হুমায়রা রহমান
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:৫৯ পিএম
এ ছবিটি এঁকেছে মিথিলা ভৌমিক। সে ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী
ভয়ে ভয়ে পা ফেলল বিড়ালটি। চারদিক শুধু অন্ধকার। শীতের রাত। তবু ঠান্ডা লাগছে না। কেননা তার গোটা দেহ পশমে ঢাকা। বিড়ালটি ভয়ে আছে, যদি মা চলে আসে! মাকে ভয় পেলে চলবে না। আরও কত কাজ বাকি। এই বলে দিল দৌড়।
যাবে স্কুল মাঠে। সেখানে অপেক্ষা করছে একটি কুকুর আর একটি মুরগি। পা টিপে টিপে যেতে লাগল। এভাবে সে চলে গেল স্কুল মাঠে কুকুর আর মুরগির সঙ্গে দেখা করতে। তারপর সিদ্ধান্ত নিল কীভাবে ক্লাসরুম থেকে বিজ্ঞানের বইটি উদ্ধার করবে।
মুরগিটি বলল, বারান্দা দিয়ে যাওয়া ভালো হবে।
কুকুর বলল, না। প্রত্যেক রুমের পাশে গার্ড আছে। তারা বুঝে যাবে তাই ধোঁয়া উড়িয়ে ঢুকে যেতে হবে।
কিন্তু বিড়ালটি অপছন্দ করল। ভাবল, এভাবে হবে না। কেননা সব ক্লাসরুমই তালা মারা। তাই আগে চাবি চুরি করতে হবে। বলেই সে ফোরের ক্লাসরুমের সামনের গার্ডের হাত থেকে চাবিটি নেওয়ার চেষ্টা করল। চাবিটি নিয়ে নেওয়ার আগে ঘুমন্ত গার্ডটি হাত সরিয়ে দিল। বিড়ালটি ভাবল বোধহয় গার্ডের ঘুম হালকা হয়ে যাচ্ছে।
মুরগিটি তখন চিৎকার দিয়ে ওঠে। কামড়িয়ে দিল, ও ও আঃ!
বিড়াল গিয়ে মুখ চেপে ধরল। তাতে কাজ হলো না অবশ্য। ক্লাস ফাইভের রুমের কাছের ঘুমন্ত গার্ডটি হাই তুলে জেগে উঠল। উঠে দেখল তিনটি প্রাণী তার মুখের সামনে। ঘুমচোখে গার্ডটি তিনটি বাঘ ভাবল তাই চিৎকার দিয়ে বাকি গার্ডদের জাগিয়ে তুলল। অবশ্য তার আগেই বিড়াল, কুকুর ও মুরগি সেখান থেকে চলে গেল।
স্কুল মাঠে ঘন কুয়াশা। এক-দুই ফোঁটা শিশিরও পড়ছে। বিড়ালটি মুরগিকে বলল, তখন তুমি চেঁচালে কেন?
মুরগি বলল, পিঁপড়া কামড়িয়েছে পায়ে। তখন বিড়ালটি তার পায়ে চোখ রাখল। দেখল তিন আঙুলের চিকন পায়ের দ্বিতীয় আঙুলটি ফুলে গেছে। কুকুরটি আগ বাড়িয়ে বলল, এখন মাঝরাত, এখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কথাটা সে বলল খুব ভাব নিয়ে। খুব রেগে গেল মুরগিটি এবার। নিশ্চয়ই ওদের মধ্যে এখন ঝগড়া হবে বলে আগেই ভেবে নিয়েছে বিড়ালটি।
ওদিকে স্কুলের বারান্দায় গার্ডেরা মিলে ঝামেলা করছে। বিড়ালটি কপাল চাপড়াতে শুরু করল। গার্ডদের ঝামেলা অবশ্য ওদের দোষেই হয়েছে। তা-ও এ বিষয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
গার্ডদের মধ্যে একজন বলল, এত রাতে ঝামেলা থামিয়ে দেওয়াটাই উত্তম হবে।
ওই গার্ডটির কথার যুক্তি আছে, বলল আরেক গার্ড। এভাবেই নিজেরা নিজেদের ঝামেলা মোকাবিলায় সক্ষম হলো এবং সবাই ঘুমিয়ে গেল।
বিড়ালটি বলল, এখন যাওয়া যাবে না। ওরা ঘুমিয়ে পড়ুক। কয়েক মিনিট পর তিনজন স্কুলের বারান্দায় গেল। সবাই ঘুমাচ্ছে। বোকা মুরগিটি চেঁচিয়ে বলল, চলো ও ও ও! বলতে না বলতেই বিড়াল তার ঠোঁটটি চেপে ধরল। চুপ, ওরা তো জেগে যাবে।
মুরগিটি ধীরে ধীরে লজ্জিত সুরে বলল, সরি। বিড়ালটি বলল, এবার চাবিটি গার্ডের হাত থেকে নিয়ে নিতে হবে।
বিড়ালটি ক্লাস ফোরের সামনে থাকা ঘুমন্ত গার্ডটির হাত থেকে চাবিটি যেই নেবে অমনি ক্লাস থ্রির রুমের কাছের গার্ডটি জেগে উঠল। বিড়ালটির শরীর কাঁপছে। মুরগি আর কুকুরও ভয় পাচ্ছে। ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা গার্ডটির হাতে ছিল বিশাল বড় ধারালো একটি দা। বড় বড় লাল চোখের দৃষ্টি। বিড়ালটি দিল দৌড়। পেছন পেছন গেল মুরগি ও কুকুর। কিন্তু এবারে রক্ষা পেল না কেউই। গার্ডটি তিনজনকেই লোহার মরিচা পড়া খাঁচায় বন্দি করে ফেলল এবং তালা মেরে চাবিটি খাঁচার ওপরে থাকা হুকে ঝুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ওদের সৌভাগ্য যে চাবিটি ছিল একদম হাতের কাছে। বোকা মুরগিটি চাবিটি হুক থেকে পেড়ে বিড়ালের হাতে দিল।
বিড়াল বলল, বাঃ! এতদিনে একটি বুদ্ধিমানের কাজ করেছ। বিড়ালটি তালা খুলল এবং সবাই মিলে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে ওই গার্ড ঘুমিয়ে গেছে।
বিড়ালটির পা এগোতেই মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। তার পুরো গা শিরশির করছে। ভাবছে, গার্ডটি যদি আবারও ঘুমের ভান করে! তবে তা হয়নি। সত্যি সত্যিই সে ঘুমিয়ে ছিল। এজন্য তাদের কাজটা কিছুটা সহজ হলো।
এবার বিড়ালটি অত্যন্ত কষ্টে চাবিটি উদ্ধার করল। কুকুর আর মুরগিকে বলল, তোমরা পাহারা দাও। এরপর ভেতরে ঢুকে সেকেন্ড বেঞ্চের ওপর থেকে বইটি উদ্ধার করল। বিড়ালটির কাছে টর্চলাইট ছিল, যার ফলে তার বইটি উদ্ধার করতে কোনো সমস্যা হয়নি।
রাত আরও গভীর হলো। তিনটা বেজে গেল। ঠান্ডাও বেড়ে গেল। ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে আনন্দে বলল, ইয়ে! পেরেছি-ই-ই! কি মজা আ আ! কুকুরটি বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে। এবার বাড়ি যেতে হবে। এরপর তিনজন স্কুল থেকে বেরিয়ে গেল। এবং নিজ নিজ বাড়ি চলে গেল। মুরগি আর বিড়ালটি একদিকে গেল, কুকুরটি অন্যদিকে।
মুরগি ও বিড়াল বাড়িতে ঢুকে গেল। তারা দুজনে বিড়াল আর মুরগির পোশাক খুলে ফেলল।
আসলে ওরা তিনজনই ছিল ক্লাস ফোরের ছাত্রী। বিড়ালের পোশাকে থাকা মেয়েটি তার বিজ্ঞান বই ক্লাসরুমে ফেলে এসেছিল ভুল করে। সেটা আনা খুব জরুরি ছিল। কিন্তু মা আনতে দিতেন না। তাই মায়ের বকার ভয়ে তারা রাতে গিয়েছিল। বিড়ালটির সঙ্গে থাকা মুরগিটি ছিল তার ছোট বোন। কুকুরটি ছিল পাশের বাড়ির বন্ধু রোকেয়া। কেউ যাতে না চেনে, সেজন্য তারা ছদ্মবেশে গিয়েছিল। অবশেষে তারা কাজটি সম্পন্ন করে ফিরে এলো। নীলা, যে মেয়েটি বিড়ালের পোশাক পরে ছিল, মনে মনে বলল, এ সবই ছিল আঁধার রাতের খেলা।
অষ্টম শ্রেণি, কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, বাগাতিপাড়া, নাটোর