× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমতলের চায়ের রাজ্যে

সোহেল রানা

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:২২ পিএম

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৩১ পিএম

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় একসময়ের পতিত জমি এখন দিগন্ত ছুঁয়েছে চা বাগানের সবুজে 	  ছবি : শেরহিন্দ রেজওয়ান

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় একসময়ের পতিত জমি এখন দিগন্ত ছুঁয়েছে চা বাগানের সবুজে ছবি : শেরহিন্দ রেজওয়ান

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশের উত্তরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পঞ্চগড় জেলা। গত ১৫ নভেম্বর আমের স্বর্গরাজ্য নওগাঁর সাপাহার থেকে সমতলের চায়ের রাজ্য দেখতে আমরা ১১ বন্ধু পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ভ্রমণ করি।

আমরা এর আগে সিলেটে পাহাড়-টিলার চা বাগান ঘুরে দেখলেও চা-পাতা থেকে কীভাবে চা প্রক্রিয়াজাত করে প্যাকেটজাত হচ্ছে, তেঁতুলিয়ায় এসে একটি আধুনিক কারখানা ঘুরে সেই বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। চা তৈরির কারখানায় ঢুকে বিশাল এ কর্মযজ্ঞ দেখতে হলে আগে অনুমতি নিতে হবে। এ ভ্রমণে চায়ের কারখানা দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের তেঁতুলিয়া শাখার ব্যবস্থাপক ফজলুল করিম।

বৃহত্তর সিলেট ও চট্টগ্রামের পর পঞ্চগড় অন্যতম চা অঞ্চল হিসেবে এরই মধ্যে দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। পঞ্চগড় ইতোমধ্যে দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একসময়ের পতিত গোচারণভূমি ও দেশের সবচেয়ে অনুন্নত জেলা এখন চায়ের সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে। সৃষ্টি হয়েছে চোখ জুড়ানো নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দেশেরসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে পঞ্চগড়ের চা।

রোটারভ্যান মেশিনে পাতা দিচ্ছেন নারী শ্রমিক

তেঁতুলিয়া উপজেলা সীমান্ত অঞ্চল হওয়ায় এখানকার চা শিল্প ঘিরে ‘টি ট্যুরিজমে’ অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে। এখানে এসে পর্যটকদের এপার-ওপার বাংলার আন্তঃসীমানা চা বাগান উপভোগ করা বেশ রোমাঞ্চকর। বাগানগুলোয় চা পাতা কাটা, কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাতকরণ আর স্থানীয়ভাবে চা পাওয়া পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০০০ সালের দিকে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি, কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান চা চাষ শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তেঁতুলিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ ভূমি চায়ের সবুজ পাতায় ছেয়ে যায়। আগে যেখানে চড়ে বেড়াত গরু, সেখানে গড়ে ওঠে সবুজের সমারোহ। চা বোর্ডের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় ক্ষুদ্র চা চাষিরা। বাগান মালিকদের পাশাপাশি তারাও চাষ করেন চা। পঞ্চগড়ে নীরবে ঘটে চা বিপ্লব। পঞ্চগড় চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলার ১৬ হাজার একর জমি চা চাষের উপযোগী। এ পর্যন্ত চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে ২ হাজার ২৫৫ দশমিক ৫৫ একর জমিতে। চা চাষ করছে ১৮২ জন স্মল গ্রোয়ার্স, যাদের জমি ৫ একরের নিচে, ৫ থেকে ২০ একরের মধ্যে স্মল হোল্ডার্স ১১ জন এবং ২০ একরের ওপরে ১৯টি টি এস্টেট। চা বোর্ড পঞ্চগড়ে ৪১টি কারখানা অনুমোদন করলেও বর্তমানে ২২টি কারখানা চলমান আছে।

সিটিসি মেশিনে গুঁড়া হচ্ছে চা-পাতা

চা পাতা বাছাই হচ্ছে চা শিল্পে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও শ্রমঘন কাজ। চা শ্রমিকরা পরম যত্নে দলবেঁধে এ কাজ করেন। তারপর ট্রাক্টরের সাহায্যে সেগুলো কারখানায় নিয়ে আসা হয়। কারখানায় আনার পর ডিজিটাল স্কেলে পাতা ওজন করে অনলোড করে চা প্রক্রিয়াকরণের কাজ শুরু হয়। কারখানায় চা তৈরির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে উইদারিং, রোলিং, ফার্মেন্টেশন, ড্রায়িং, গ্রেডিং ইত্যাদি। প্রতিটি ধাপে দক্ষতা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভালো চা তৈরির পূর্বশর্ত।

আমাদের দেশে কালো, সবুজ দুই রকম চা উৎপন্ন হয়। তবে কালো চা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কালো চা তৈরির দুটি পদ্ধতি হলো সিটিসি ও অর্থোডক্স। বর্তমানে সিটিসি পদ্ধতিই অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয়।

কালো চা প্রক্রিয়াজাতে পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করা হয়। সেগুলো হলো-

উইদারিং বা নির্জীব করা : সংগৃহীত পাতার পানির পরিমাণ কমানোই এ ধাপের মূল উদ্দেশ্য। তুলে আনা পাতায় সাধারণত ৮০% পানি থাকে। তা কমিয়ে ৭০%-এ নামিয়ে আনতে হয়। উপযুক্ত উইদারিং ট্রাফের মাধ্যমে ১২-১৪ ঘণ্টায় এ কাজ করা হয়।

প্রসেসিং বা পাতাকে ছিন্নভিন্ন করা : নির্জীব করা পাতা ছোট ছোট করে কাটতে ও চূর্ণবিচূর্ণ করতে প্রথমে রোটারভ্যান ও পরে পর্যায়ক্রমে কাটার জন্য চার-পাঁচটি সিটিসি মেশিনের ভেতর চালনা করা হয়।

ফার্মেন্টেশন বা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো : চূর্ণ বা পেষণকৃত পাতা তামাটে রঙে রূপান্তরিত করার জন্য ট্রের ওপর পাতলা করে ছড়িয়ে আনুমানিক ১ ঘণ্টা রাখতে হয়।

ড্রায়িং বা শুকানো : পাতার রাসায়নিক বিক্রিয়া বন্ধ ও পাতা শুকাতে এক ধরনের ড্রায়ার মেশিন ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে ডিএফবিডি ড্রায়ারের ব্যবহার বেশি জনপ্রিয়। ড্রায়ার থেকে বের হওয়া চা পাতায় জলীয় অংশের পরিমাণ ৩%-এর বেশি যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হয়।

সর্টিং বা শ্রেণিবিভাজন : বাজারজাতকরণের সুবিধার্থে প্রস্তুতকৃত পাতাকে আকার অনুসারে চালনি দিয়ে ভাগ করা হয় যাকে গ্রেডিং বলা হয়। আকৃতি অনুসারে এর নামকরণও ভিন্ন হয়।

এখানকার মনোমুগ্ধকর চা বাগানগুলো পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত মনোরম ও উপভোগ্য। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মন জুড়িয়ে দেয়। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ চা বাগানের সঙ্গে এখানকার চা পান। এ অঞ্চল ভারতের প্রসিদ্ধ চা শিল্পাঞ্চল দার্জিলিংয়ের কাছে থাকায় তার প্রভাব রয়েছে চা উৎপাদনে। যে কারণে এখানে উৎপাদন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চা। এখানকার চা দেশিসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে। এখানকার অর্গানিক চা বিক্রি হচ্ছে লন্ডনের হ্যারোড অকশন মার্কেটে। রপ্তানি হচ্ছে দুবাই, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে। তাই এখানকার উৎপাদিত চা পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে পারলে দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে অর্থবাণিজ্য রূপ দিতে পারে।

অক্টোবর-নভেম্বরে আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেখা মেলে হিমালয় পর্বতমালার তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। তবে পঞ্চগড়ে পর্যটকরা শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেই আসেন না, গায়ে মাখেন আগাম শীতের হাওয়া। শীত শীত আবহাওয়ায় দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখেন জেলার আরও কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।

গ্রেডার মিশন থেকে বের হচ্ছে চা

পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে তেঁতুলিয়া। এ উপজেলাতেই আছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্যের সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। আমরাও বাংলাবান্ধার জিরো পয়েন্ট (শূন্যরেখা) দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরে ডাকবাংলোর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্ত করা মহানন্দা নদী। এ নদীতে শ্রমিকরা ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি ব্যস্ত থাকেন নুড়িপাথর তোলায়। এ পাথর উত্তোলন তেঁতুলিয়ার অর্থনৈতিক চাঞ্চলের আরেক সোপান। সে গল্প আরেক দিন করা যাবে। আপাতত মহানন্দার পারে বসে তেঁতুলিয়ার ধোঁয়াওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে শীতের সকালটা উষ্ণ করে তুলি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা