বিশ্বজিৎ দাস
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:০৬ পিএম
অলংকরণ :জয়ন্ত সরকার
রোজ একই খেলা ভালো লাগে না। ‘ধুত্তোর!’ বিরক্তি প্রকাশ করল হালুম। ‘কী হলো?’ জানতে চাইল খরগু।
‘এমন করছ কেন ভায়া?’ জানতে চাইল শেয়ালু।
‘খিদে লেগেছে?’ প্রশ্ন করল বাদুড়।
খরগু, শেয়ালু, বাদুড় সবাই হালুমের খেলার সাথি।
স্কুল বন্ধ। তাই সবাই মিলে জঙ্গলে লুকোচুরি খেলছে ওরা।
‘রোজ লুকোচুরি খেলতে ভালো লাগে না।’ হালুম বলল।
‘আর কোনো খেলার কথা আমরা জানিও না।’ খরগু বলল।
‘খোলা থাকলে আমরা না হয় স্কুলেই যেতাম।’ বাদুড় বলল।
‘স্কুল, পড়া আর লুকোচুরি খেলা এর বাইরে আর কিছু নেই?’ হালুম জানতে চাইল।
‘আছে। কিন্তু আমরা জানি না।’ বলল শেয়ালু।
‘কেন জানি না?’
‘কারণ আমরা কেউই জ্ঞানী নই।’
‘জ্ঞানী কারা?’
‘যারা ক্লাসের বইয়ের পাশাপাশি অনেক অনেক বই পড়েÑ তারাই জ্ঞানী।’
‘তেমন জ্ঞানী কি আমাদের জঙ্গলে আছে?’
‘না নেই। তবে লোকালয়ে আছে।’ শেয়ালু বলল।
‘তবে আমি লোকালয়েই যাব।’ ঘোষণা দিল হালুম।
‘সর্বনাশ!’ আঁতকে উঠল ওরা সবাই।
‘ওরা তোমাকে পেলে ধরে খাঁচায় ভরে দেবে।’
‘পারবে না। আমি আগে বিড়াল মাসির কাছে যাব। তারপর জ্ঞানী মানুষের ঠিকানা নিয়ে চুপিচুপি তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসব।’
হালুম কারও মানাই শুনল না। বেরিয়ে পড়ল জ্ঞানী মানুষের খোঁজে।
বনজঙ্গল পেরিয়ে ছুটল লোকালয়ে। তিন দিন তিন রাত পরে হালুম পৌঁছে গেল মাসির বাড়ি।
‘কীরে বাছা, হঠাৎ মাসির বাড়িতে কেন?’
‘মাসি, আমি জ্ঞানী মানুষ খুঁজছি।’
‘জ্ঞানী মানুষ! কেন খুঁজছিস?’
হালুম সব খুলে বলল।
সব শুনে বিড়াল মাসি বলল, ‘এমন জ্ঞানী মানুষ এ লোকালয়ে একজনই রয়েছে। তিনি সারা দিন বই পড়েন আর লেখেন। সন্ধ্যে পার হোক। আমি তোকে তার কাছে নিয়ে যাব।’
মাছ, মাছের কাঁটা আর দুধ দিয়ে দুপুরের খাবার খেলো হালুম।
সন্ধ্যে হতেই মাসির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল হালুম।
জ্ঞানী মানুষ জানালার পাশে বসে বই পড়ছিলেন। এমন সময় হালুম এসে হাজির হলো।
‘কেমন আছেন?’ হালুম জানতে চাইল।
‘ভা...লো।’ জ্ঞানী মানুষটি চমকে গেলেন। ভয় পেলেন না।
‘আমি গভীর জঙ্গল থেকে এসেছি। আপনার কাছ থেকে কিছু জ্ঞান নিতে চাই।’
জ্ঞানী মানুষ হাসলেন।
‘আমি নিজেও খুব কম জানি। একটু-আধটু বইপত্র পড়ি তাই মানুষ মনে করে আমি অনেক জ্ঞানী। বলো, কী জানতে চাও?’
‘আমি জঙ্গলে থাকি মায়ের সঙ্গে। নিয়মিত পশুদের স্কুলে যাই। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করি। এখন স্কুল বন্ধ। লুকোচুরি খেলতে খেলতে আমরা সবাই বিরক্ত। আমি অন্য কিছু করতে চাই। কিন্তু কী করব বুঝতে পারছি না। সবাই বলল, জ্ঞানী মানুষ এ বিষয়ে বলতে পারবে। তাই আপনার কাছে এসেছি।’
‘যে পুকুরে আংটি হারায় সেই পুকুরেই তা খুঁজতে হয়।’
‘মানে?’
‘স্কুল আর খেলার বাইরেও মানুষ মজার মজার বই পড়ে। গান গায়। গান শোনে। সাইকেল চালায়। সাঁতার কাটে। ছবি আঁকে। বাগান করে। কত কিছু আছে করার জন্য। তোমাকে শুধু খুঁজে বের করতে হবে কোন কাজটি তোমার ভালো লাগে।’
‘আমি জঙ্গলে থাকি। মজার মজার বই কোথায় পাব?’
‘পুরো জঙ্গলটাই তোমার লাইব্রেরি। তুমি পথ চলবে। নানা ধরনের গাছ আর প্রাণীর সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হবে। তাদের সম্পর্কে জানবে, শুনবে।
জঙ্গলে বৃষ্টি পড়লে কান পেতে বৃষ্টির গান শুনবে। নদীর ধারে গেলে মাছেদের সঙ্গে কথা বলবে। তাদের কথা শুনবে। পশুপাখিদের জীবনযাপন দেখবে। জঙ্গলের পুরো প্রকৃতিই তোমার জন্য বিশাল জ্ঞানভান্ডার। সে জ্ঞান অর্জন করার জন্য তোমার মধ্যে পিপাসা থাকতে হবে। পর্যবেক্ষণ করো। ভালো লাগানোর চেষ্টা করো। দেখবে নিজের বাসা আর জঙ্গলকে তোমার পরম আপন মনে হবে।’
জ্ঞানী মানুষ হাসলেন।
‘বুঝতে পেরেছি জ্ঞানী মানুষ। আমি ফিরে যাচ্ছি জঙ্গলে। জঙ্গল যে বিশাল লাইব্রেরি, জ্ঞানের ভান্ডার সেটা আমি বুঝতেই পারিনি। আপনার কাছে এসে আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল গুরুদেব। চললাম আমি।’
ফিরে চলল হালুম।
যাচ্ছে সে মায়ের কাছে।
নিজ প্রকৃতির কাছে।
জঙ্গলে।