্চারিত ‘ভেনি, ভিডি, ভিসি’ বাস্তবে রূপ দিয়ে পারস্য জয় করলেন টিমের ২৭ জন সদস্যই। ছয়টি স্বর্ণ, ১১টি রোপ্য, সাতটি ব্রোঞ্জ এবং তিনটি মেরিট নিয়ে এ ভূমিধস বিজয় ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশ।
প্রথম সফরেই ছক্কা হাঁকিয়ে ‘এলো, দেখল এবং জয় করল’ পুরান ঢাকার সেন্ট যোসেফের হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জুনিয়র বিভাগের অহন বণিক। একইভাবে একই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির তাহমীদ আল আসাদ ও নবম শ্রেণির সাকিফ মিহরান সাবির; ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির নাশওয়ান হক মাহির; মতিঝিল গভ. বয়েস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির প্রজেশ ভৌমিক এবং বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের নবম শ্রেণির মোবাশ্বির আরিক ইন্টারমিডিয়েট বিভাগে স্বর্ণজয় করে।
এ ছাড়া দেশের পক্ষে জুনিয়র লেভেলে সেন্ট যোসেফের সপ্তম শ্রেণির আরমান মালিক, ঢাকার আগা খান একাডেমির পঞ্চম শ্রেণির ফাতিমা জাহরা শেখ, যশোর সরকারি গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির জান্নাতুল ফেরদৌস নওশিন; ইন্টারমিডিয়েট গ্রুপে প্রেসিডেন্সি ইন্টা. স্কুলের অষ্টম শ্রেণির লাইবা সারিনা ইসলাম, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল উত্তরার গ্রেড-৯-এর শিক্ষার্থী আয়্যান জামান, বান্দরবানের লামা উপজেলার কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র পিতৃহীন উছাই মং মার্মা, সেন্ট যোসেফের অষ্টম গ্রেডের মো. তাহসিন ইসলাম, রাফিদ উন নবী ও কুমিল্লা জেলা স্কুলের নবম শ্রেণির মো. সারাফ নুহিল ইসলাম রৌপ্য জয় করে। একই গ্রুপে সেন্ট যোসেফ থেকে অষ্টম শ্রেণির মোহাম্মদ ইবতেসাম ইসলাম মো. ফাহিম, সপ্তম শ্রেণির শুভ্র অনিন্দ্য বেপারী; আরএসএফ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির মো. ফাহিম, এক্সেল একাডেমির সপ্তম শ্রেণির মোহাম্মদ সাইফান হায়দার এবং গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির সাকিন আল সাদাফ ব্রোঞ্জ জয় করেছে।
এ ছাড়া অ্যাডভান্সড গ্রুপে সেন্ট যোসেফের একাদশের শিক্ষার্থী ইনতেশার আলম মানাম ব্রোঞ্জ, ক্যান্ট. ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির মোহাম্মদ মারজুক রহমান ও সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির সাদ বিন আহমেদ সিলভার পেয়েছে। আর ইন্টারমিডিয়েট থেকে মেরিট সার্টিফিকেট পেয়েছে ব্রিটি স্ট্যান্ডার্ড স্কুলের সপ্তম শ্রেণির হুমায়রা আফিয়া, এবিসি ইন্টা. স্কুলের নবম শ্রেণির অহম সাহা এবং ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির গৈরিক পাল।
এভাবেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মোট দলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করা ৩০ শতাংশ দলের সারথি হয়ে ‘টপ টিম’ শ্রেষ্ঠ গণিতবিদের ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে ইন্টারমিডিয়েটের তিনটি এবং অ্যাডভান্সড লেভেলের একটিÑ বাংলাদেশের এ চারটি দল।
অবশ্য এ বিজয় কিন্তু চকিতে ধরা দেয়নি। যাত্রার শুরুটাও ছিল দুরুদুরু কাঁপন তোলা। কেননা বিজয়ীদের প্রায় সবাই এবার প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে যায়। সেখানে গিয়ে গণিতে জাঁদরেল দেশ হিসেবে পরিচিত চীন, যুক্তরাষ্ট্র, বুলগেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও প্রতিবেশী ভারতের শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের মনে হয়েছিল ওরা ‘নস্যি’। কেননা যাওয়ার পরদিনই প্রতিযোগীদের স্মার্টনেসে তারা আপসেট হয়। ওদের কারও কাছে আইপড, কারও বা আইপ্যাড। দামি দামি ডিভাইস আর অভিজাত দেশের আভিজাত্যের খুশবু ছড়াচ্ছিল ওরা। কিন্তু ‘বাংলাদেশ’ নাম শুনে ততটা গ্রাহ্য করেনি ওরা। তবে বিজয়ের পর সূর্যালোকিত হওয়ার মতোই হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুত্বের।
সেদিনের কথা স্মরণ করে বাংলার ম্যাথের সহপ্রতিষ্ঠাতা আহমেদ শাহরিয়ার শুভ বলেন, ‘আমরা খেয়াল করি, বিশ্বের নানা দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা বেশ ঘাবড়ে গেছে। ফলে অংশগ্রহণকারীদের মানসিকভাবে চাঙা করতে দলের চারজন কোচ তাদের প্রফুল্ল রাখার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। এরা হলেন বাংলাদেশ দলের কোচ আহমেদ শাহরিয়ার, মাহ্তাব হোসাইন, আশরাফুল আল শাকুর ও ফারহান উদ্দিন। মূল প্রতিযোগিতার আগের দিন সব প্রতিযোগীকে মানসিকভাবে চাঙা করি। তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এরপর জুনিয়র ক্যাটাগরিতে যখন অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা শুরু হলো তখন আমরা খেয়াল করলাম আমাদের একজন শিক্ষার্থী গোল্ড মেডেল পেয়েছে। ইন্টারমিডিয়েট ক্যাটাগরিতে গিয়ে দেখা গেল একে একে পাঁচজন শিক্ষার্থী গোল্ড মডেল পেয়েছে। একবার করে বাংলাদেশ দলের নাম ডাকা হচ্ছে আর সবাই পেছনে তাকাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অনেক সম্মানের এবং আনন্দের এক অভিজ্ঞতা ছিল।’
স্বর্ণজয়ীদের মধ্যে অহন বণিকের বাবা সঞ্জয় কুমার বণিক বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান। মা শিউলী ভদ্র সরকারি বাঙলা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। অহন গত বছর অনলাইনে বুলগেরিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত প্রতিযোগিতায় (আইএমসি) অংশ নিয়ে অনারেবল মেনশন পেয়েছিল। কোনো প্রতিযোগিতায় এটাই প্রথম বিদেশ যাওয়া। প্রথম অভিজ্ঞতাটা ছিল ভয়ের। প্রত্যাশার চেয়ে ঢের ভালো ফল করে সে বলল, ‘প্রথমে চায়না, বুলগেরিয়া, ইন্ডিয়াকে দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে ওরা ডোমিনেটিং টিম। ওদের তুলনায় আমরা কেমন করব কে জানে! পরে অবশ্য আমারা ইন্ডিয়া এবং বুলগেরিয়া থেকে ভালো করেছি। শুরুতে ডোমিনেটিং টিমগুলোর প্রতিযোগীদের সঙ্গে অল্প কিছু সৌজন্যমূলক কথা হয়েছিল।
রেজাল্টের পরে অবশ্য অনেকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয়েছে। ইউএসএ, সাউথ কোরিয়া, ফিলিপিন্স, ইন্ডিয়া, কাজাখস্থান এসব টিমের সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপিন্সের একজন প্রতিযোগী বাংলাদেশে আসতে চেয়েছে। এ বন্ধুত্বের বন্ধন শুধু গণিতের হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ওরা আমাদের দেশের জীবনযাপন পদ্ধতি, আমাদের কালচার ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। বিজয়ের পর তাদের চোখে আমাদের জন্য অন্যরকম সম্মান দেখতে পেয়েছি।’
তার মতোই জুনিয়র গ্রুপের স্বর্ণ-কিশোর সেন্ট যোসেফের হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাকিফ মিহরান সাবির জানাল, ওমরাহ করতে বাবা-মায়ের সঙ্গে সৌদি আরব গিয়েছিল। এরপর এবার কাতার প্রতিযোগিতার জন্য। এ সফরটা ছিল স্বপ্নের মতো। শুরুতে ভয় পেলেও স্বর্ণ জয় করার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। তার বিশ্বাস, আগামীতে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রকেও আমরা টপকাতে পারব।